৬ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিলের রফা ১ লাখ ১৮ হাজারে!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ০৫:৪০ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২১

বিদ্যুৎ অফিসের যোগসাজশে টাঙ্গাইলে প্রায় ছয় লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল দফারফার মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা। ভবনের সচল মিটার নষ্ট, নতুন মিটার স্থাপনসহ নানান কারসাজি করে সরকারের লোকসান হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা। এছাড়া অসামঞ্জস্য বিদ্যুৎ বিল, বিল সমন্বয়, মিটার নষ্টসহ বিভিন্ন বাহানায় গ্রাহকের পকেট কেটে হয়রানির অভিযোগ টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ উঠেছে, আড়াই লাখ টাকা ঘুস নিয়ে অধ্যাপক ডা. মো. শাহ আলমের ছেলে গ্রাহক তাশফিক আলমের বাসভবনের বিদ্যুৎ বিল সমন্বয় করেছেন বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহম্মেদ।

বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সাল থেকে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করছেন টাঙ্গাইল পৌর শহরের থানাপাড়া মেইন রোডে নির্মিত ১১তলা বিশিষ্ট অধ্যাপক ডা. মো. শাহ আলমের মালিকাধীন শামছুদ্দোহা রিজিয়া (এসআর) ভবন। যার গ্রাহক তার ছেলে তাশফিক আলম।

২০১৭ সালের অক্টোবরে ওই ভবনের সামনের অংশে ছয়টি ফ্লোর ভাড়া নেয় মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিস লিমিটেড। এসময় হাসপাতালটির জন্য একটি বাণিজ্যিক এসটি (মাদার মিটার) স্থাপন করা হয়। বাকি ফ্লোরের আবাসিক মিটারগুলো স্থাপন হয় চাইল্ড মিটার হিসেবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেন প্রকৌশলী শামীম আহম্মেদ। এ দপ্তরের অধীনে প্রায় ৪৫ হাজার গ্রাহক।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ২০১২ সাল থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ শুরু করে অধ্যাপক ডা. মো. শাহ আলমের মালিকাধীন শামছুদ্দোহা রিজিয়া ভবন। যার গ্রাহক তাশফিক আলম। ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাসভবনে স্থাপন করা (সিরিয়াল নম্বর-১১২১৫২৫৯) মিটারে ৫৯২৯২.৯৩ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। ১০ টাকা দরে যার মূল্য ৫ লাখ ৯২ হাজার ৯২৯.৩ টাকা। ব্যবহৃত ওই মিটারে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১৪৩৬৯ ইউনিটের বিল দেখিয়ে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ২০৪ টাকা।

২০১২ সাল থেকে ব্যবহৃত একক মিটার ছিল। সে সময় থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মিটারটিতে ওই পরিমাণ ইউনিট জমা পড়ে। এরপর ২০১৭ সালের অক্টোবরে সেটি চাইল্ড মিটারে স্থানান্তর হয়। বিষয়টি অবগত হয়েই বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বিলের বিশাল অঙ্কের ওই টাকা আত্মসাতের অবলম্বন হিসেবে মিটারটি নষ্ট দেখিয়ে নতুন মিটার স্থাপন করে। ফলে সরকার হারিয়েছে ৪৪ হাজার ৯২৩ ইউনিটের বিদ্যুৎ বিল। যার পরিমাণ ৪ লাখ ৪৯ হাজার ২৩০ টাকা।

অনুসন্ধান আর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং ম্যানেজারের (অ্যাপস) ফোনালাপ রেকর্ডে ওই অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। এতে স্পষ্ট হয়েছে নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহম্মেদ আর উপ-সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলামের যোগসাজশে বিদ্যুতের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি। বিদ্যুৎ বিলের টাকা আত্মসাতের পাশাপাশি বাইরে থেকে মিটারটি কেনাসহ স্থাপন বিধি অমান্য করার অনিয়ম হয়েছে বলেও জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।

jagonews24

এদিকে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর অধীনে থাকা অন্য গ্রাহকদেরও বিল নিয়ে হয়রানির অভিযোগ আছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

৭২৭২৬২ নম্বর মিটার গ্রাহক থানাপাড়ার আবু কাউসার অভিযোগ করে বলেন, আমি প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করে আসছি। এরপরও হঠাৎ বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন এসে বলেন আপনার মিটার নষ্ট হয়েছে এবং বিল বকেয়া রয়েছে ১২শ ইউনিট। প্রতিমাসে বিল পরিশোধ করলে কীভাবে বিল বকেয়া থাকে। এরপরও বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন আমার বাড়িতে নতুন মিটার লাগিয়ে দেন এবং বলেন একবারে বকেয়া পরিশোধ করা আপনার পক্ষে কষ্টকর হবে বলে আমরা প্রতিমাসের বিলে বকেয়া বিল গড় করে পরিশোধের সুযোগ করে দেবো। এরপর আগস্ট মাসে আমার বিল আসে ২৪০৮ টাকা। সেটিও পরিশোধ করেছি। তবে অক্টোবর মাসে বিল এসেছে ১২ হাজার ৮০০ টাকা।

তিনি আরও বলেন, আমরা স্বল্প আয়ের মানুষ হঠাৎ করে এত টাকা বিল এলে আমাদের পক্ষে পরিশোধ করা অনেক কষ্টকর। একেক মাসে একেক রকম বিদ্যুৎ বিল, এটি হয়রানি ছাড়া আর কিছুই না। বিদ্যুতের এমন হয়রানি বন্ধে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

শহরের বেড়াডোমা ফকিরপাড়ার গ্রাহক ফেরদৌস হায়দারের অভিযোগ, বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর একজন কর্মচারী আমাকে ফোনে বলেছেন- বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আপনার কবে হাজিরা সেই তারিখটা জেনে যান। যদিও গত দুই বছর আগে ৪০ হাজার টাকা বকেয়া বিলের অভিযোগে আমার নামে একটা মামলা হয়েছিল। পরে সেই টাকা আমি পরিশোধ করাসহ আদালতের হাজিরাও শেষ করি। এরপর থেকে আমি নিয়মিত বিল পরিশোধ করছি। এখন দুই বছর পরে কেন আবার আমাকে ডাকছে আর কোন উদ্দেশ্যে সেটি জানতে আসছি। এছাড়া প্রায় এক বছর ধরে আমি ডিজিটাল মিটার ব্যবহার করা শুরু করেছি। কিন্তু আট মাস পর্যন্ত এসেছে অ্যানালগ মিটারের বিল। বাধ্য হয়ে সেই বিলের টাকাগুলোও আমাকে পরিশোধ করতে হয়েছে। এখন আমার ৫শ টাকার মতো বিদ্যুৎ বিল খরচ হলেও দিতে হচ্ছে ২ হাজার টাকা।

ডা. মো. শাহ আলমের ভবনে স্থাপিত টাঙ্গাইল মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিস লিমিটেডের মার্কেটিং ম্যানেজার মো. গোলাম হায়দার আলী জাগো নিউজকে বলেন, আমরা প্রতি মাসে আমাদের জন্য নির্দিষ্ট এসটি মিটার অনুসারে বিল পরিশোধ করছি। আমাদের মিটারের সঙ্গে ভবন মালিকের বৈদ্যুতিক কোনো সম্পর্ক নেই। মালিকপক্ষ তাদের ব্যবহৃত মিটার অনুযায়ী আলাদাভাবে বিল পরিশোধ করেন। তবে গত বছরের এপ্রিল মাসে ভবন মালিকের মিটার আর বিল নিয়ে কিছু একটা সমস্যা হয়েছিল বলে শুনেছি।

অধ্যাপক ডা. মো. শাহ আলমের ভাগনি জামাই ও ভবনের একাংশের মালিক ফখরুল ইসলাম ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের ভবনের (সিরিয়াল নম্বর-১১২১৫২৫৯) আবাসিক মিটারে একটা সমস্যা হয়েছিল। সেটির সমাধান করেছেন ভবনের মূল মালিক অধ্যাপক ডা. মো. শাহ আলম।

এ বিষেয় জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. মো. শাহ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ভবনটিতে আমার ছেলে থাকে। প্রতি মাসেই আমরা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছি। কিন্তু এরপরও ভুয়া (৫৯২৯২.৯৩) ইউনিট দেখানো হয়। সে সময় ওই বিল পরিশোধ না করলে লাইন কেটে দেওয়াসহ নানা ঝামেলা তৈরি হয়। তাই আমি আমার একজনকে পাঠিয়ে বিলটা পরিশোধ করি।

বিল পরিশোধের জন্য ঘুস দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘুস দেওয়া হয়েছে কি না জানা নেই। তবে নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদসহ কয়েকজন মিলে বিল নিয়ে বিব্রত করেন বলে জেনেছি। ভুয়া বিল দেখিয়ে টাকা পরিশোধ করতে বলেন। এরপর ঘুস নিয়ে তা সমাধানও করে দেন বলে শুনেছি।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর ম্যানেজার (অ্যাপস) মামুন জাগো নিউজকে বলেন, আমি গ্রাহক তাশফিক আলমের ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত (সিরিয়াল নং-১১২১৫২৫৯) ব্যবহৃত ৫৯২৯২.৯৩ ইউনিট বিদ্যুৎ বিলটি ওপেন করতে চেয়েছিলাম। তবে নির্বাহী প্রকৌশলীর চাপের মুখে আমি সেটি ওপেন করতে পারিনি। এর বিপরীতে নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদ ওই মিটার রিডিংটা স্কিপ করেন এবং সুবিধা নেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও সাইড ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল ইসলাম।

বিদ্যুৎ বিলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহম্মেদ জাগো নিউজকে বলে, তাশফিক আলমের ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ব্যবহৃত ১১২১৫২৫৯ নম্বর মিটারটি নষ্ট হওয়ায় আমি সেটি পরিবর্তনের নির্দেশ দেই। সরকারি মিটার পেতে ঝামেলা থাকায় বাইরে থেকে নতুন একটি মিটার কিনে সেখানে স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. তোফাজ্জল হোসেন প্রামানিক বলেন, এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ বা সংবাদ প্রচার হলে এ বিষয় তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরিফ উর রহমান টগর/এসজে/এএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]