মুহিবুল্লাহসহ ৭ খুন: প্রমাণ লুকাতে ঘাতকদেরই মেরে ফেলছে আরসা!
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মাস্টার মুহিবুল্লাহ ও ক্যাম্পের মাদরাসার ছয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে খুনের ঘটনা আড়াল করতে ভয়ংকর পথ বেছে নিয়েছে বিতর্কিত সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)। সাত খুনে অংশ নেওয়া ঘাতকদেরই হত্যায় লিপ্ত হয়েছে সংগঠনটি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের এমনই দাবি।
তারা বলছেন, এই গুপ্তহত্যা মিশনের ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার (২ নভেম্বর) গভীর রাতে আরসার বাংলাদেশের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে পরিচিত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ হাসিমকে পিটিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। টেকনাফের শালবাগান ক্যাম্পের পাহাড়ে তাকে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়।
যদিও পুলিশ বলছে, হাসিমকে হত্যার বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে শুনলেও এখনো তার মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু হাসিম মারা গেছেন, এমন খবর ক্যাম্পে ছড়ানোর পর সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে স্বস্তি ও উল্লাস দেখা যায় বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
হাসিমকে ‘হত্যার’ একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রিত একাধিক গ্রুপে ভেসে বেড়াচ্ছে। সূত্রের দাবি, এ সপ্তাহের প্রথম দিকে হাসিমকে ধরে নিয়ে যায় তারই সংগঠনের সন্ত্রাসীরা। মাস্টার মুহিবুল্লাহ হত্যাসহ সাত খুনের মিশন বাস্তবায়নকারীদের অন্যতম হাসিম। আরসার আমির আতা উল্লাহ জুনুনির সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তিনি আরসার সব অপর্কম জানতেন। এ কারণে প্রশাসনের হাতে ধরা পড়ার আগেই আরসার শীর্ষ পর্যায়ের ইশারায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। আরসার টার্গেটে রয়েছে আরও বেশ কয়েকজন।
একই সূত্রের তথ্য, মিয়ানমার ভূখণ্ডে চলতি সপ্তাহে আরও পাঁচজনকে একই কায়দায় হত্যা করেছে আরসার সন্ত্রাসীরা। নিহতদের মধ্যে আবদুস সালাম, মোহাম্মদ কামাল ও ইদ্রিস নামে তিনজনের নাম পাওয়া গেলেও বাকি দুজনের নাম পাওয়া যায়নি। তবে তাদের পরিবার এখনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছে বলে জানা গেছে। নিহত এই রোহিঙ্গাদের ছবি ও ভিডিও একইভাবে সামাজিক মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের পরিচালিত গ্রুপগুলোতে ভেসে বেড়াচ্ছে। এসব ঘটনায় আরসা নিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের হত্যার পর এক অডিও বার্তায় কথিত আরসা আমির আতা উল্লাহ জুনুনি ইঙ্গিতপূর্ণ স্বরে বলেন, ‘ডাকাত কী জন্য নামিয়ে দিয়েছ? ডাকাত নামালে, সন্ত্রাস নামালে, ক্যাম্পে ভিডিও (আরসার কার্যক্রমের ওপর) করলে, এভাবে হরিণ মরার মতো মরে। তোদের বুদ্ধি এত কম? আমাদের বিরুদ্ধে পাঠালে পরিস্থিতি এমনই হয়। এখান থেকে তোরা শিক্ষা নে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিয়ানমার ভূখণ্ডে চলতি সপ্তাহে যারা হত্যার শিকার হয়েছেন, এক সময় তারাও আরসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু আতা উল্লাহ জুনুনি রোহিঙ্গাদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে একত্রিত করে মিয়ানমার সরকারের পক্ষে যে কাজ করছিলেন, তা একসময় তারা বুঝতে পারেন। এরপর আরসার কোনো কর্মকাণ্ডে তারা আর যুক্ত হতেন না। সম্প্রতি মুহিবুল্লাহ্ হত্যাকাণ্ডের পর আরসার অপকর্মের বিষয়টি আরও সামনে এলে তারা (নিহতরা) সংগঠনটির অপকর্মের বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেন।
আরসার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে সাধারণ রোহিঙ্গাদের প্রেরণা যোগাতে থাকেন হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিরা। এ কারণেই তাদের কৌশলে মিয়ানমারের আরাকানে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি একাধিক সূত্রের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা জাগো নিউজকে বলেন, মুহিবুল্লাহকে হত্যার পর আরসা সম্পর্কে সাধারণ রোহিঙ্গাদের ধারণা পাল্টে গেছে। তারা বুঝে গেছে, আরসা মিয়ানমারের পক্ষে কাজ করে। তাই তাদের প্রতিরোধের ডাক দিয়েছে ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা। এ কারণে আরসা এখন মরণকামড় দিতে চায়। এ কারণে প্রশাসনের কাছে ধরা পড়ার আগে আরসার শীর্ষ কমান্ডার হাসিমসহ আরও পাঁচ রোহিঙ্গাকে হত্যা করে আরসা সন্ত্রাসীরা।
রোহিঙ্গাদের গ্রুপে প্রকাশিত অপর এক অডিও বার্তায় আপলোডকারীকে বলতে শোনা যায়, মুহিবুল্লাহ ও মাদরাসার ছয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে কতলের (হত্যার) নেতৃত্ব ও নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাসিম। মাস্টার গফুরের কাছে শুনেছিলাম, পুলিশের কাছে ধরা পড়ার আগে হাসিমকে মেরে ফেলা হবে। এপারে (রোহিঙ্গা ক্যাম্পে) সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ছিলেন হাসিম। অন্যদের বাঁচতে হলে তাকে কতল (হত্যা) করতে হবে। আমার কাছেও একই ধরনের রিপোর্ট ছিল।
রোহিঙ্গাদের অপর এক সূত্র জানিয়েছে, পরিস্থিতি যে পর্যায়ে, তাতে যে কোনো সময় উখিয়া-টেকনাফ রোহিঙ্গা শিবির আরও অশান্ত হতে পারে। আরসা সন্ত্রাসীরা খুনোখুনি করে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এভাবে ক্যাম্পের পরিবেশ অস্থিতিশীল করে মূলত মুহিবুল্লাহ ও অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ক্যাম্পে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৬ এপিবিএনের অধিনায়ক (এসপি) মো. তারিকুল ইসলাম তারিক জাগো নিউজকে বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকে গণমাধ্যমকর্মীরা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী হাসিমের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কি না, জানতে চাচ্ছেন। এ ধরনের কোনো তথ্য আমরা পায়নি। তারপরও গণমাধ্যমকর্মীদের দেওয়া তথ্যে ক্যাম্প ২১-২২ এবং অন্যান্য সব স্থানে খবর নিয়েছি। কোনো মরদেহ উদ্ধার কিংবা ক্যাম্পে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, এমন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার (এসপি) মো. রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী হাসিম নিহত হয়েছে বলে প্রচার হলেও এখনো তার মরদেহ খুঁজে পায়নি পুলিশ। তবে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে সম্ভাব্য সব স্থানে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কাজ করছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।
মিয়ানমারে আরও পাঁচ রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হওয়ার বিষয়ে এসপি বলেন, অন্য দেশে কী ঘটেছে তা আমাদের জানার বিষয় নয়। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেন দুর্বৃত্তরা কথিত সংগঠনের নামে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাই সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গোষ্ঠীটির নেতা মাস্টার মুহিবুল্লাহকে তার কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবাসনের পক্ষে নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন।
তাকে খুনের পর গত ২৩ অক্টোবর উখিয়ার পালংখালীর ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মাদরাসায় গুলি চালিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় আরও ছয়জনকে। এসব হত্যাকাণ্ডে এ পর্যন্ত ২৩ জন সন্দেহভাজন আসামি গ্রেফতার হয়েছেন। এর মধ্যে মুহিবুল্লাহ হত্যায় তিনজন এবং ছয় খুনের ঘটনায় একজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
সায়ীদ আলমগীর/এমকেআর/এইচএ/জিকেএস