নজরকাড়া গঠনশৈলীর আউলিয়া মসজিদ

এন কে বি নয়ন এন কে বি নয়ন ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৪:৩০ পিএম, ০৯ নভেম্বর ২০২১

অডিও শুনুন

ফরিদপুরের ভাঙ্গার পাতরাইল মসজিদ। স্থানীয়ভাবে যেটি পাতরাইল আউলিয়া মসজিদ নামে পরিচিত। উপজেলার আজিম নগর ইউনিয়নের পাতরাইল গ্রামে প্রাচীন এ মসজিদটির অবস্থান। এর নির্মাণকাল সুনির্দিষ্টভাবে কেউ বলতে পারেন না। তবে ৭০০-৮০০ বছর আগে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

প্রাচীন ও দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদটি বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন। সে অনুযায়ী ২০১৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির মেরামত ও সংস্কার কাজ করেন।

এলাকার একাধিক প্রবীণ জানান, মসজিদের দক্ষিণ পাশে চিরনিন্দ্রায় শায়িত মজলিস আউলিয়া খান। মজলিস আউলিয়া নামক একজন ধর্মপ্রাণ সাধকের নামানুসারে মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে। তবে পাতরাইল মসজিদ নামে বেশিরভাগ মানুষের কাছে পরিচিত হলেও এ মসজিদটির আরও দুটি নাম আছে। দীঘির পাড় মসজিদ এবং মজলিশ আউলিয়া মসজিদ।

ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এ মসজিদটি আজম শাহ ১৩৯৩-১৪১০ সালের নির্মাণ করেন বলে স্থানীয়দের ধারণা।

jagonews24

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহ ইসমাইল এবং শাহ ইউসুফ নামের দুই ব্যক্তির আহ্বানে এক সাধক দরবেশ সুদূর বাগদাদ থেকে এসে এখানে বসবাস করতেন। তিনিই এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। গবেষকরা মনে করেন, গঠনশৈলী অনুযায়ী এ মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদের সঙ্গে এ মসজিদের সাদৃশ্য রয়েছে। যদিও গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদটি সুলতান আলাউদ্দিন শাহ নির্মাণ করেছিলেন।

ঐতিহাসিক মসজিদটির আঙিনায় রয়েছে দরবেশ দেওয়ানের মাজার। আউলিয়া খানের মাজারের দক্ষিণ পাশে রয়েছে ফকির ছলিমদ্দিন দেওয়ানের মাজার। জনশ্রুতি আছে, তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলের প্রজাদের পানীয় জলের সমস্যা নিরসনকল্পে, ওজু ও ইবাদতের জন্য মসজিদের পাশে ৩২ দশমিক ১৫ একর জমির ওপর একটি দীঘি খনন করা হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, পাতরাইল ঐতিহাসিক এ মসজিদটি ১০ গম্বুজ বিশিষ্ট। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৮৪ ফুট ও প্রস্থ ৪২ ফুট। মসজিদের চার কোণে রয়েছে চারটি মিনার। মসজিদের দেয়াল ৭ ফুট প্রশস্ত। মসজিদের ভিতরে চারটি স্তম্ভ বা থাম আছে। পূর্ব দিকে পাঁচটি এবং উত্তর-দক্ষিণ দিকে দুটি করে ৯ টি দরজা আছে। এ ছাড়াও কিবলা প্রাচীরের পাঁচটি অবতলাকৃতি মিহরাব রয়েছে যা পূর্ব দিকের খিলান পথ বরাবর। মিহরাবগুলো কুইঞ্চের সাহায্যে নির্মিত। উত্তর-দক্ষিণ দিকে কৌণিক খিলানপথ রয়েছে। ছাদে ১০টি গম্বুজ থাকায় ধারণা করা হয় এটি সুলতানি আমলের আয়তাকার দশ গম্বুজ টাইপের অন্তর্গত একটি মসজিদ। এর প্রধান ফটকের উপরে দুটি পাথরের শিলালিপি এবং ভিতরে একই রকম আরও দুটি শিলালিপি দেখতে পাওয়া যায়। যদিও সেগুলো অস্পষ্ট।

jagonews24

মসজিদটি ষোড়শ শতাব্দীর সুলতানি আমলের মসজিদ বলেও অনেকে মত দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার এর নির্মাণশৈলীর গঠন অনুযায়ী মসজিদটি হোসনি আমলের বলে ধারণা করেন। এ মসজিদটিতে হাফেজ আবুল বাশার (৪৬), সিব্বির আহমেদ (৪৫) নামে দুই জন ইমাম, মো. ওমর আলী সিকদার (৫৬) নামের এক মুয়াজ্জিন ও মো. হাসান (২১) নামের একজন ঝাড়ুদার নিয়োজিত রয়েছেন।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সোহাগ মাতুব্বর জাগো নিউজকে বলেন, পাতরাইল মসজিদ বা ঐতিহাসিক মজলিস আউলিয়া মসজিদটি ও দীঘির রক্ষার্থে সরকারের আরও সুনজর দিতে হবে। এছাড়া মসজিদে যাওয়ার সংযোগ সড়ক ও একটি ছোট ব্রিজ রয়েছে, যা খুবই সরু। সড়ক ও রাস্তার সংস্কার করা দরকার। এছাড়াও দিঘিকে ঘিরে কিছু সংস্কার করা হলে দেশী-বিদেশি বিভিন্ন পর্যটকদের আকর্ষণ করা সম্ভব।

মসজিদের ইমাম হাফেজ আবুল বাশার (৪৬) বলেন, এ মসজিদে ১৯৯০ সাল থেকে ইমামতি করছি। মসজিদটির বয়স কত বছর তা জানা নেই। প্রবীণদের মুখে শুনেছি মসজিদটির বয়স সাতশত থেকে আটশত বছর।

jagonews24

তিনি বলেন, বিশ বছর আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব খারাপ ছিল। তখন প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন শত লোক নামাজ আদায় করতেন। এখন এক থেকে দেড় হাজার মানুষ এ মসজিদে নামাজ পড়েন। প্রতি শুক্রবারে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত গড়ে প্রায় তিন হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ জুমার নামাজ পড়েন।

মসজিদ কমিটির সভাপতির বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সামাদ মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, মহিলাদের জন্য গোসল-ওজুর ব্যবস্থা নেই। মসজিদে গণ শৌচাগার সংকট রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানান।

ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আজিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ইতোপূর্বে পাতরাইল মসজিদ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অন্তর্ভুক্ত। যার কারণে ইচ্ছা হলেও কোনো কিছু পরিবর্তন বা সংস্কার করা সম্ভব নয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নির্দেশনা দেওয়া আছে। সে অনুযায়ী অনুমতি নিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

এন কে বি নয়ন/আরএইচ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]