এক সময়ের জনপ্রতিনিধির জীবনের শেষ চাওয়া একটি সরকারি ঘর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৯:২৮ এএম, ২২ নভেম্বর ২০২১

ফরিদপুরের মধুখালীর লিটন মিয়া। আর দশজন মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে জন্ম হলেও এখন পঙ্গু জীবনযাপন করছেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বর্তমানে পঙ্গুত্ব আর অসহায় অবস্থায় চলছে তার জীবন।

সংসারের হাল ধরতে কৃষিকাজ করতে গিয়ে পাওয়ার ট্রিলার দুর্ঘটনায় এক পা হারিয়েছেন। তবুও দমে যাননি লিটন। খুপরি চা-পানের দোকানদার থেকে জনপ্রতিনিধিও হয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনো নিজের ও তার পরিবারের কথা ভাবেননি। সাধ্যমতো মানুষের সেবা করেছেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে যা করেছেন সবই মানুষের জন্য।

কিন্তু বর্তমানে লিটন মিয়া নিজেই পরিবার-পরিজন নিয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন। ভাত-কাপড়ের অভাব। সংসার চালানো দ্বায়। জমি-জমা নেই। ঘর নেই। বড় সমস্যা তার মাথা গোজার ঠাঁই নিয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নে পূর্ব আড়পাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. লিটন মিয়া। তার বাবার নাম আবুল কাশেম। সংসারে অভাবের তাড়নায় বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন।

২০০১ সালে সংসারের হাল ধরতে গিয়ে কৃষিকাজে নামতে হয় তাকে। কৃষিকাজ শুরুও করেন। একদিন পাওয়ার ট্রিলার দিয়ে নিজেই জমি চাষ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। তাকে হারাতে হয় বাম পা। এরপর থেকে পঙ্গু জীবন শুরু। তবুও তিনি মোটেও দমে যাননি। পঙ্গুত্ব বরণ করেও কৃষিকাজ চালিয়ে গেছেন।

এরপর ২০০৮ সালে স্থানীয় মাঝিবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে ছোট্ট আকারে চা-পান-বিড়ির দোকান শুরু করেন। এভাবে চলে বেশ কয়েক বছর। এর মধ্যে মনে ইচ্ছা জাগে জনসেবা করার। ২০১২ সালে আড়পাড়া ইউনিয়নে ১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ইউপি সদস্য (মেম্বার) নির্বাচন করেন। জনগণের বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ইউপি সদস্য (মেম্বার) নির্বাচিত হন লিটন মিয়া। তার পাঁচ বছর জনপ্রতিনিধি মেয়াদকালীন সময়ে তিনি নিজের জন্য কোনো চিন্তা-ভাবনা করেননি। জনগণ এবং এলাকার উন্নয়ন করেছেন সাধ্যমতো।

বর্তমানে তিনি পাটকাঠি-পলিথিন আর মরিচাধরা, ছিদ্র, ভাঙ্গা-চোরা দুইখানা টিনের ছাপড়ায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন। এই ঘরেই জন্ম হয়েছে দুটি কন্যা সন্তানের। এখন তার সমস্ত চিন্তা স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে। মেয়ে দুটি বড় হচ্ছে আর চিন্তাও বাড়ছে। বড় মেয়ে লিজা (১০) পঞ্চম শ্রেণি আর ছোট মেয়ে লিমা (৭) প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।

লিটন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, আমার এখন সংসার চলে সামান্য একটি চায়ের দোকান দিয়ে। কোনোমতে সংসার চললেও কারো কাছে হাত পাততে পারি না। কারো দয়া দানে করুণায় বেঁচে থাকতে চাই না। মেয়েদের লেখাপড়ার খরচসহ সব মিলিয়ে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তারপরও শরীরে চলার মতো যতোদিন শক্তি আছে পরিশ্রম করে, কাজ করে চলতে চাই। তবে আমার এখন টেনশন একটাই। বর্তমানে এই দুর্মূল্যের বাজারে খেয়ে পরে বাঁচতে কষ্ট হয়। তারওপর ছাপড়া মেরামত করবো কিভাবে? আমার পক্ষে হয়তো কোনোদিনই সম্ভব হবে না একটা ঘর নির্মাণ করা।

তিনি বলেন, আমি নিজের জন্য আর কিছু ভাবি না। মেয়েরা বড় হচ্ছে, বিয়ের বয়স হচ্ছে। কোনো মানুষ এই ছাপড়া ঘর দেখে আত্মীয়তা করতে চাইবে না।

তিনি আরও বলেন, আমার জমি বলতে বাড়ির মাত্র ২ শতাংশ ভিটে আছে। এই ভিটেটুকুর উপর অন্তত একটা ঘর হলে তাতেই আমি শান্তি পেতাম। আমি শুনেছি সরকার মুজিববর্ষে যার জমি আছে ঘর নেই এমন মানুষকে ঘর করে দিচ্ছে। আমার জীবনের শেষ চাওয়া একটা মাত্র ঘর। একখানা ঘর পেলে মরেও শান্তি পেতাম।

স্থানীয় বাসিন্দা শরীফ হোসেন জানান, লিটন খুব ভালো মানুষ। কিন্তু তিনি বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারি বেসরকারি কোনো প্রকার সাহায্য সহযোগিতা পেলে তার অনেক উপকার হতো।

এ ব্যাপারে আড়পাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন মোল্যা জাগো নিউজকে বলেন, সত্যি সে পরিবার নিয়ে অসহায় জীবন যাপন করছে। দুই শতাংশ ভিটের জমি ছাড়া কিছুই নেই। সামনে ‘খ’ শ্রেণির ঘরের তালিকার সময় আমি নিজে তার একটি ঘরের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবো।

মধুখালী উপজেলা চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, এ বিষয়টি আমার কাছে কেউ বলেনি। তারপরও তার একটি ঘরের ব্যাপারে অবশ্যই চেষ্টা করবো।

মধুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, এই মুহূর্তে নিজেদের জমিতে ঘর করে দেওয়া প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে। তারপরও যদি এই প্রকল্পটি কখনও চালু হয় অবশ্যই তার বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আর এই মুহূর্তে তিনি যদি তার নিকটস্থ কোনো গুচ্ছগ্রামের ঘরে যেতে চান সেক্ষেত্রে এখনই তাকে ব্যবস্থা করে দেওয়া যাবে।

এন কে বি নয়ন/এফএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]