বধ্যভূমিতে পাওয়া দেহাবশেষ গেলো মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ০৯:০৯ পিএম, ১০ ডিসেম্বর ২০২১

পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রাম। এখনো জলা আর সবুজে ঘেরা এক স্নিগ্ধ পল্লী। সেখানেই ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট সংঘটিত হয়েছিল গণহত্যা। লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল ২৬ জন হিন্দু ও দুজন মুসলিম পরিবারের সদস্যকে।

গত এক মাস আগে লক্ষ্মীপুরের সেই বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ শুরু করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। খনন কাজের সময় নিহতদের বেশ কয়েকজনের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। সেগুলো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জাদুঘরে রাখার জন্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় ড. মুনতাসির মামুনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

এ নিয়ে শুক্রবার (১০ ডিসেম্বর) বিকেলে লক্ষ্মীপুর গ্রামের বধ্যভূমিতে সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক, গণহত্যা- নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মুনতাসীর মামুন। তার কাছে আটঘরিয়া উপজেলা প্রশাসন এসব দেহাবশেষ হস্তান্তর করা হয়।

লক্ষ্মীপুর গ্রামের বধ্যভূমিতে আয়োজিত সুধী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পাবনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল্লাহ আল মামুন। বক্তব্য দেন আটঘরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাকসুদা আক্তার মাসু, আটঘরিয়া উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জহুরুল হক, স্থানীয় প্রবীণ বাবুল করিম, সজীব কুমার সুব্রত প্রমুখ।

jagonews24

সমাবেশে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর সদস্য, সে সময়কার বেশ কিছু বিধবা নারী এবং স্থানীয় জনসাধারণ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, সেদিন জামায়াত ইসলামীর মতিউর রহমান নিজামীসহ রাজাকার, আল বদরের লোকজন এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করেছিল। স্থানীয়দের এ বিষয়ে ভাবতে হবে, সচেতন হতে হবে। এমন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আবার ভোট দেওয়া হয়েছিল বা হয়।

তিনি আরও বলেন, এ খানে গণহত্যার শিকার হয়ে যেসব পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছেন তারা যে সহায়তাটুকু পাচ্ছেন তা আওয়ামী লীগ সরকারই দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারে থাকায় আজ এখানে একটি স্মৃতিসৌধ হচ্ছে।

ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, সে সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এখনো যারা দরিদ্র ও জর্জরিত আছেন তাদের পাশে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের এগিয়ে আসা দরকার। সবাই কিছু কিছু সহায়তা করলে সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। যারা গৃহহীন আছে তারা উপজেলা প্রশাসনে যোগাযোগ করতে পারবেন।

১৯৭১ সালে লক্ষ্মীপুর গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত হানা দেয়। তারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তার ২৮ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে আটঘরিয়ার দেবোত্তর, বংশিপাড়া, গড়ুরী, আটঘরিয়া বাজার এবং একদন্তের বেলদহ এলাকার মধ্য সবচেয়ে বেশি মানুষকে হত্যা করা হয় এই লক্ষ্মীপুর গ্রামে।

jagonews24

তারা আরও বলেন, ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টার দিকের ঘটনা। গ্রামের মানুষ স্থানীয় মসজিদে জুমার নামাজ পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় গোটা গ্রামজুড়ে হৈ চৈ, দৌড়া-দৌড়ি আর কান্নার শব্দ ভেসে আসে। মাঝে মাঝে গুলির শব্দ। মানুষজন বিশেষ করে উত্তর দিকে বিলের মধ্য পালাতে পারলেও পালাতে পারেনি গ্রামের হিন্দু পাড়ার বাসিন্দারা। স্থানীয় হিন্দু পাড়ায় শহর থেকে অনেক হিন্দু পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছিল সেখানে। অতর্কিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা সেখানে আক্রমণ করে বহু মানুষকে আটক করে। সেখানে পুরুষদের ধরে এক জায়গায় (তৎকালীন কালিমন্দিরে) একত্রিত করা হয়। এরপর তারা ২৮ জনকে গ্রাম সংলগ্ন ইছামতি নদীর পাড়ে কালিমন্দির প্রাঙ্গণে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

স্থানীয় প্রবীণ বাবুল করিম জানান, সেদিন নিহতদের সৎকার করার কেউ ছিল না। মুসলিম পরিবারের দুজনের মরদেহ তাদের পরিবারের লোকজন নিয়ে দাফন করেন। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের মরদেহগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়েছিল। সে সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ মরদেহগুলোকে শিয়াল-কুকুরের হাত থেকে রক্ষায় মাটিচাপা দিয়ে রেখেছিলেন।

আমিন ইসলাম জুয়েল/এসজে/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।