তৃণমূলে প্রসূতি সেবার আলোকবর্তিকা আদ্-দ্বীন হাসপাতাল
আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সাধারণ মানুষ আদ্-দ্বীন হাসপাতাল নামেই চেনে। এ নামেই তৃণমূলের মানুষের কাছে চিকিৎসা সেবায় আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে হাসপাতালটি। বিশেষ করে গর্ভবতী, প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবায় আদ্-দ্বীন হাসপাতাল এখন যশোরাঞ্চলের আলোকবর্তিকা। তবে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর সব ধরনের রোগীর জন্য ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা চালু করা হয়েছে।
যশোর শহরের রেলরোডে ১৯৮৫ সালে ‘আউটডোরের’ রোগী নিয়ে যাত্রা শুরু করে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল। ১৯৯১ সালে ২০টি শয্যা নিয়ে শুরু হয় ভর্তি রোগীর চিকিৎসা কার্যক্রম। আর এখন আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে পাঁচশ শয্যা। এক হাজার শয্যা হাসপাতালের নির্মাণকাজ চলছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, এখানে রয়েছে এনআইসিইউ (নিউনেটাল ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট- নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) যা এই অঞ্চলের আর কোনো হাসপাতালে নেই। এছাড়া ২৪ ঘণ্টা ইমার্জেন্সি, ফার্মেসি, অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা রয়েছে। এখানে ৩৫ চিকিৎসক আন্তঃবিভাগ, বর্হিবিভাগে রোগী দেখেন। আর রয়েছে ৮৭ নার্স, ৬০ আয়া এবং আরও অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারী।

হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ মিলে বছরে প্রায় এক লাখ রোগীর চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়ে থাকে। ২০১৯ সালে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেছে ৯৮ হাজার ৬৪০ জন। করোনার কারণে গত বছর ও চলতি বছর রোগীর সংখ্যা কিছুটা কম ছিল। ২০২০ সালে সেবা নিয়েছেন ৭৫ হাজার পাঁচজন এবং চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে এ সংখ্যা ৬৪ হাজার ৩৫০ জন।
সাধারণ রোগীরা জানান, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নাম মানুষের কাছে ছড়িয়েছে নারী ও শিশুদের চিকিৎসার মাধ্যমে। বিশেষ করে গর্ভবতী ও প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবায় এ হাসপাতাল এখন অনন্য।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২০ সালে হাসপাতালে মোট ছয় হাজার ৩৫৯ গর্ভবতী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে ৬৫৪ জনের নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। আর সিজারিয়ান হয়েছে তিন হাজার ২১০ জনের। এছাড়া আউটডোরে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন ২১ হাজার ৬৭৬ গর্ভবতী। চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত আউটডোরে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ১৭ হাজার ২ জন গর্ভবতী। এছাড়া ভর্তি হয়েছেন পাঁচ হাজার ৯৩১ গর্ভবতী। তাদের মধ্যে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ৫১৩ জনের। সিজারিয়ান হয়েছে দুই হাজার ৬০২ জনের।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ব্যবস্থাপক শাহীনা ইয়াসমিন জানান, নারী, শিশু, গর্ভবতীদের চিকিৎসার জন্য সাধারণ মানুষের মাঝে এখনও ব্যাপক সুপরিচিতি এ হাসপাতালের। যদিও মেডিকেল কলেজ হওয়ার পর এখানে সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। এখানে মাত্র দেড়শ টাকায় আউটডোরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দেন। মাত্র সাড়ে তিনশ টাকায় রোগী ভর্তি নেওয়া হয়। ওয়ার্ডের রোগীদের কোনো বেড ভাড়া দিতে হয় না। উপরন্তু রোগীদের তিনবেলা বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হয়।
ওয়ার্ডে চিকিৎসক ভিজিট ফি নেই। ওষুধসহ দশ হাজার টাকায় সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। আর নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে ব্যয় মাত্র দুই হাজার টাকা। ব্যথামুক্ত নরমাল ডেলিভারি হলে চার হাজার টাকা ব্যয় হয়।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের আরেক ব্যবস্থাপক মো. মুজাহিদুল ইসলাম জানান, এখানে ২৪ ঘণ্টাই সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও ইমার্জেন্সি রোগীদের জন্য যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালের ছয়টি কমিউনিটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে গর্ভবতী মায়েদের এই অ্যাম্বুলেন্সে করে বিনামূল্যে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এছাড়া শিশুদের জন্য এনআইসিইউ রয়েছে, যা এ অঞ্চলে আর কোনো হাসপাতালে নেই।

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শীলা পোদ্দার জানান, রাত-দিন কোনো সমস্যা নয়, এখানে মাত্র এক ঘণ্টার নোটিশে সিজার করা হয়, যা ইমার্জেন্সি প্রসূতি ও নবজাতকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর অপরিণত নবজাতকের জীবন বাঁচানোর জন্য এনআইসিইউ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যা এ হাসপাতালে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ হাসপাতালে রোগী আনার জন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয় না। এখানে যারা চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন, তারাই অন্য রোগীদের চিনিয়ে দেন। বংশ পরম্পরায় তাই আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ঘরে ঘরে মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে চলেছে।
কথা হয় হাসপাতালে ভর্তি যশোর সদর উপজেলার সতীঘাটা এলাকার লিটন সরকার ও মুক্তারাণী মণ্ডল দম্পতির সঙ্গে। তিন দিন আগে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে তাদের প্রথম সন্তান আলোর মুখ দেখেছে। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই খুশি।
লিটন সরকার জানান, গর্ভবতী মায়েদের চিকিৎসায় এলাকায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নামডাক শুনেই স্ত্রীকে এখানে ভর্তি করেছি। তুলনামূলক কম খরচে ভালো চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি নয় মাসের গর্ভবতী মারিয়া আক্তার দিশার শ্বশুরবাড়ি যশোর সদর উপজেলার সিরাজসিংহা গ্রামে। তার মা মণিরামপুরের খানপুর এলাকার খুরশিদা বেগম জানান, হঠাৎ করেই গর্ভবতী মেয়ের পানি ভাঙা শুরু হলে হাসপাতালে এনেছেন। চিকিৎসা চলছে। ডাক্তাররা অভয় দিয়েছেন। এখানে সেবা ভালো বলেই মেয়েকে ভর্তি করিয়েছেন।
মিলন রহমান/এফএ/আরএইচ/এমএস