জমি অধিগ্রহণের জন্য আটকে আছে সাপাহার অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ

আব্বাস আলী
আব্বাস আলী আব্বাস আলী , জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ০৩:৫২ পিএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২২

নওগাঁর সীমান্তবর্তী উপজেলা সাপাহারে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদনের সময় পেরিয়েছে দুই বছর। কিন্তু দৃশ্যমান কাজের অগ্রগতি করতে পারেনি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)।

ভূমি অধিগ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে সম্ভাব্য ব্যয় পাঠানোর এক বছর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও বেজা থেকে এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন সম্ভব হচ্ছে না। এতে প্রকল্পটির কাজ পিছিয়ে পড়ছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখা হাজারো বেকার যুবক এবং উদ্যোক্তাদের মাঝে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন-২০১০ এর ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রতিষ্ঠা করে সরকার। এ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে বলে জানানো হয়।

ঘোষণার পর ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে নওগাঁ-১ (সাপাহার-পোরশা-নিয়ামতপুর) আসনের সংসদ সদস্য খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শামসুল আলম শাহ চৌধুরী ও তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ফাহাদ পারভেজ বসুনীয়া সম্মিলিতভাবে সাপাহারে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে জোর সুপারিশ পাঠান।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সাপাহার অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদন দিয়ে ২০১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রস্তাবনায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর করেন প্রধানমন্ত্রী।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলা সীমান্তবর্তী সাপাহার উপজেলার খেড়ন্দা মৌজায় সাপাহার-খঞ্জনপুর বিওপি ক্যাম্পের রাস্তার উত্তরে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেজাকে ২৫৪ দশমিক ১৫ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব পাঠানো হয়।

যাচাই-বাছাই শেষে ওই মৌজার ২৫০ দশমিক ৬৩ একর জমি অধিগ্রহণের প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়ে ২০২০ সালের ২৯ জানুয়ারি জেলা প্রশাসককে চিঠি পাঠায় বেজা। এর ১১ দিন পর ভূমি অধিগ্রহণে সম্ভাব্য ব্যয় জানতে জেলা প্রশাসককে আবারো চিঠি পাঠায় বেজা। ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বরে ভূমি অধিগ্রহণের সম্ভাব্য ব্যয় হিসেবে ৭১ কোটি ৮১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বরাদ্দ চেয়ে জেলা প্রশাসকের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে বেজাকে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু এখনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

স্থানীয়রা জানান, জেলার ঠাঁ-ঠাঁ বরেন্দ্র ভূমি হিসেবে পরিচিত সীমান্তবর্তী এ উপজেলা ২৪৪.৪৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনে ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। যেখানে প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাস। এখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে এর আশেপাশে জেলার পোরশা, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, ধামইরহাট, মহাদেবপুর উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কয়েকটি উপজেলার ব্যাপক উন্নয়ন হবে। যেখানে সাপাহারসহ আশেপাশের উপজেলার হাজারো বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে উপজেলার আর্থিক উন্নয়নের পাশাপাশি বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় উন্নয়নের জোয়ার বইবে।

দুই বছর আগে যখন সাপাহারে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন প্রকল্পের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তখন এ উপজেলার হাজারো বেকার যুবক তাদের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। অর্থনৈতিক অঞ্চল হলে এখানে জুস কারখানা হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় এ অঞ্চলের আম চাষিরা অতিরিক্ত আয়ের স্বপ্ন বুনতে শুরু করে। জুস কারখানা হলে ওই অঞ্চলে সংরক্ষণাগারের অভাবে প্রতি বছর নষ্ট হওয়া কোটি টাকার আম বিক্রি করে লাভবান হবেন চাষিরা।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার পর অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এ অঞ্চলে আম চাষে বৃহৎ অংকের টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তবে দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হলেও অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন কাজের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না দেখা যাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২১ সালে জেলায় ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান ছিল। ২০২০ সালে ছিল ২৪ হাজার ৭৭৫ হেক্টর। এরমধ্যে সাপাহার উপজেলায় ৮ হাজার ৫২৫ হেক্টর এবং পোরশা উপজেলায় ১০ হাজার ৫৫০ হেক্টর।

উপজেলার খঞ্জনপুর গ্রামের বাসিন্দা ইমরান হোসেন। খেড়ন্দা মৌজায় তাদের দুই বিঘা ফসলি জমিতে আম বাগান করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেই জমি অধিগ্রহণ হবে শুনে সেখানে এখন আলু চাষ করছেন।

ইমরান হোসেন বলেন, গত কয়েক বছর থেকে শুনছি এ এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হবে। যেখানে বিভিন্ন শিল্প কারখানা তৈরি করা হবে। যার কারণে জমিতে আম বাগান করা হয়নি। এছাড়া আশপাশের জমির মালিকরাও কেউ আম বাগান করেনি। যদি আম বাগান করা সব গাছ নষ্ট হয়ে যাবে এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। এ কারণে জমির মালিকরা আলু, গম ও সরিষা লাগিয়েছে। তবে জমি অধিগ্রহণ করা হলে যেন ন্যায্যমূল্য দেওয়া হয়।

সাপাহার উপজেলার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম, আমানউল্লাহ, সেলিম রেজা, রুবেল হোসেন, শাহরিয়ার ও এনামুল হকসহ একাধিক তরুণ উদ্যোক্তা বলেন, প্রতি বছর আমের মৌসুমে কয়েক হাজার তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় ক্রেতাদের কাছে আম পাঠানো হয়। সংরক্ষণাগারের অভাবে প্রতি মৌসুমেই অতিরিক্ত পাকা আম নামমাত্র দামে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে হয়। এতে লক্ষাধিক টাকা লোকসান গুনতে হয়। অর্থনৈতিক অঞ্চল থাকলে এখানে কোম্পানিগুলো জুস কারখানা গড়ে তুলতো। জুসের পাশাপাশি আচারসহ সবকিছুই তৈরি হতো। এতে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা করার একটি সুযোগ তৈরি হবে। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন তারা।

সাপাহার বরেন্দ্র এগ্রো পার্ক এর সত্ত্বাধিকারী ও তরুণ উদ্যোক্তা সোহেল রানা বলেন, কৃষি প্রধান জেলার মধ্যে সাপাহার উপজেলা আমের জন্য বিখ্যাত। এ উপজেলা আমের নতুন রাজধানী হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে যা দুই বছর থেকে শুনছি। গত দুই বছরে কৃষিতে অনেক উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হওয়ার অপেক্ষায় আছি। যেখানে কৃষিপণ্য আম, পেয়ারা, মাল্টা ও ড্রাগন প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু হবে। জেলায় বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মতো আম উৎপাদন হয়। এরমধ্যে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কয়েক কোটি টাকার আম নষ্ট হয়ে যায়। আমগুলো যদি প্রক্রিয়াকরণ করা হয় তাহলে অর্থনীতিতে বড় একটা ভূমিকা রাখবে। এছাড়া কৃষি কেন্দ্রিক রপ্তানি পণ্য তৈরি করতে পারবো। আমরা চাই দ্রুত অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করা হোক। এতে হাজারো বেকারদের কর্মসংস্থান হবে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। এখানে কৃষি কেন্দ্রিক প্রায় তিন হাজার উদ্যোক্তা রয়েছে।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সুমন জিহাদী জাগো নিউজকে বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের আনুষঙ্গিক খরচসহ সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি চিঠি বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যানকে পাঠানো হয়েছে। বেজা থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দিলে বিষয়টি নিয়ে জেলা ভূমি বরাদ্দ কমিটির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হবে। অধিগ্রহণে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই।

নওগাঁ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক ইকবাল শাহরিয়ার রাসেল জাগো নিউজকে বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভালো একটা ভূমিকা রাখবে। কৃষিভিত্তিক জেলা ধান ও আমকে ব্র্যান্ডিং করে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা একান্ত প্রয়োজন। বাইরের দেশে ফল প্রসেসিং ও প্যাকেটজাত করে বছর জুড়ে খেতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয় না। অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে যখন বড় ব্যবসায়ীরা এখানে শিল্পকারখানা গড়ে তুলবে তখন অর্থনৈতিক চাকা সচল হবে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন মজুমদার এটার বিষয়ে খুবই তৎপর রয়েছে। এছাড়া চেম্বার অব কর্মাস থেকে আমাদেরও একটা দায়িত্ব আছে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান চলতি মাসে সাপাহারের ও এলাকা পরিদর্শন করার কথা। এছাড়া এফবিসিসিআইয়ের সভাপতিও পরিদর্শন করার কথা রয়েছে। তবে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে কি অবস্থা দাঁড়াবে তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব না।

নওগাঁ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মিল্টন চন্দ্র রায় বলেন, সাপাহার অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে জমির বিস্তারিত বিবরণ ও পূর্ণাঙ্গ তফসিলসহ বেজাতে পাঠানো হয়েছে। এরপর ওপর থেকে কোনো অগ্রগতি আমাদের কাছে আসেনি। তবে এখানে কি ধরনের ইন্ডাস্ট্রি হবে বা মানুষের কর্মসংস্থান হবে তার কোনো তথ্য আমরা পাইনি। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার পাশাপাশি জীবনমান উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। ভারত সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানে আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।

আব্বাস আলী/এসজে/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]