‘রকেট হামলার দুই ঘণ্টা পর বুঝতে পারি হাদিসুর মারা গেছে’

আবুল হাসনাত মো. রাফি আবুল হাসনাত মো. রাফি , ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ০৫:৫৪ পিএম, ১০ মার্চ ২০২২
বাংলার সমৃদ্ধির চিফ ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আসিফুল ইসলাম/ছবি: জাগো নিউজ

ইউক্রেনের অলিভিয়া বন্দরে রকেট হামলার শিকার বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’র ২৮ নাবিক নিরাপদে দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন জাহাজটির চিফ ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ আসিফুল ইসলাম। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের ফুলবাড়িয়া এলাকার রেলওয়ের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ নুরুল ইসলামের বড় ছেলে। আসিফুল সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার হন।

বুধবার (৯ মার্চ) রাত ৯টার দিকে তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। আসিফুলকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত স্বজনরা। ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেয়ে দেশে ফিরতে পেরে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করেন আসিফুল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট হাইকমিশন ও দেশবাসীর প্রতি।

বৃহস্পতিবার (১০ মার্চ) সকালে সৈয়দ আসিফুল ইসলামের বাড়িতে কথা হয় জাগো নিউজের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি আবুল হাসনাত মো. রাফির। এসময় তিনি ইউক্রেনে যুদ্ধ ও বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে রকেট হামলার ঘটনা তুলে ধরেন।

‘রকেট হামলার দুই ঘণ্টা পর বুঝতে পারি হাদিসুর মারা গেছে’

সৈয়দ আসিফুল ইসলাম বলেন, বাড়িতে ফিরে এসে অনেক স্বস্তি লাগছে। সেখানে অনেক ভয়ে ছিলাম। ইতোমধ্যে আমরা সহকর্মী থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমানকে হারিয়েছি। আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাত নসিব করুন। আর যেন কারও এভাবে প্রাণহানি না হয়।

তিনি বলেন, হাদিস আসরের নামাজের পরে ছয়তলার ওপর ব্রিজে যায় মোবাইলে কথা বলার জন্য। সেখানে নেটওয়ার্ক ভালো পাওয়া যেত। এর মধ্যে তার থেকে ২-৩ ফুট দূরে রকেটটি পড়ে। প্রথমে আমরা কেউ বুঝতে পারিনি হাদিস মারা গেছে। রকেট হামলায় অগ্নিনির্বাপণের দুই ঘণ্টা পর বুঝতে পারি হাদিস যে মারা গেছে।

‘সেদিন তুমুল হামলা হয় ইউক্রেনে। আমরা ভাবতে পারিনি আমাদের জাহাজে হামলা হবে। আমরা তো কারও শত্রু ছিলাম না। আমরা গিয়েছিলাম ব্যবসা করতে। এখন ইউক্রেন নাকি রাশিয়া এই হামলা করেছে তা বলতে পারছি না। আমরা ভয়ে ছিলাম।’

সেই ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আসিফুল বলেন, রকেট হামলা হয়েছিল জাহাজের ছয়তলার ছাদে। হামলার পর আমাদের প্রথম কাজ ছিল আগুন নেভানো। তা না হলে সবাইকে আগুনে পুড়ে মরতে হবে। আমাদের ফোকাস ছিল আগুনের দিকে। সেখানে ছিল প্রচণ্ড শীত। যদি জাহাজ থেকে নেমে যেতে হয় তখন কোথায় থাকবো, তখনো সেফ এক্সিটের আমাদের কোনো প্ল্যান হয়নি। যদি জাহাজ থেকে নামি তাহলে শীতেই অবস্থা খারাপ হয়ে যেত। যদি আমাদের কেউ উদ্ধার করতে না-ও আসে যেন জাহাজে কয়েকদিন অন্তত থাকতে পরি, তাই আমাদের ফোকাস ছিল আগুনের দিকে। অগ্নিনির্বাপণের পর আমরা হাদিসুরের মরদেহ উদ্ধার করে ফ্রিজিং কক্ষে রাখি। এর একদিন পরই আমাদের উদ্ধার করা হয়।

‘রকেট হামলার দুই ঘণ্টা পর বুঝতে পারি হাদিসুর মারা গেছে’

তিনি বলেন, আমরা ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখ দুপুরে ইউক্রেন বন্দরে পৌঁছাই। ২৪ তারিখ হামলার ঘটনা ঘটে। আমরা ধারণা করতে পারিনি রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। আমাদের কাছে তথ্য ছিল রাশিয়া ইউক্রেন সীমান্ত থেকে তাদের সৈন্য উঠিয়ে নিয়ে গেছে। ভেবেছিলাম পরিস্থিতি ভালো হবে। হামলা হবে আমাদের কেউ বুঝতেই পারিনি।

বাড়ি ফেরার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, এখন বাসায় ফিরে ভালো লাগছে। আমি প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বিশেষ করে বাংলাদেশ হাইকমিশন, পোল্যান্ড হাইকমিশন, রোমানিয়া হাইকমিশনের প্রতি কৃতজ্ঞ। দেশবাসীর প্রতিও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, তারা দোয়া করেছেন। সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমরা ২৮ জন মা-বাবার কাছে ফিরে আসতে পেরেছি

নিজের ছেলেকে কাছে পেয়ে আসিফুলের বাবা সৈয়দ নুরুল ইসলাম আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমার ছেলেসহ অন্য নাবিকরা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তাই সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

এমআরআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।