আখের দাম বাড়িয়ে মিল চালুর চিন্তা করছে করপোরেশন-মন্ত্রণালয়

এমদাদুল হক মিলন এমদাদুল হক মিলন , দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৯:৪৩ পিএম, ৩১ মার্চ ২০২২

অডিও শুনুন

৮৪ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে আনুষ্ঠানিকভাবে আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এক সময়ের লাভজনক প্রতিষ্ঠান দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ চিনিকলে। চাকা বন্ধ থাকায় মিলের জায়গা-জমি এবং পুকুর-জলাশয় লিজ দেওয়া ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর তেমন কোনো কাজ নেই। তবে সম্প্রতি সরকারের সংশ্লিষ্ট একটি দল কারখানাটি পরিদর্শন করেছেন। তাই মিলটি আবার চালুর আশা করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

১৯৩৩ সালে ভারতের কিবালিন সুরজমল আগারওয়ালা এবং নাগরমল আগারওয়ালা ইন্দোনেশিয়া থেকে পুরাতন যন্ত্রপাতি এনে ৮ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন সেতাবগঞ্জ চিনিকলটি স্থাপন করেন। জমির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৬০ দশমিক ৫০ একর। ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত মিলনটি মাড়োয়ারিদের ব্যবস্থাপনায় ছিল। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় মাড়োয়ারিরা দেশ ত্যাগ করেন। সেসময় পাকিস্তান সরকারের পক্ষে বি কে রহমান কাস্টোডিয়ান মিলটির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কয়েক মাস পরে ইপিআইডিসির ওপর মিলটির দায়িত্বভার দেওয়া হয়।

আখের দাম বাড়িয়ে মিল চালুর চিন্তা করছে করপোরেশন-মন্ত্রণালয়

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চিনিকলটির মেশিনপত্র ধ্বংস হওয়ায় ১৯৭৪ সালে মিলটি লে-অফ ঘোষণা করে দেওয়া হয়। এই অঞ্চলের জমি, আবহাওয়া ও প্রকৃতি আখ চাষের উপযোগী হওয়ায় এবং মিলের বেকার শ্রমিক-কর্মচারী ও জনগণের কথা চিন্তা করে হাজী মোহাম্মদ দানেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা এবং স্বেচ্ছাসেবীদের প্রচেষ্টায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৯৮২ সালে মিলটিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা হয়।

আখের দাম বাড়িয়ে মিল চালুর চিন্তা করছে করপোরেশন-মন্ত্রণালয়

শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক হলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ, চুরি, ট্রেড ইউনিয়ন, দুর্নীতি-অনিয়মসহ নানা কারণে ৯০-এর দশকের পর থেকে লোকসানের মুখে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় আনুষ্ঠানিকভাবে আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ হওয়া পর্যন্ত সেতাবগঞ্জ চিনিকলের লোকসানের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ৮৪ কোটি টাকা। ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ২০২০-২১ আখ মাড়াই মৌসুম শেষ হওয়ার পর সেতাবগঞ্জ চিনিকলসহ ছয়টি চিনিকলে আখ মাড়াই কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সেই থেকে চিনিকলটির চাকা বন্ধ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থায়ী-অস্থায়ী সব মিলিয়ে ১৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো কর্মরত রয়েছেন। চলতি মাসসহ প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের আট মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। সবশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের বেতন দেওয়া হয়। প্রতি মাসে বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়। মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারীদের এই বকেয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে বর্তমানে মিলের জায়গা-জমি এবং পুকুর-জলাশয় লিজ দেওয়া ছাড়া কার্যত আর তেমন কোনো কাজ নেই।

আখের দাম বাড়িয়ে মিল চালুর চিন্তা করছে করপোরেশন-মন্ত্রণালয়

সেতাবগঞ্জ চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হুমায়ন কবীর জাগো নিউজকে জানান, বন্ধের পর থেকে চিনিকলের চাষযোগ্য প্রায় ২ হাজার ৭২১ দশমিক ৩০ একর জায়গা লিজ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পুকুর জলাশয়ও মাছ চাষের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে। লিজ দেওয়া হয়েছে আম বাগান। ১৯ একরের ড্রাগন বাগান তিন বছরের জন্য ৫৭ লাখ টাকায় লিজ দেওয়া হয়েছে। চিনিকলের গোডাউনে কোনো চিনি বা চিটাগুড় মজুত নেই।

তিনি জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি দল আখ মাড়াই স্থগিত থাকা মিলগুলো পরিদর্শন করেছেন। যে ছয়টি মিল পরিদর্শন করেছেন তার মধ্যে সেতাবগঞ্জ চিনি কলটি সবার আগে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মিলিটি যন্ত্রপাতি, জমি এবং আখ চাষের পরিবেশের দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে। যে কোনো সময় মিলটি চালু হতে পারে।

আখের দাম বাড়িয়ে মিল চালুর চিন্তা করছে করপোরেশন-মন্ত্রণালয়

মো. হুমায়ন কবীর বলেন, মিলটি একেবারে বন্ধ করা হয়নি। কোনো শ্রমিকও ছাঁটাই করা হয়নি। শ্রমিক-কর্মচারীর সংকট মোকাবিলায় মন্ত্রণালয় চালু থাকা সুগার মিলগুলোতে বন্ধ মিলগুলোর শ্রমিক-কর্মচারী বদলি করেছে।

তিনি আরও বলেন, সরকার কৃষকদের আখ চাষে আগ্রহী করে তুলতে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগে আখের মূল্য ছিল ৩ হাজার ৫৫০ টাকা টন। সরকার বর্তমানে তা বৃদ্ধি করে ৪ হাজার ৫০০ টাকা টন করার চিন্তাভাবনা করছে। যাতে করে মিলগুলোতে আখের কোনো সংকট না হয়।

এমআরআর/জেআইএম

টাইমলাইন  

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।