ফোনে তালাকের পর তিন মাস ধরে গৃহবধূকে নির্যাতনের অভিযোগ
নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলায় আমিনা বেগম (২৫) নামে এক গৃহবধূকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করতে তিনমাস ধরে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। দুই শিশু সন্তানসহ ওই গৃহবধূকে ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হচ্ছে না।
ঘটনার প্রতিকার চেয়ে ওই গৃহবধূর মা লাইলি বেগম থানায় অভিযোগ করতে যান। কিন্তু অভিযোগ না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ওই গৃহবধূর স্বামী ফারুক ইসলাম (৪৫) ব্রুনাই প্রবাসী। তার বাড়ি উপজেলার নজিপুর পৌরসভার হরিরামপুর পশ্চিমপাড়ায়। তিনি আদম ব্যাপারি।
গৃহবধূর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আট বছর আগে ধামইরহাট উপজেলার আলমপুর ইউনিয়নের ভেড়ম সোনাদিঘী গ্রামের মৃত আব্দুল হাইয়ের ছেলে ফারুক ইসলামের সঙ্গে পত্নীতলা উপজেলার আকবরপুর ইউনিয়নের বনী গ্রামের লুৎফর রহমানের মেয়ে আমিনা বেগমের বিয়ে হয়। মেয়ের সুখের জন্য বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে নগদ ২ লাখ টাকাও দেওয়া হয়।
কয়েক বছর আগে পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর পৌরসভার হরিরামপুর পশ্চিমপাড়ায় জমি কিনে সেখানে চারতলা ভবন নির্মাণ করেছেন ফারুক হোসেন। সেখানে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। এরমধ্যে দুই সন্তান ফারহানা ফিন্নি (৫) ও ফারিয়া আক্তার রাখির (২) জন্ম হয়। ফরুকের শাশুড়ি লাইলি বেগম ও শালিকা মিনা খাতুন তাদের সঙ্গেই বসবাস করতেন।

তিন বছর আগে ফারুক দেশে আসেন। এক বছর আগে এক ব্যক্তিকে বিদেশ নিয়ে যান।
অভিযোগ ওঠে ওই ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইলে পরকীয়া শুরু করেন ফারুক। এরপর থেকে সংসারে অশান্তি শুরু হয়। বিদেশ থেকে ফারুক তার স্ত্রীকে মোবাইলের মাধ্যমে তালাক দিয়েছেন। এরপর তিনমাস থেকে ফারুক তার মাকে তার বাসায় এনে রেখেছেন। বাসার মূল দরজা সবসময় তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। প্রয়োজনেও বাসার বাইরে বের হওয়া সম্ভব হয় না।
আমিনার মা লাইলির অভিযোগ, গেট বন্ধ থাকায় তার নাতনি স্কুলে ঠিকমতো যেতে পারছে না। এমনকি তাদের ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হচ্ছে না। স্কুলে গেলেও ফেরার পর অনেকক্ষণ দরজা খোলা হয় না। আমিনা বাসার বাইরে গেলে আর হয়ত ঢুকতে দেওয়া হবে না। এই ভয়ে তিনিও বাসা থেকে বের হচ্ছেন না। বিতাড়িত হওয়ার ভয়ে নীরবে তিনি কষ্ট সহ্য করছেন।
সোমবার (২৮ মার্চ) বড় মেয়ে ফারহানা ফিন্নি স্কুলে যাবে বলে শাশুড়িকে দরজা খুলতে বললে তার শাশুড়ি, আত্মীয় নন্দু, মিন্টু, পরাগ, বদুল, সাগর ও ম্যানেজার বেলাল তাকে মারপিট করেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান সালিশ বৈঠক করেন। সেখানে খাওয়া পরা ও মেয়েদের পড়াশুনা বাবদ মাসে ১২ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তিনমাসে মাত্র ৫ হাজার টাকা তাদের দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ নির্যাতিতার।
গৃহবধূর মা লাইলি বেগম বলেন, জামাই (ফারুক) মেয়েকে ব্রুনাই নিয়ে যাবে বলে সেসময় ভিসা ও পাসপোর্ট বাবদ ৬০ হাজার টাকা খরচ করেছিলাম। এরপর আট মাসের জন্য মেয়ে ব্রুনাই যায়। সেখান থেকে দেশে ফিরে আসে। পরে জামাইও দেশে আসে। যেহেতু আমার দুই মেয়ে, কোনো ছেলে সন্তান নাই। ছোট মেয়ে মিনা খাতুনসহ আমাকে বড় মেয়ের সঙ্গে থাকার জন্য জামাই অনুরোধ করেছিল। পরে নিজের জায়গা জমি বিক্রি করে প্রায় ২৯ লাখ টাকা খরচ করে জামাইকে নজিপুর শহরে জমি কেনা ও বাসা তৈরির কাজে সহযোগিতা করি।
তিনি বলেন, গত চার বছর থেকে বড় মেয়ের সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু তিনমাস থেকে আমার মেয়ের ওপর তার শাশুড়ি ও আত্মীয়স্বজনরা নির্যাতন করছে। নাতনিকে নিয়ে সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় বাসার দরজা খুলে দিতে চায় না। আবার স্কুল থেকে ফিরে এলে বাসায় ঢুকতে দেয় না। বাসার বাইরে ও প্রতিবেশীদের বাসায় সময় কাটাতে হয়। বাসায় ঢুকতে বিকেল ও সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
থানায় অভিযোগ দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু অভিযোগ না নিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।
ভুক্তভোগী গৃহবধূ আমিনা বেগম বলেন, স্বামীর পরকীয়ার পর থেকে সংসারে অশান্তি শুরু হয়েছে। স্বামী এখনো বিদেশে থাকে। কিন্তু কয়েকদিন আগেও স্বামী তার ম্যানেজার বেলালের মাধ্যমে পরকীয়া করা ওই নারীকে বাসায় জোর করে রাখে। স্বামী বিদেশ থেকেই মোবাইলে তালাক দিয়েছে। আমাকে বাসা থেকে বিতাড়িত করতে কারণে অকারণে শ্বশুরবাড়ির লোকজন নির্যাতন করছে। সালিশে মাসে ১২ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও তিনমাসে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বাসা থেকে বের হলে হয়ত আমি আর বাসায় ঢুকতে পারবো না এজন্য নীরবে তাদের নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছি। বিষয়টি সমাধানের জন্য পুলিশকে ফোন করেছিলাম। সবকিছু জানার পরও প্রশাসন পাশে না দাঁড়িয়ে চুপ রয়েছে। আমার জীবন নিয়ে শঙ্কায় আছি।
তবে আমিনা বেগমের শাশুড়ি ফাতেমা বেগম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ছেলে বিদেশে থাকে। ছেলের কথায় তিনমাস থেকে তার বাসায় থাকছি। ছেলের বউকে কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি। বরং আমাকেই মারপিট করেছে ছেলের বউ। এছাড়া আমার ছেলের অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক নেই।
বাসার মূল দরজায় তালাবদ্ধ রাখা, নাতনিকে স্কুলে যেতে না দেওয়া ও খাবার দেওয়া হয় না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সবসময় দরজা না খোলার জন্য ছেলের নিষেধ আছে। নাতনি নিয়মিত স্কুলে যায়। আর খাবার না দিলে তারা এতোদিন বেঁচে আছে কিভাবে।
স্থানীয় রুবেল হোসেন, জান্নাতুন বেগম ও মাহমুদা বলেন, ফারুক হোসেন এক নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। এরপর থেকে এ সংসারে অশান্তি শুরু হয়েছে। বেশ কিছুদিন থেকে আমিনা বেগমের কান্না ও চিৎকার শোনা যাচ্ছে। বাসায় কিছুদিন থেকে ফারুকের মা (ফাতেমা) আছেন। ছেলে যা বলে তিনি তাই করেন। সবসময় বাসার মূল দরজায় তিনি তালা লাগিয়ে রেখেছেন। দুই বাচ্চা তার নানির সঙ্গে দীর্ঘ সময় বাইরে অপেক্ষা করে। এমনকি প্রতিবেশীদের বাসায় সময় কাটাতে হচ্ছে। নিয়ম কানুন না মেনেই ফারুক বিদেশ থেকে মোবাইলে তালাক দিয়েছেন। কয়েকদিন আগেও পরকীয়ায় জড়িত ওই নারী এই বাসায় এসেছিলো। এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
পত্নীতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গাফ্ফার বলেন, চারমাস আগে ওই পরিবারের বিষয়ে উভয়পক্ষকে নিয়ে বসে ভরণপোষণ ও বাচ্চাদের পড়াশুনা বাবদ মাসে ১২ হাজার টাকা করে দেবে মর্মে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল। তারা মেনেও নিয়েছেন। এছাড়া যেহেতু ওই গৃহবধূর স্বামী বিদেশ থাকেন তিনি দেশে ফিরে আসলে তারা তাদের মতো সিদ্ধান্ত নেবেন।
পত্নীতলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামসুল আলম শাহ বলেন, ওই পরিবারের বিষয়ে থানায় লিখিত কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি। গৃহবধূকে নির্যাতন করা হয়েছে মর্মে তার মায়ের (লাইলি বেগম) মৌখিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলে দুইজন পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আব্বাস আলী/এফএ/জিকেএস