বর্ণাঢ্য আয়োজনে বর্ষবরণে যশোরে ব্যাপক প্রস্তুতি
আর মাত্র একদিন পরই বিদায় নেবে বাংলা সাল ১৪২৮। শুরু হবে নতুনবর্ষ ১৪২৯। পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নববর্ষের প্রথমদিন পহেলা বৈশাখকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হচ্ছে যশোর। করোনাভাইরাসের কারণে গত দুই বছর গৃহবন্দি থাকার পর ধর্ম-বর্ণ-ধনী-গরিব নির্বিশেষে মিলবে মিলন মেলায়। তাই বর্ণাঢ্য আয়োজনে উৎসব উদযাপন প্রস্তুতি নিয়েছে যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।
পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। সারাবিশ্বের বাঙালিরা নেচে-গেয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় উদযাপন করেন দিনটি। ইউনেসকোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ স্বীকৃতি পাওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার শুরু হয়েছিল যশোর থেকেই।
সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, এ বছর পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে বিকেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকছে না। তবে বাংলা নববর্ষের প্রথম প্রহরে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনের আয়োজনে শহরের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বসবে মানুষের মিলনমেলা।
বৃহস্পতিবার (১৪ এপ্রিল) নতুন বছরের সূর্যোদয়ের পরপরই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ঐতিহাসিক টাউন হল ময়দান থেকে সকাল ৯টায় বের হবে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। যশোর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে জেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় হবে এ শোভাযাত্রা।
চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট যশোরের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মাহবুব জামাল শামীম বলেন, যশোরের চারুপীঠ বর্ষবরণ উপলক্ষে ১৯৮৫ সালে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রা বের করে। এর আগে এই উপমহাদেশে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শোভাযাত্রার কোনো ইতিহাস নেই। সেদিনের সে আয়োজনের পর তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকী প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয় নববর্ষের এ আয়োজন। পরবর্তী সময়ে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’র নামকরণ হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।
তিনি আরও বলেন, যশোরে চারুপীঠের পর ১৯৮৯ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করেন। ১৯৯০ সালে বরিশাল ও ময়মনসিংহ শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এর চার বছর পর ১৯৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও শহরে ও শান্তিনিকেতনে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। এরপর ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেসকো বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে যশোরের এ শোভাযাত্রা।

চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট যশোরের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ জানান, চারুপীঠের শিল্পীরা প্রতিবছরের মতো এ বছরও সৃষ্টি করে চলেছেন নানা শিল্পকর্ম। যুগোপযোগী সহজবহনযোগ্য ও সাশ্রয়ী উপকরণ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের পাপেট ও উজ্জ্বল রঙের মুকুট তৈরিতে ব্যস্তসময় পার করছেন শিল্পীরা। যা বরাবরের মতো এবারও যশোরবাসীকে মুগ্ধ করবে।
চারুতীর্থ যশোরও মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বর্ণিল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি কাজী ইমদাদুল হক দুলাল ও শিক্ষক সজল ব্যানার্জি জানান, মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বর্ণাঢ্য ও বর্ণিল করতে চারুতীর্থের শিক্ষার্থীরা ৫ থেকে ৬ ফুট উচ্চতার বিশেষ পাখিসহ তৈরি করছে বাঘ ও পেঁচা। এছাড়া শোলা দিয়ে তৈরি রং-বেরঙের রাজা, রানী, ফুল, পাখি, প্রজাপতি, পেঁচা এবং কাগজের মুকুট। শিক্ষার্থীরা ‘যেমন খুশি তেমন সেজে’ আসবে; যা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ভিন্ন মাত্রা এনে দেবে।
থিয়েটার ক্যানভাসের প্রধান সম্পাদক কামরুল হাসান রিপন জানান, আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে লোকজ সংস্কৃতি ফুটিয়ে তুলবো, যেখানে দুই শতাধিক তরুণ নাট্যকর্মী অংশ নেবেন। সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতি চলছে। এরপর সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত মঞ্চে হবে ঝাঁলমুখের আয়োজন থিয়েটার ক্যানভাসের অভিষেক অনুষ্ঠান।
এদিকে উৎসবকে প্রাণের উচ্ছ্বাসে মাতাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে উদীচী, সুরবিতান, তির্যক, পুনশ্চ, স্পন্দন, জেলা শিল্পকলা একাডেমিসহ যশোরের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
বরাবরের মতো পৌর উদ্যানে সকাল ৭টায় উদীচী যশোরের আয়োজনে হবে ‘নতুন আশা-নতুন প্রাণ, নতুন বছর-নতুন গান’ শীর্ষক প্রায় আড়াই ঘণ্টার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এ বিষয়ে উদীচী যশোরের নববর্ষ উদযাপনের সদস্য সচিব সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব জানান, পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে এ বছরের বর্ষবরণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময় প্রায় অর্ধেক করা হয়েছে। শিশু-কিশোরসহ প্রায় তিনশ সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়শিল্পী বৈচিত্র্যময় নানা আয়োজনে নববর্ষ উৎসবের ৪৭ বছরে পা রাখছে এ সংগঠন।
নববর্ষের প্রথম দিন ভোর সাড়ে ৬টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ মাঠে বাংলা বর্ষবরণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করবে তির্যক যশোর। তির্যক যশোরের সাধারণ সম্পাদক দীপংকর দাস রতন এ তথ্য জানিয়ে বলেন, বাংলা বর্ষবরণে সংগঠন কার্যালয়ে চলছে ব্যাপক তোড়জোড়।
বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে ভোর সাড়ে ৬টায় মুসলিম একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘চিত্তে জাগাও মূর্ত সুরের ছন্দ’ শীর্ষক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে পুনশ্চ যশোর।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক পান্না দে জানান, এরই মধ্যে সংগঠনের প্রশিক্ষণ কক্ষে মহড়া চলছে।
মিলন রহমান/এসআর/এএসএম