বৃষ্টির দেখা নেই, ফরিদপুরে খরায় পুড়ছে পাটচাষিদের স্বপ্ন
ভ্যাপসা গরম। প্রখর রোদ। বৃষ্টির দেখা নেই। তীব্র তাপদাহ আর অনাবৃষ্টির কারণে ফরিদপুরে পুড়ছে পাটক্ষেত। তপ্ত খরায় শুকিয়ে যাচ্ছে পাটগাছ। মাটি ফেটে চৌচির। ফলে ফরিদপুরের পাটচাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, চলতি মৌসুমে পাট আবাদের শুরু থেকেই বৃষ্টির দেখা না মেলায় ডিজেলচালিত ইঞ্জিন ও বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। এছাড়া প্রচণ্ড খরায় জমির আগাছা পরিষ্কার করতে পারছেন না কৃষকরা। এ অবস্থায় পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
ফরিদপুরের সালথা, বোয়ালমারী, মধুখালী, আলফাডাঙ্গা, ভাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েকটি মাঠে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকেরা রোদে পুড়ে পাট খেতের যত্ন নিচ্ছেন। মাটি ফেটে গেছে। কেউ সেচ দিচ্ছেন, কেউ নিড়ানি দিচ্ছেন। কেউ বা আবার বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করছেন। কৃষকেরা দুশ্চিন্তার পাশাপাশি বৃষ্টির জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া ও প্রার্থনা করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের সিংহভাগ পাটের আবাদ হয় ফরিদপুরে। গত বছর ফরিদপুরের ৯টি উপজেলায় ৮৬ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে পাটে আবাদ হয়েছিল।
মধুখালী উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়নের মির্জাকান্দি গ্রামের কৃষক আহমদ শেখ জাগো নিউজকে বলেন, একবার সেচ দিয়ে পাট লাগিয়েছি। এখন বৃষ্টির দেখা নেই। মাটি ফেটে গেছে। পানির দরকার। আমি ছয় পাখি (২১০ শতক) জমিতে পাট আবাদ করেছি। এক পাখি জমিতে সেচ দিতে সাতশো, আটশো টাকা লাগে। এই টাকা দিয়ে আবার সেচ দিতে গেলে জান থাকে না। সরকার যদি আমাদের একটু সাহায্য করতো তাহলে উপকার হতো।
বোয়ালমারী উপজেলার টোংরাইল গ্রামের কৃষক জয়দেব বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, বৃষ্টির আশায় বসে না থেকে সেচ দিয়ে পাট আবাদ করেছি। বেশিরভাগ জমির পাট ৭/৮ ইঞ্চি লম্বা হয়েছে। পাটের জমির মাটি ফেটে চৌচির। এসব পাটক্ষেতে এখন পানির প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি হলে ভালো হতো। পাট বাঁচাতে হলে সেচ দিতে হবে।

আলফাডাঙ্গা উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বাকাইল গ্রামের চাষি বিভূতি মণ্ডল, সালথা উপজেলার আকমল শেখ জাগো নিউজকে বলেন, গত বছর পাটের ভালো দাম পেয়ে এবার আরও বেশি জমিতে পাট চাষ করেছি। অনাবৃষ্টির কারণে এবার ঘন ঘন সেচ দিতে হচ্ছে। তার পরও পাটগাছ বাড়ছে না। বৃষ্টি না হওয়ায় জমির আগাছা নিড়ানি দেওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে পাট নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অনেক কৃষকেরা তপ্ত রোদে পাটের জমিতে সেচ দিচ্ছেন। এতে ভালো-মন্দ দুই দিকই আছে। প্রখর রোদে দুপুর বেলা সেচ দিলে বেশি ক্ষতি হয়। সেচ দেওয়ার নিয়ম সন্ধ্যার পর। এ নিয়ম না মানলে তাপদাহে পাটগাছে পোকার উপদ্রব বেড়ে যাবে। ফলে পাটের কচি পাতা কুঁকড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এ অবস্থায় কীটনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ফরিদপুর পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃষিবিদ রণজিৎ কুমার ঘোষ বলেন, প্রচণ্ড খরা আর তাপদাহ পাটের জন্য ক্ষতিকর। এতে পোকার আক্রমণ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। খরায় মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় পোকা পাটের কচি পাতা ও ডগা কেটে দিচ্ছে। এ ধরনের পোকাগুলো দিনে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে। সন্ধ্যায় বেরিয়ে আসে। নিড়ানি দিতে হবে। তাহলে উপকার পাওয়া যাবে। বৃষ্টি না হলে সেচের বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. হযরত আলী জাগো নিউজকে বলেন, চলতি মৌসুমে ফরিদপুরে মোট ৯টি উপজেলায় পাটের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার ৮০ শতাংশ পাট চাষ হয়েছে যার সবই ইরিগেশনের মাধ্যমে। চলতি মাসজুড়েই পাট চাষ করা যাবে। কৃষকেরা আবাদে ব্যস্ত। বৃষ্টির দেখা নেই। কী আর করার। মানুষের তো হাত নেই, এতে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না, খরচ বেশি হলেও অনেকেই সেচ দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত পোকার আক্রমণের কথা শোনা যায়নি। এবারও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ও ভালো ফলনের আশাবাদী।
এন কে বি নয়ন/এমআরআর/এমএস