রিকশা চালিয়ে হলেও মাকে খাওয়াবে বলা ছেলেটাই রেখে গেছে বৃদ্ধাশ্রমে

আমিনুল ইসলাম
আমিনুল ইসলাম আমিনুল ইসলাম , জেলা প্রতিনিধি গাজীপুর
প্রকাশিত: ১০:৩৯ এএম, ০৮ মে ২০২২
বৃদ্ধাশ্রমে থাকা এক মা

গোপালগঞ্জে মমতাজ বেগমের (৫৫) দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ছিল। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে বাবার জমানো টাকার ওপর নির্ভরশীল। ছোট ছেলে ব্যবসা করেন।

মমতাজ বলেন, ‘ছোট ছেলেটা কথা দিয়েছিল প্রয়োজনে রিকশা চালিয়ে আমাকে খাওয়াবে। অথচ সেই ছেলেটা আট বছর আগে আমাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে গেছে। মাঝে কয়েকবার এসে দেখে গেছে। কিন্তু এই আট বছরে বড় ছেলেটার দেখা পাইনি।’

এবারের ঈদেও ছেলেদের অপেক্ষায় ছিলেন মমতাজ বেগম। ভেবেছিলেন আনন্দের দিনে অন্তত ছেলেরা এসে দেখে যাবে।

‘সকাল, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি। ওরা কেউ আসেনি’ চোখ মুছতে মুছতে বললেন মমতাজ বেগম।

ma1

মা দিবসে সন্তানরা মায়ের কোনো খোঁজ খবর না নিলেও মা সারা বছর পথ চেয়ে বসে থাকেন কখন আসবে তার সন্তান। জীবনের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করা হলেও শেষ জীবনে এত কষ্ট করতে হবে তা ভেবেও পাচ্ছেন না বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মায়েরা। কেবল আক্ষেপ, জীবনের শেষ অধ্যায়টা কাটাতে পারছেন না সন্তানদের সঙ্গে।

গাজীপুর সদরের মণিপুর বিশিয়া-কুড়িবাড়ি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা মায়েরা নিজেই নিজের খেয়াল রাখেন। এই কেন্দ্রে ৮৫ জন মা থাকেন একসঙ্গে। জীবনের নানা পর্যায়, সন্তানদের স্মৃতিচারণা, আবেগময় সময়গুলো ভাগাভাগি করেন একজন আরেকজনের সঙ্গে।

শনিবার (৭ মে) বিকেলে গাজীপুরের ওই বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে কথা হয় বেশ কয়েকজন নিবাসীর সঙ্গে। তাদের একজন গুলনাহার বেগম (৬৮)। একসময় রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার স্কুলশিক্ষক ছিলেন। ছয় বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে গুলনাহারকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে রেখে যান। কিন্তু সন্তানদের ছেড়ে আসার ইচ্ছা মোটেও ছিল না গুলনাহারের।

গুলনাহার বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার পর জীবনটাই এলোমেলো হয়ে যায়। গৃহশিক্ষকতা করে হলেও সন্তানদের সংসারে অবদান রাখার চেষ্টা করেছেন। এরপরও তাদের সঙ্গে থাকতে পারেননি।

আক্ষেপ করে গুলনাহার বলেন, আমারও তো মা ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে আমার ভাইয়েরা এমনটা করেনি।

একপর্যায়ে ভাগ্যের দোষ দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন গুলনাহার।

ঢাকার জিঞ্জিরা এলাকার নারগিস বেগমসহ আরও বেশ কয়েকজনের গল্পটাও একই রকম। আক্ষেপ, সুখ, দুঃখ সবই আছে তাতে।

পুনর্বাসন কেন্দ্রের হোস্টেল সুপার হাবিবা খন্দকার বলেন, এখানে আশ্রয় নেওয়া প্রত্যেকেই যেন আমার মা। মায়েদের সেবা-যত্নের চেষ্টা করা হলেও সন্তানের জন্য তাদের হাহাকার কিছুতেই দূর করা যায় না।

ma1

কথা হয় বৃদ্ধাশ্রমের পুরুষ নিবাসী কয়েকজনের সঙ্গে। তারা ছবি তুলতে এবং তাদের পরিচয় দিতেও রাজি নন। সন্তানের সম্মানের কথা চিন্তা করে বুকে দুঃখগুলো চেপে রেখে সন্তানের জন্য সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন বাবারা। তার সন্তান যেন তার মতো বৃদ্ধাশ্রমে না আসেন সে দোয়াও করেন। বৃদ্ধাশ্রমে খাওয়া, থাকা, চিকিৎসার অভাব না থাকলেও রয়েছে সন্তানদের না দেখার হাহাকার।

সদর উপজেলার মণিপুর বিশিয়া-কুড়িবাড়ি এলাকার আবদুল জাহিদ মুকুল ১৯৮৭ সালে রাজধানীর উত্তরার আজমপুর এলাকায় এই পুনর্বাসন কেন্দ্রটি নির্মাণ করেন। পরে ১৯৯৪ সালে তা মণিপুর বিশিয়া-কুড়িবাড়ি এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৯৫ সালে মাদার তেরেসা কেন্দ্রটির সম্প্রসারিত অংশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম, বর্তমানে এই কেন্দ্রে ৮৫ জন নারী ও পুরুষ আছেন ৯০ জন। আমৃত্যু তাদের জন্য এখানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও বিনোদন নিশ্চিত করা হয়। মৃত্যুর পর সমাধিস্থ করা হয় নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী।

এখানে সকল নিবাসীদের অতি যত্ন ও সেবার মাধ্যমে পরিচর্যা এবং দেখাশুনা করা হয়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও সেই দুঃখ যেন ভুলে থাকতে পারেন সেজন্য বিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে। সেই সঙ্গে নিজ নিজ ধর্ম অনুসারে ইবাদত করারও ব্যবস্থা রয়েছে।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।