হাতিয়ায় ইউপি নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্তদের গন্তব্য ‘হোটেল ঈশিতা’
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার হরণী ও চানন্দী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীর মনোনীত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রোববার (১২ জুন) দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সরেজমিনে হাতিয়া বাজার গিয়ে এর সত্যতাও পাওয়া গেছে। এ সময়ের মধ্যে হাতিয়া দ্বীপ থেকে নৌপথে চেয়ারম্যান ঘাট আসা বেশিরভাগ কর্মকর্তার গন্তব্য ছিল তিন কিলোমিটার দূরের হোটেল ঈশিতা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই হোটেলের মালিক হাতিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী। বর্তমানে তিনি ওই হোটেলে অবস্থান করছেন। নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্তরা এসেই উনার সঙ্গে দেখা করতে হোটেলে যাচ্ছেন। এরপর নির্দেশনা নিয়ে তারা কেন্দ্রে যাবেন।
হোটেল ঈশিতার সামনে গিয়ে দেখা যায়, মধ্য বয়সী এক ব্যক্তি হোটেলের নিচে এসে জড়ো হওয়া কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলছেন, ‘দাদা (মোহাম্মদ আলী) বিশ্রামে আছেন। আপনারা যার যার দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রে চলে যান। সেখানে আপনাদের জন্য থাকা-খাওয়াসহ সব ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নির্বাচনী কর্মকর্তাদের একজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা হাতিয়া দ্বীপ থেকে সি-ট্রাক, ট্রলার ও স্পিডবোটে এপাড়ে এসেছি। আসার আগে হোটেল ঈশিতায় যোগাযোগ করে যেতে বলা হয়েছে। তাই আমরা এখানে এসেছি। পরে কেন্দ্রে যাবো।’
হোটেল ঈশিতায় গিয়ে দেখা যায়, নিচে সংসদ সদস্যের স্টিকার লাগানো কালো জিপ গাড়ি রাখা। গাড়িটি মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী সংসদ সদস্য আয়েশা ফেরদৌস ব্যবহার করেন। তবে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে জানানো হয়।
হোটেলের দোতলায় একটি বেসরকারি ব্যাংক ও তিনতলায় মোহাম্মদ আলীর বৈঠকখানা এবং থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ওপরের দিকে অন্য কক্ষে তার কাছের লোকজন অবস্থান করছেন।
নির্বাচনে হরণী ইউনিয়নের নৌকা প্রতীক পেয়েছেন মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আখতার হোসেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ঘোড়া প্রতীক নিয়ে লড়ছেন মো. মুসফিকুর রহমান।
অন্যদিকে চানন্দী ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক পেয়েছেন মো. আজহার উদ্দিন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী আমিরুল ইসলাম শামীম ঢোল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন।

চানন্দী ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী আমিরুল ইসলাম শামীম জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী নৌকার প্রার্থীদের জেতাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি সার্বক্ষণিক হাতিয়া বাজারে হোটেল ঈশিতায় অবস্থান করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন।’
এ বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি। হাতিয়ার বেশিরভাগ মানুষই তো আমার লোক। নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিতরা ঘাট থেকে নেমে এ পথেই যেতে হয়। তাই হয়তো এদিকে এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই আওয়ামী লীগের লোক। তবে অনিয়মের কারণে কিছু লোকের থেকে আমি আমার সমর্থন তুলে নিয়েছি। তবে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, সুন্দর হোক সেটা আমিও চাই। তাতেও এখানে বিপুল ভোটে নৌকার জয় হবে।’
এ বিষয়ে জানতে হাতিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের মোবাইলে বারবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মেজবাহ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্তরা কে কার সমর্থক বা অনুসারী তা দেখা হয়নি। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা খতিয়ে দেখে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখনও এ নিয়ে কেউ অভিযোগ করেননি।’
১ নম্বর হরণী ইউনিয়নে ভোটার সংখ্যা ২২ হাজার ৪৬৭। এখানে চেয়ারম্যান পদে ১০ জন, সংরক্ষিত নারী মেম্বার পদে ১৭ জন ও সাধারণ মেম্বার পদে ৪১ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

২ নম্বর চানন্দী ইউনিয়নে ভোটার সংখ্যা ৪০ হাজার ৭০১। এখানে চেয়ারম্যান পদে ১০ জন, সংরক্ষিত নারী মেম্বার পদে ১২ জন ও সাধারণ মেম্বার পদে ২৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
দুই ইউনিয়নের ২৯ কেন্দ্রেই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের এ দুই ইউনিয়ন হাতিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন মেঘনা নদীর কূলঘেঁষা সুবর্ণচর উপজেলা সংলগ্ন। ৩০ বছর আগে ১৯৯১ সালের দিকে নতুর চর জেগে বয়ারচর নামকরণ দিয়ে লোকজন বসবাস শুরু করে।
নদীভাঙনের পর পুনরায় ২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেগে ওঠা বয়ারচরকে ১ নম্বর হরণী, নলেরচর ও নাঙ্গলিয়ারচরকে ২ নম্বর চানন্দী ইউনিয়ন ঘোষণা করে সরকার।
সীমানা জটিলতায় মামলা চলার কারণে বিগত ১৮ বছর এ দুই ইউনিয়নের প্রশাসক দিয়ে কার্যক্রম চালানো হয়। মামলা নিষ্পত্তির পর গত ২৫ এপ্রিল সারাদেশে ১৩৫টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সঙ্গে এ দুই ইউনিয়নেও তফসিল ঘোষণা করা হয়। ১৫ জুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ইকবাল হোসেন মজনু/এসআর/এএসএম