‘আগে স্কুল ভাঙা থাকলেও পড়ার মান ছিল মজবুত’

আমিন ইসলাম জুয়েল আমিন ইসলাম জুয়েল , জেলা প্রতিনিধি ,পাবনা
প্রকাশিত: ০১:২৮ পিএম, ১৯ জুলাই ২০২২

‘ভবেশ নামের আমার এক প্রিয় ছাত্র ছিল। সে খুব মেধাবী ছিল। কয়েক বছর আগে আমার সঙ্গে দেখা। কুশল বিণিময়ের পর আমাকে বললো, স্যার আপনার কাছ থেকে উপহার পাওয়া প্রায় ৪০ বছর আগের সেই কলমটি এখনও যত্ন করে রেখেছি। আমি তো শুনে অবাক। বললাম, সেই কলমটি এখনও রেখে দিয়েছ?’

‘আরেক দিনের কথা। হাটবারে হাট করছি। হঠাৎই একজন ছালাম বিনিময় শেষে পায়ে হাত দিয়ে ছালাম করলেন। ব্যাপার কী? এ কথা বলতেই জানালেন তিনি হাইস্কুলের একজন বিএসসি শিক্ষক (প্রধান শিক্ষক)। প্রাইমারিতে আমার ছাত্র ছিলেন। এ রকম কত শত অমূল্য স্মৃতি এ জীবনে রয়েছে।’

আত্মতৃপ্তি নিয়ে কথাটি বললেন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার কে. পদ্মবিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আলহাজ্ব সেকেন্দার আলী খান (৭৩)।

jagonews24

যোগ করলেন, ‘পড়েছি ভাঙাচোরা স্কুলে, শিক্ষকতাও করেছি ভাঙা স্কুলে। তবে পড়ার মান ছিল মজবুত।’

খ্যাতিমান শিক্ষক সেকেন্দার আলী জানান, ১৯৬৪ সালে এসএসসিতে উচ্চতর ২য় বিভাগ পেয়ে সাংসারিক কারণেই আর পড়াশোনা করা হয়নি। তখনকার টেকনিক্যালে (পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট) মেধা তালিকায় ৪ নম্বরে থাকার পরও পড়াপশোনা করার ভাগ্য হয়নি। বন্ধুরা এইচএসসিতে ভর্তি হলেও তিনি হন্যে হয়ে চাকরির খোঁজ করতে থাকেন। প্রাইমারি স্কুলে একটি চাকরির জন্য চেষ্টা চালান। এজন্য তিনি যান তৎকালীন থানা শিক্ষা অফিসার বা টিইওর (এখন ইউইও) কাছে। তখন টিইওরাই (থানা শিক্ষা অফিসার) প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি দিতে পারতেন।

থানা শিক্ষা অফিসারের কাছে যাওয়ার পর ওই শিক্ষা অফিসার বলছিলেন ‘ছাত্ররাইতো তোমার চেয়ে বয়সে বড়। এত অল্প বয়সে কীভাবে ওদের লেখাপড়া করাবে? তখন তিনি মহিবুল মিয়া নামে স্থানীয় একজন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তির কাছে গিয়ে বললেন তার বন্ধুরা এইচএসসিতে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু সে ভর্তি হতে পারেনি, ওদিকে তার চাকরিও হচ্ছে না। থানা শিক্ষা অফিসার বলছেন বয়স কম, চাকরি দেওয়া যাবে না। তখন মহিবুল মিয়া থানা শিক্ষা অফিসারের কাছে গিয়ে তার জন্য তদবির করলেন। জানালেন বয়সে ছোট হলেও তার ফলাফল ভালো। এসএসসিতে উচ্চতর দ্বিতীয় শ্রেণি পেয়েছে। ভালো পাঠদান করাতে পারবে। তখন চাকরি হয়ে গেল।

সেকেন্দার আলীর প্রথম পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার বড়গ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি স্কুলে যোগদান করেন ১৯৬৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর। কিন্তু সমস্যা হলো সেখানে থাকার তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। রাস্তাঘাট সব কাঁচা। তখন স্থানীয় লোকজন তাকে জায়গীরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

তরুণ শিক্ষক সেকান্দার আলী ক্লাসরুমে ঢুকে দেখলেন, সত্যি সত্যি তার সমবয়সী বেশ কয়েকজন ছাত্র রয়েছে। তাও আবার তারা কেবল ৩য়- ৪র্থ শ্রেণিতে পড়ে। তাদের দু’একজনের নাম এখনও তার মনে আছে বলে জানালেন।

প্রথম কর্মস্থলে ৭ মাসের মতো চাকরি করে ১৯৬৫ সালের মার্চ মাসে বদলি হলেন পাবনা সদর উপজেলার পৈলানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি জানান, নতুন স্কুলে গিয়ে আরও বড় বড় ছাত্র-ছাত্রীকে পেলাম। তবে একটি বিষয় লক্ষ্যনীয় ছিল যে সে সময় ছাত্র-ছাত্রীদের বয়স যতই বড় হোক, এখনকার তুলনায় তাদের মধ্যে শিক্ষকদের প্রতি যথেষ্ট ভয় ছিল, শ্রদ্ধাবোধ ছিল। অভিভাবকরাও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতেন।

স্মৃতিচারণ করে শিক্ষক সেকেন্দার আলী জানান, তিনি ১৯৬৪ সালে যখন এসএসসি পাস করেন তখন ১১টি গ্রামে এসএসসি পাস ব্যক্তি ছিলেন ১৩ জন। স্কুলে যাওয়ার হার কম ছিল। কিন্তু যারা তাদের সন্তানদের স্কুলে দিতেন, শিক্ষকদের বলতেন যে তাদের সন্তানকে যেন মানুষের মতো মানুষ করে দেওয়া হয়। তখন শিক্ষকদের হাতে বেত ছিল। একটু শাসন ছিল। এখন যদিও শাসন করা সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু তখন শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদেরকে শাসন করতেন।

বেতন প্রসঙ্গে শিক্ষক সেকান্দার আলী জানান, তখন তাদের বেতন ছিল ৫০-৬০ টাকা। হয়ত অন্য চাকরিতে গেলে বেতন বেশি পাওয়া যেত। কিন্তু শিক্ষকের চেয়ারে বসে আর সেখান থেকে ওঠা যায় না। বেতন কম হলেও প্রাইভেট পড়াতেন না। কোনো শিক্ষকই প্রাইভেট পড়াতেন না। বেতন যতই কম পেতেন না কেন, শিক্ষকরা সে বেতনেই সন্তুষ্ট থাকতেন বা থাকতে হত। আর ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ক্লাসে যতটুকু শেখানো হতো ততটুকুই শিখত। কারণ তখন তাদের বেশিরভাগের বাড়িতে শিক্ষিত কেউ ছিলেন না। শিক্ষকরা তখন ছিলেন একাধারে ছাত্র- ছাত্রীদের শিক্ষক এবং বাবা-মা।

jagonews24

সেকান্দার আলী খান জানান, পাবনা সদর উপজেলার পৈলানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি এরপর বদলি হয়ে আসেন নিজ উপজেলা সাাঁথিয়া উপজেলার হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুল ভাঙাচোরা, বসার জায়গা ছিল না। কিন্তু পড়াশোনার মান ভালো ছিল। যে কয়েকজন ছাত্র আসত তাদেরকে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া হত।

তিনি বলেন, ‘ভবনগুলো পাকা না হলেও শিক্ষাদান পাকা ছিল।’

ওই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিও তাকে একটি জায়গার ব্যবস্থা করে দিলেন এবং ওই জায়গীর বাড়ি থেকে শিক্ষকতা করতে থাকেন।

সেকান্দার আলী খান জানান, সে সময় জায়গীরের প্রথা চালু ছিল। ওই স্কুলে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরু পর্যন্ত চাকরি করেন।

হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি একই উপজেলার সামান্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হন। সেখানে তিনি ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চাকরি করেন। এরপর এক বছরের জন্য তিনি আবার পার্শ্ববর্তী সুজানগর উপজেলার ক্রোপদুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করেন। সেখানে তিনি ১৯৭৭-৭৮ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এ সময়ের মধ্যে বিয়ে পর্ব শেষ করেন। বেশ কয়েক বছর অন্য জায়গায় চাকরি করে তিনি এবার নিজ গ্রাম পদ্মবিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের দিকে। তিনি পদ্মবিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই ২০০৪ সালে অবসর নেন এবং এ পর্যন্ত তিনি অবসর জীবনযাপন করছেন।

পদ্মবিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই তিনি পড়াশোনা করেছিলেন। সেই বিদ্যালয়ে এসেই তিনি সবচেয়ে বেশি বছর শিক্ষকতা করেন।

তার নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে জানালেন, তিনি অন্য সব বিষয়সহ ৫ম শ্রেণির গণিত নিতেন। তিনি প্রতি বছরই ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহিত করতেন। ঘোষণা দিতেন- যে এবার বার্ষিক পরীক্ষায় গণিতে একশ’ নম্বর পাবে তাকে একটি কলম উপহার দেওয়া হবে। তবে এটা খুব কঠিন কাজ ছিল। তাই চেষ্টা করলেও সবাই সে কলম নিতে পারত না। দু’ একজন তা পেয়েছে।

তিনি জানান, একটি কলম বড় বিষয় না। বিষয় হলো শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা। তাদের পাঠের প্রতি মনোযোগী করা।

jagonews24

সেকান্দার আলী জানান, শিক্ষকতা করে আর্থিক লাভবান হয়ত বেশি হওয়া যায়নি। তবে যে কর্মসন্তুষ্টি পেয়েছেন তা অন্য বেশি বেতনের চাকরিতে পেতেন না। একজন প্রাথমিক শিক্ষকই একজন শিক্ষার্থীকে শুরুতে গড়ে তোলেন। তার সম্মানটাও এজন্য বেশি। এ সম্মানই একজন শিক্ষকের বড় সম্পদ। সে সম্পদ নিয়েই একজন শিক্ষক সারা জীবন আনন্দে থাকেন, সুখে থাকেন।

২০০৪ সালে অবসরে যান তিনি। শিক্ষকতা করা অবস্থায় একজনের উৎসাহে হোমিওপ্যাথিক বই কিনেছিলেন। অবসরে প্র্যাকটিস করতেন। এখন বাজারে দোকান বন্ধ করে দিলেও বাড়িতে তার চেম্বার রয়েছে। প্রায় ৭৩ বছর বয়সী এ গুণী শিক্ষকের অবসর কাটে বাগান করে আর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করে।

সেকান্দার আলীর প্রাক্তন ছাত্র শাহজাহান আলী জানান, স্যার শুধু রুটিন পাঠদানই করতেন না। তিনি আমাদের ছোটকালে যেসব নৈতিক শিক্ষা দিয়েছেন তা আজও হৃদয়ে গাঁথা।

প্রাক্তন ছাত্র এখন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার কৃষ্ণ চন্দ্র সরকার জানান, তিনি স্যারের ছাত্র ছিলেন। তার গড়ে দেওয়া ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই এতদূর এসেছেন

সেকান্দার আলীর ছেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম জানান, সেকান্দার আলী খাঁন শুধু তার বাবা নন, প্রাইমারিতে তার শিক্ষকও ছিলেন। তার বাবার দেওয়া শিক্ষার ভিত্তিতেই তিনি এ পর্যায়ে আসতে পেরেছেন।

সাঁথিয়া উপজেলা শিক্ষা অফিসার হেলাল উদ্দিন জানান, একজন গুণী শিক্ষক শুধু পাঠ্য বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন না। তিনি নানা পাঠে নিজস্ব কৌশল প্রয়োগ করেন। এখন শিক্ষকদের নানা প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। ৬০ এর দশকের বা ৮০ এর দশকের শিক্ষকরা এত প্রশিক্ষণ পাননি। তারা নিজস্ব কৌশল, মেধা, বুদ্ধি, সৃজনশীলতা খাটিয়ে একেকজন অনন্য শিক্ষক বা মানুষ গড়ার কারিগর হয়ে উঠতেন। সেকান্দার আলী খানের মতো শিক্ষকদের কাছে বর্তমানে কর্মরতদের অনেক কিছু শেখার আছে, জানার আছে।

এফএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।