ইরান যুদ্ধ

ট্রাম্প কি পারবেন তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি আটকাতে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৪৬ পিএম, ১১ মার্চ ২০২৬
তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি আটকাতে ট্রাম্পের হাতে বিকল্প কম/ ফাইল ছবি: এএফপি, গ্রাফিকস: জাগোনিউজ

দ্বিতীয় সপ্তাহে পা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ ‘খুব দ্রুত’ শেষ হওয়ার দাবি করলেও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে তেলের দামে আকাশ ছুঁতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে বিকল্প খুব কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তেলের দামে নজিরবিহীন ওঠানামা

গত ৯ মার্চ ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ খুব শিগগির শেষ হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেবে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলকারী ট্যাংকারগুলোর জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বিমা চালু করবে।

এই মিশ্র বার্তার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সাময়িকভাবে কমে যায়। ১০ মার্চ অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৮ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯১ ডলারে নেমে আসে।

আরও পড়ুন>>
যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বের তেলবাজারে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড়’ সংকট

রেকর্ড উচ্চতা থেকে ‘মাইনাস’ দাম: দুই দশকে তেলের বাজারে নাটকীয় অস্থিরতা
অর্থনীতি নাকি নৌবাহিনীকে বাঁচাবেন, কঠিন পরীক্ষার মুখে ট্রাম্প?

তবে বাজারে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। কারণ যুদ্ধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ট্রাম্প একা নিতে পারবেন না এবং সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘ হলে ‘বিপর্যয়কর পরিণতি’ হতে পারে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইএ) জরুরি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে এক সপ্তাহে দুইবার বৈঠক করেছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের ধাক্কা

বিশ্বের তেল সরবরাহে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। গত বছর প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল (বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ১৪ শতাংশ) এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়েছে।

এছাড়া আরও প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত তেলজাত পণ্য প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে গেছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইনের মাধ্যমে সামান্য অংশ সরানো সম্ভব হলেও এখনো প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে আছে।

তিনটি সম্ভাব্য পথ

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারগুলো মূলত তিনটি পথ নিতে পারে—

  • হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়ানো।
  • কৌশলগত তেল মজুত বাজারে ছাড়ানো।
  • অন্য উৎস থেকে তেল সরবরাহ বাড়ানো।

তবে এই তিনটিরই সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

সামরিক এসকর্টের সীমাবদ্ধতা

তাত্ত্বিকভাবে মার্কিন নৌবাহিনীর এসকর্ট মিশন জাহাজ চলাচল বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। ১৯৮৭-৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ৩০টির বেশি যুদ্ধজাহাজের মাধ্যমে নিরাপত্তা দিয়ে কুয়েতের ট্যাংকারগুলোকে হরমুজ প্রণালি পার করিয়েছিল।

এ ধরনের বহরগুলোতে সাধারণত কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ এবং দুই বা তিনটি ট্যাংকার থাকে, যা সপ্তাহে গড়ে একবার রওয়ানা হয়। স্বাভাবিকভাবে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০টি জাহাজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে, সেই তুলনায় এই সংখ্যা খুবই সামান্য। এই গতিতে উপসাগরে বর্তমানে আটকে থাকা প্রায় ৩২০টি জাহাজকে সেখান থেকে বের করে আনতে অন্তত আড়াই বছর সময় লাগবে।

এ ছাড়া মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বড় অংশ বর্তমানে যুদ্ধে ব্যস্ত এবং অঞ্চলটিতে নতুন সমরাস্ত্র মোতায়েন করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

কৌশলগত তেল মজুত ব্যবহার

আরেকটি উপায় হলো জরুরি তেল মজুত বাজারে ছাড়া। আইইএ সদস্য দেশগুলোর হাতে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল জরুরি মজুত রয়েছে। শিল্প খাতের মজুত থেকে আরও ৬০ কোটি ব্যারেল তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে বাস্তবে এই তেল দ্রুত বাজারে আনা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট অনুমোদন দিলেও চুক্তি সম্পন্ন ও সরবরাহ শুরু হতে প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লাগে।

এ ছাড়া প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সর্বোচ্চ হারে মজুত ছাড়লেও দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি সরবরাহ বাড়ানো কঠিন বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

বিকল্প সরবরাহ

বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়ার তেল বাজারে আনার কথাও আলোচনা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ভারতের জন্য সাময়িক ছাড় দিয়েছে, যাতে সমুদ্রে থাকা প্রায় ১৪ কোটি ব্যারেল রুশ তেল কেনা যায়।

তবে নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে রাশিয়ার পক্ষে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো কঠিন।

যুক্তরাষ্ট্রের শেল কোম্পানিগুলোর তেল ব্যবহারও হতে পারে আরেকটি পথ। তবে এসব কোম্পানি উৎপাদন বাড়াতে পারলেও তা বাজারে আসতে ৬-১২ মাস সময় লাগবে এবং এর পরিমাণ হবে দিনে মাত্র ৩ লাখ ব্যারেল।

দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি

বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগত মজুত ছাড়ানো, কিছু রুশ তেল বাজারে আনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামান্য উৎপাদন বাড়ানো—সব মিলিয়ে প্রতিদিন চার লাখ ব্যারেলের মতো সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।

কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তার তুলনায় এটি খুবই কম।

এদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে সংরক্ষণাগার ভরে যাওয়ায় ইরাক ও কুয়েত কিছু তেল কূপ বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উৎপাদন কমে বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষণা সংস্থা উড ম্যাকেঞ্জির মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে অনেক দেশ এখন শেষ অস্ত্র হিসেবে জ্বালানি রপ্তানি সীমিত করার মতো সুরক্ষাবাদী নীতির দিকে ঝুঁকতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।