ইয়াসমিনের দিনাজপুরে মাসে ১০৮টি নারী নির্যাতনের মামলা হয় আদালতে
আজ ২৪ আগস্ট, দেশে ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস পালিত হচ্ছে। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিপথগামী পুলিশ কর্তৃক ১৬ বছরের কিশোরী ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ২৭ বছর কেটে গেলেও জেলায় নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা ও সঠিক বিচার না হওয়ায় ধর্ষণ ও নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে না।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে সাড়ে ৪ হাজারের অধিক মামলা ঝুলে আছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই আদালতে মামলা হয় ১ হাজার ২৭৬টি। সেই হিসেবে মাসে গড়ে মামলা হয়েছে ১০৬টি। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি মাসের ২২ আগস্ট পর্যন্ত দিনাজপুর আদালতে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলা হয়েছে ৮৭১টি। সেই হিসেবে প্রতিমাসে গড়ে মামলা হয়েছে ১০৮টি। যা গত বছরের চেয়ে মাসে দুটি বেশি।
আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তৈয়বা বেগম বলেন, দিনাজপুরের আদালতে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা জট রয়েছে। মামলার সাক্ষীরা সঠিক সময়ে উপস্থিত না হওয়ায় মামলাগুলোর কার্যক্রম বেশি দিন ধরে চলছে। সাক্ষীদের সঠিক সময়ে হাজির করা গেলে মামলার জট কমে আসবে।
ইয়াসমিনকে নিয়ে আন্দোলনের প্রথম প্রতিবাদকারী নেতা দিনাজপুর-১ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল বলেন, সে সময় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনাজপুরবাসীর পাশে থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান সরকার নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করলেও এ ঘটনা কমছে না। নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা প্রতিরোধে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে নারী নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।

বেসরকারি সাহায্য সংস্থা ‘পল্লী শ্রী’ নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করে আসছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক শামীম আরা বেগম জানান, হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস শেষে জুন মাস পর্যন্ত সারা দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪ হাজার ৭৬৯ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের পর মৃত্যু হয়েছে ২৪ জনের। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৭২ জন নারীকে। আত্মহত্যা করেছে ৬ জন নারী। আইন সংক্রান্ত মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের এবং স্বামী কর্তৃক হত্যার শিকার হয়েছে ৯৪ জন নারী।
তিনি বলেন, নারীদের প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানো এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন।
২৭ বছর আগে ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট দিনাজপুরে কয়েকজন বিপথগামী পুলিশের হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় ১৬ বছরের কিশোরী ইয়াসমিন। ওই ঘটনার প্রতিবাদে দিনাজপুরবাসী যা করেছিল, তাতে কেঁপে গিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। টানা কয়েক দিন পুরো দিনাজপুর জেলা কার্যত অচল করে দেয় বিক্ষোভকারীরা। কারফিউ-গুলি কোনো কিছুই তাদের দমাতে পারেনি সেদিন।
ক্ষোভ সামাল দিতে দিনাজপুর পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়। প্রত্যাহার করা হয় তৎকালীন জেলা প্রশাসক এটিএম জব্বার ফারুকীকে। আরও ১০৫ পুলিশ কর্মকর্তা এবং সদস্যকেও বদলি করা হয় অন্যান্য জেলায়। অভিযুক্ত তিন পুলিশ সদস্যকে আটক করে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয়। প্রবল বিক্ষোভের মুখে পাঁচ দিন পর ময়নাতদন্ত এবং সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির জন্য ইয়াসমিনের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়। ময়নাতদন্তের পর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
বিচারের মাধ্যমে তারা আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন। ঘটনার ৯ বছর পর ২০০৪ সালে সেই তিন পুলিশ সদস্যকে ফাঁসি দেওয়া হয়। সেই থেকে ২৪ আগস্ট দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস।
এমদাদুল হক মিলন/এফএ/জেআইএম