নারায়ণগঞ্জে নিহত শাওনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে টানাটানি
নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে নিহত শাওন প্রধানের (স্থানীয়ভাবে রাজা প্রধান নামে পরিচিত) রাজনৈতিক পরিচয় টানাটানি শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, তিনি যুবলীগের রাজনীতি করতেন। তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, শাওন যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে একনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। অনেক আগে থেকেই তিনি যুবদল করে আসছিলেন।
বৃহস্পতিবার (১ সেপ্টেম্বর) নারায়ণগঞ্জ শহরের দুই নম্বর রেলগেট এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপির সংঘর্ষে শাওন নামের একজন নিহত হন। তাকে প্রথম থেকেই ‘যুবদলের কর্মী’ হিসেবে দাবি করে আসছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। কিন্তু বিকেল থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শাওনকে যুবদলের কর্মী হিসেবে অস্বীকার করছেন।

নিচে সবার ডানে শাওন। ছবি-শাওনের ফেসবুক থেকে নেওয়া
তারা শাওনকে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শওকত আলীর ‘ভাতিজা’ হিসেবে দাবি করছেন। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেলও বলেছেন, ‘নিহত শাওন যুবদল কর্মী নন; বরং আওয়ামী লীগ নেতার ভাতিজা’।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ফতুল্লা এনায়েতনগর ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ডিএম বাবুল জাগো নিউজকে বলেন, ‘শাওন অনেক আগে থেকেই যুবদল করতো। আমাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশের গুলিতে সে নিহত হয়েছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
ফতুল্লা থানা যুবদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক সৈকত হাসান ইকবাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘শাওন যুবদল করতো। এটা প্রমাণের জন্য যা প্রয়োজন আমি সবই দিতে পারবো। আওয়ামী লীগের লোকজন জোর করে তাকে যুবলীগ বানানোর চেষ্টা করছে।’

ডান দিক থেকে দ্বিতীয় শাওন। ছবি-ফেসবুক থেকে নেওয়া
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘শাওন যুবদলের রাজনীতি করতো এবং যুবদলের কর্মী ছিল সেটাও প্রমাণিত হয়েছে। যদি সে রাজনীতি নাও করে তাও একজনকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে মেরে ফেলার কোনো অধিকার পুলিশের নেই।’
তবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন ভিন্ন কথা। এ বিষয়ে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক জাহাঙ্গীর মাস্টার জাগো নিউজকে বলেন, ‘শাওন আমাদের এলাকার ছেলে এবং ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলীর ভাতিজা। তারা চার ভাইয়ের মধ্যে বড়জনের অনেক আগেই মারা গেছে। আর তিন ভাই তাদের চাচা শওকত আলীর সঙ্গেই থাকে। শাওন যুবলীগের রাজনীতি করতো। আমরা এ হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’
ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘শাওন আমার ভাতিজা। সে সরাসরি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। সে আমার সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যেতো। সবশেষ ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের বিশাল সমাবেশে আমার সঙ্গে গিয়েছিল।’
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে শাওনকে ‘যুবলীগ কর্মী’ দাবি করে তার বাড়ির সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা সেখানে রাতভর অবস্থান নেন। এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা আসতে চাইলেও তাদের বাধা দেওয়া হয়। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পরে সকালে তারা চলে যান।
পরে রাত দেড়টায় পুলিশ পাহারায় ফতুল্লার নবীনগর শাহওয়ার আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নিহত শাওনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নবীনগর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
তার আগে রাত সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া) বড় ভাই মিলন প্রধান এবং মামা মোতাহার হোসেনের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মরদেহ শাওনের বাড়িতে আনা হয়।

বিএনপির রাজনৈতিক পোস্টারে শাওন (নিচে ডানে)। ছবি-শাওনের ফেসবুক থেকে নেওয়া
এদিকে শুক্রবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই শাওনের এলাকায় অবস্থান করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের উপস্থিতিতে শাওনের বাড়ি পূর্ণ হয়ে ওঠে। পরে দুপুর ১২টার দিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেখানে গেলে এ ঘটনার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শাওনের আইডি ঘুরে তার যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। তার পুরো প্রোফাইলজুড়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ছবি ও বিভিন্ন স্ট্যাটাস দেখা গেছে।
এ বিষয়ে শাওনের বড় ভাই মিলন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা জানি না সে রাজনীতি করতো কি না। তবে আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।’
মোবাশ্বির শ্রাবণ/এসআর/জিকেএস