হত্যা মামলার আসামির সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তার ছবি ভাইরাল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৬:৪০ পিএম, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২
সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত ব্যক্তি আলাউদ্দিন, তার সঙ্গে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি শামীম ও পরিদর্শক আবদুল জব্বার

কক্সবাজারের চকরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল জব্বারে সঙ্গে হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামির সখ্যতার বেশ কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ছবিটিতে আড্ডার পর বিদায় কালে স্মৃতি হিসেবে ছবিগুলো তোলার মুহূর্ত প্রকাশ পাচ্ছে।

ছবিতে পরিদর্শক আবদুল জব্বারের সঙ্গে রয়েছেন চকরিয়া উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের বুড়িরপাড়া গ্রামের হেলাল উদ্দিনের ছেলে মো. আলাউদ্দিন (৪০)। তিনি ওই ইউনিয়নের যুবলীগের সভাপতি। তার বিরুদ্ধে চকরিয়া থানায় একটি হত্যা, দুটি হত্যাচেষ্টা, একটি মারধর করে অপহরণের চেষ্টা ও একটি দ্রুত বিচার আইনের মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।

আর সেই আলাউদ্দিনের সঙ্গে চকরিয়া থানার পরিদর্শক আব্দুল জব্বারের সখ্যতার ছবি প্রকাশ পাওয়ার পর সব মহলে চলছে সমালোচনা।

তথ্য মতে, আলাউদ্দিন চকরিয়া থানার পাঁচটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে থানায় লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ রয়েছে। ২০০৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর চকরিয়া থানায় আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা আইনে প্রথম মামলা লিপিবদ্ধ হয়। এরপর ২০১১ সালের ৩ ডিসেম্বর মারধর করে অপহরণ চেষ্টার দায়ে, ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল আইনশৃঙ্খলা বিঘ্ন করার অপরাধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয়। তারপর আলাউদ্দিন বিদেশ চলে যাওয়ায় দীর্ঘদিন তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পায়নি পুলিশ।

তবে বিদেশ থেকে ফেরার পর চট্টগ্রাম এমইএস কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নোবেলকে হত্যার অভিযোগে ২০২১ সালে ১৯ আগস্ট তার বিরুদ্ধে ফের মামলা হয় চকরিয়া থানায়। এর কয়েকমাস পরেই ২০২২ সালে ৩ মার্চ একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তাকে প্রধান অভিযুক্ত করে মামলা লিপিবদ্ধ হয়।

অন্যদিকে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চকরিয়া থানায় পরিদর্শক হিসেবে যোগদানের আগে মাতামুহুরী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের আইসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন আবদুল জব্বার। ওই তদন্ত কেন্দ্রের অধীনেই ছিল পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন। এখানে দায়িত্ব পালনের সময়ই আবদুল জব্বার ও আলাউদ্দিনের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূর্ব বড় ভেওলার এক ইউপি সদস্য বলেন, আবদুল জব্বার মাস ছয়েক মাতামুহুরী তদন্ত কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়টাতে তদন্ত কেন্দ্রে প্রায় সময় অবস্থান করতেন আলাউদ্দিন। তাদের দুজনের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া ছিল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আলাউদ্দিন পুলিশের নাম ভাঙিয়ে জনগণকে নানাভাবে হয়রানি করেন। সালিশি বৈঠকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে লোকজনের কাছে থেকে টাকা হাতিয়ে নিতেন আলাউদ্দিন।

জানতে চাইলে আলাউদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, ২০০৫ সালের মামলাটি ছিল পারিবারিক বিরোধ। এটি মীমাংসা হয়ে গেছে। দ্রুত বিচারের মামলাটি আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোকজন দিয়েছিল। সেটিও নিষ্পত্তি হয়েছে। অপহরণ চেষ্টার মামলা সম্পর্কে আমার জানা নেই। অন্য দুটি মামলায় আমি জামিনে রয়েছি।

আবদুল জব্বারের সঙ্গে ছবি ও সেলফির বিষয়ে তিনি বলেন, আবদুল জব্বার যখন মাতামুহুরী তদন্ত কেন্দ্রে ছিলেন তখন থেকেই সম্পর্ক। কিন্তু তিনি চকরিয়া থানায় আসার পর থেকে আমাদের আর দেখা হয়নি। হঠাৎ সেদিন আমি ও পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম চকরিয়ার চিরিংগা বাজার সিটি সেন্টারে কাজে আসি। নামাজের সময় হওয়ায় মসজিদে নামাজ পড়ি। সেখানে আবদুল জব্বারকে দেখি। পরে আমি অনেক অনুরোধ করে একটি সেলফি তুলি এবং সেখানে অল্প কিছুক্ষণ অবস্থান করি।

তিনি আরও বলেন, তদন্ত কেন্দ্রে সবসময় কেন যাব আমি, তবে বিভিন্ন সালিশি বৈঠক থাকলে যাওয়া হয়। যুবলীগ সভাপতি হিসেবে এলাকায় আমার একটা অবস্থান রয়েছে। এছাড়া গতবার আমার ইউপি নির্বাচন করার কথা ছিল। সে কারণে বিভিন্ন জন বিভিন্ন সমস্যায় আমার কাছে আসেন। তাদের ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতেই পুলিশের সহযোগিতা দরকার হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুল জব্বার বলেন, সিটি সেন্টারে মাগরিবের নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় পূর্ব বড় ভেওলার আওয়ামী লীগ সভাপতি শামীমের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমার সঙ্গে একটি বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় সেখানে আলাউদ্দিন আসে এবং একটা সেলফি তুলতে চায়। মুখের ওপর তাকে না করতে পারিনি।

তিনি আরও বলেন, আলাউদ্দিন নোবেল হত্যা মামলায় স্থায়ী জামিনে রয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই। বাকি মামলার খবর আমার জানা নেই।

পুলিশের নাম ভাঙিয়ে জনগণকে হয়রানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন অভিযোগ কেউ কখনো আমাকে করেনি।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. মাহাফুজুল ইসলাম বলেন, আলাউদ্দিনের সঙ্গে পরিদর্শক জব্বারের ছবি আমি দেখেছি। এটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসপি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে জেলা পুলিশের সবাইকে সচেতন করা হয়েছে। একজন পুলিশের সঙ্গে কাজের কারণেই ভালো-খারাপ সব ধরনের লোকের পরিচয় থাকবে। তবে পুলিশ ভালোকে গ্রহণ করবে। বিতর্ক ওঠার মতো অভিযুক্তদের এড়িয়ে চলা একটি কমনসেন্সের বিষয়।

সায়ীদ আলমগীর/এমআরআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।