বিপাকে হাবিপ্রবির ৪ শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা

‘সরল সুদে’ ঋণ নিয়ে চক্রবৃদ্ধি হারে কিস্তি

এমদাদুল হক মিলন এমদাদুল হক মিলন , দিনাজপুর দিনাজপুর
প্রকাশিত: ১২:১৬ পিএম, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

সরল সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে চক্রবৃদ্ধি হারে পরিশোধ করতে হচ্ছে দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ শতাধীক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে। এনিয়ে বিপাকে পড়েছেন ঋণ গ্রহিতারা। বিষয়টি জানার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে।

২০১৮ সালের ১৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা রূপালী ব্যাংকের মধ্যে ২০০ কোটি টাকার কর্পোরেট ঋণের চুক্তি সম্পাদিত হলেও ১৩০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে গ্রহণ করে হাবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ। পরে সেই টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ৪ শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ঋণ হিসেবে প্রদান করে হাবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ।

চুক্তির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে ব্যাংকে সেই ঋণের টাকার সুদ বেশি পরিমাণে দিতে হচ্ছে ঋণগ্রহিতাদের। চুক্তির আগে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জানানো হয় ঋণে সুদের হার সরল হিসেবে ৯ শতাংশ দিতে হবে। কিন্তু চুক্তি ৯ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে করা হয়। বিষয়টি তখন ঋণ গ্রহিতাদের জানানো হয়নি। ২০১৮ সালের মার্চ মাসের পর অদ্যাবধি ৪০৪ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারী তাদের ঋণ পরিশোধ করছেন সরল হিসেবে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে চক্রবৃদ্ধি হারে।

সম্প্রতি রুয়েটে একই ব্যাংকের একই নিয়মের ৬০ কোটি টাকার ঋণের কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা এই কারচুপি দেখতে পায়। রুয়েটের ঋণের কিস্তি ৯ শতাংশ সরল সুদে আদায় করা হচ্ছে। অথচ হাবিপ্রবিতে ৯ শতাংশ চক্রবৃদ্ধিহারে আদায় করেছে ব্যাংকটি। একই ব্যাংকের দুটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ঋণ দু’ভাবে আদায় করা নিয়ে নানান প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ও রূপালী ব্যাংকের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মধ্যে ২০০ কোটি টাকার ঋণ চুক্তিনামা হয়। এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তৎকালীন রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. সফিউল আলম এবং রূপালী ব্যাংক বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার রায়।

ওই সময়ে মোট ৪০৪ জন ১৩০ কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ করেন। যার মধ্যে শিক্ষক ১০৫ জন, কর্মকর্তা ১০৮ জন ও কর্মচারী ১৯১ জন। যাদের মধ্যে এই ঋণ প্রদান করা হয়েছিল তাদেরকে জানানো হয়েছিল যে ঋণের টাকা ৯ শতাংশ সরল সুদে ১৮০টি কিস্তির মাধ্যমে ১৫ বছরে পরিশোধ হবে। এতে করে প্রতি মাসে প্রতি লাখে ১০১৫ টাকা করে ইএমআই (ইক্যুয়াল মান্থলি ইন্সটলমেন্ট) দিতে হবে। ইতোমধ্যে ঋণ নেওয়ার ৫২ মাস অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ মাসের কিস্তি পরিশোধও করা হয়েছে।

মাঝে করোনাকালীন সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার হিসেবে ১৫ মাসের ইএমআই প্রদান করা হয়নি। জুলাই মাসে ঋণ গ্রহীতারা ব্যাংকের কাছে মূলঋণের কত টাকা কমেছে জানতে গিয়ে হেরফের দেখতে পান। পরে তারা জানতে পারেন যে, তাদেরকে ৯ শতাংশ সরল সুদ নিয়মে যে ঋণ প্রদান করা হয়েছে তার ইএমআই সরল সুদে নয়, বরং চক্রবৃদ্ধি বা অন্য উপায়ে নেওয়া হচ্ছে। এরপরেই ঋণ গ্রহীতারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করে। বিষয়টি জানার পর রূপালী ব্যাংকে চিঠি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এরইমধ্যে বিষয়টি রূপালী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়। পরে রূপালী ব্যাংক বিষয়টি সমাধান করতে আশ্বস্ত করে।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক ৩ জন ঋণগ্রহীতা শিক্ষক জানান, ঋণ দেওয়ার সময় ৯ শতাংশ হারে সরল সুদে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা এখন জানতে পারছি যে আমাদের কাছ থেকে ৯ শতাংশ হারে চক্রবৃদ্ধিহারে আদায় করা হয়েছে। অথচ আমাদের পরে রুয়েটে একই ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে সরল সুদে। আর আমাদের কাছে আদায় করা হয়েছে চক্রবৃদ্ধিহারে। একই ঋণ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি নিয়মে কেন আদায় করা হবে। তারা এক প্রকার আমাদেরকে অন্ধকারে রেখে ঋণ আদায় করেছে।

তারা বলেন, এখানে চুক্তির আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ছিল। এ পর্যন্ত প্রতিজন ঋণ গ্রহীতা ৩৭ মাস কিংবা তারও বেশি কিস্তি (ইএমআই) পরিশোধ করেছেন। এসব ইএমআইয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় হয়েছে তা সমন্বয় করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সাবেক প্রক্টর প্রফেসর ড. সফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা যারা ঋণ গ্রহণ করেছি তাদের কাছ থেকে সরল সুদের বিনিময়ে অন্যভাবে ইএমআই গ্রহণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত যে অর্থ আমাদের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে তা যাতে করে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয় সেজন্য আমরা আবেদন করেছি। যদিও এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. সাইফুর রহমান বলেন, ওই সময় যে চুক্তি হয়েছিল সেই চুক্তিতে সরল সুদ বা চক্রবৃদ্ধি কথাটি উল্লেখ ছিল না। যারা ওই সময় চুক্তি করেছিলেন তাদের এটি দেখার কথা। চক্রবৃদ্ধি হারে যে টাকা প্রথম থেকে গ্রহণ করা হয়েছে অতিরিক্ত সেই অর্থ সমন্বয় করার জন্য ব্যাংকে চিঠি প্রদান করা হয়েছে। একইসঙ্গে ৯ শতাংশ সরল সুদ থেকে ৮ শতাংশ সরল সুদ করার জন্যও বলা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হিসাব) মিজানুর রহমান বলেন, যারা ঋণ গ্রহণ করেছেন তাদেরকে ১৮০টি কিস্তি প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সার্কুলার হিসেবে করোনার কারণে আমরা ১৫টি কিস্তি প্রদান করিনি। কিন্তু রূপালী ব্যাংক ১৫ মাসের ইএমআই মূলধনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি হলে রূপালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার বা নির্দেশনা অমান্য করেছে। আমাদের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল সেই চুক্তিতে সরল কিংবা চক্রবৃদ্ধি কিছুই লেখা ছিল না, এটি এখন আমরা দেখছি। কিন্তু যারা এই ঋণের সুবিধা নিয়েছেন তারা বলছেন যে তাদেরকে সরল সুদে ঋণ প্রদান করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল।

রূপালী ব্যাংক হাবিপ্রবি শাখার ব্যবস্থাপক গৌতম চন্দ্র রায় বলেন, হাবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ যে চুক্তিটি করেছিল সেই চুক্তিটি সংশোধনের জন্য আবেদন করেছে। সেই আবেদন আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়ে দিয়েছি। ২০১৮ সালের মার্চ মাসের চুক্তির সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তাই এ ব্যাপারে বিস্তারিত আমি বলতে পারছি না।

ওই সময়ে দায়িত্বরত ব্যাংকের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার রায় বলেন, ওই সময় যে চুক্তি হয়েছে তা চক্রবৃদ্ধি হারেই হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এখন চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের ঋণের অর্থ সরল সুদের বলে প্রদান করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। সেই দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। সেই সময়ে যারা দায়িত্বে ছিলেন বিষয়টি তাদের। এ বিষয়ে এর চেয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।

ওই সময়ে দায়িত্বরত রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. সফিউল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেছেন। সেই সময় থেকে অদ্যাবধি দায়িত্বে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিট শাখার উপ-পরিচালক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। কিন্তু তিনি চুক্তিটি সরল সুদে নাকি চক্রবৃদ্ধি হারে ছিল তা জানাতে পারেননি।

তিনি বলেন, চুক্তিপত্র দেখতে হবে, চুক্তিপত্র আমার কাছে নেই। সমস্যা আছে সমাধান হবে। বিষয়টিতো ব্যাংক আর বিশ্ববিদ্যালয় সমাধান করবে। এটা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করার মতো কিছু আছে কি? এখনও সেই সময়টা হয়নি। এখন আপাতত নিউজ করার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন হলে আপনাদের দারস্ত হবো।

ওই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব শাখার পরিচালক অধ্যাপক ড. শাহাদৎ হোসেন খান জানান, সে সময়ে চুক্তির কোনো কিছুতে আমাকে রাখা হয়নি। আমি পরিচালক থাকলেও আমাকে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। আমাকে চুক্তি দেখতে দেওয়া হয়নি, কোথাও আমার স্বাক্ষর নেই।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।