রাখাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র শিপন

আমিন ইসলাম জুয়েল আমিন ইসলাম জুয়েল , জেলা প্রতিনিধি ,পাবনা পাবনা
প্রকাশিত: ০৫:৪৮ পিএম, ০১ নভেম্বর ২০২২

পাবনার বেড়া উপজেলার চর রোরামারা গ্রামের স্কুল থেকে ঝরে পড়া ছাত্র ছিলেন মুস্তাকিম হোসেন শিপন। দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন। এরপর দুবছর লেখাপড়া বন্ধ থাকে। পরে এক গেরস্থের বাড়িতে রাখালির কাজ নেন। কিছুদিন যাওয়ার পর শিপনকে ডেকে এনে আবার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন তারই বাল্যশিক্ষক ফেরদৌস আলম তপন।

শিপন স্কুলে পড়ার সময় সপ্তাহের অর্ধেক দিন নগরবাড়ী ঘাটে কুলির কাজ করতেন। তবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি এখন চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পড়ছেন পরিসংখ্যানে।

শিপনের বাবার নাম আশরাফুল মোল্লা। মা শান্তি বেগম। যমুনার পাড়ে চর বোরামারা গ্রামে তাদের বাড়ি। জমিজমা বলতে কিছু নেই। বাবা এখনো ট্রাক্টর চালিয়ে সংসার চালান। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় শিপন। পরিবারে আর কেউ লেখাপড়া করতে পারেননি।

jagonews24

রোরামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফেরদৌস আলম তপন জানান, তাদের স্কুল থেকে চরের অন্যান্য অনেক ছাত্রর সঙ্গে শিপনও ঝরে যান। তার কথা সবাই ভুলেও যান। ২০১৩ সালের কোনো একদিন তিনি দেখেন স্কুলমাঠে ১০-১১ বছরের একটি ছেলে উঁকি মারছে।

তিনি এগিয়ে শিশুটিকে কাছে ডাকতেই বললো, ‘স্যার, আমাকে এক প্যাকেট বিস্কুট দেবেন?’ তখন স্কুলে ফিডিং প্রজেক্টের আওতায় বিস্কুট দেওয়া হতো। শিক্ষক ফেরদৌস আলম তপন এক প্যাকেট বিস্কুট তার হাতে দেন। এ সময় তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি স্কুলে আসবে?’ শিশু শিপন তখন জানায়, সে দুবছর লেখাপাড়া বাদ দিয়েছে। এখন গেরস্তের বাড়িতে রাখাল হিসেবে রয়েছে। সে স্কুলে আসতে ইচ্ছুক।

পরে শিক্ষক ফেরদৌস আলম তার বাবা-মাকে বুঝিয়ে তাকে আবার স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে নেন। বয়সের কারণেই তাকে আবার দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়নি।

jagonews24

সে সময় একটি শর্ত দিয়েছিলেন শিপন। বলেছিলেন, তিনি তিনদিন স্কুল করবেন আর তিনদিন তাকে ছাড় দিতে হবে। কারণ ওই তিনদিন তিনি নগরবাড়ী ঘাটে সারের বস্তা টানবেন। কারণ তার আয়ের টাকা বাড়িতে দিতে হতো। আর সামান্য কিছু টাকা নিজের পড়াশোনার জন্য ব্যয় করতেন। নগরবাড়ী ঘাটে সবচেয়ে কম বয়সী কুলি ছিলেন শিপন।

স্কুলে ভর্তি হলেও ক্লাসে বসে থাকতেন না শিপন। মাঠে গিয়ে একা একা ফুটবল খেলতেন। তবে শিক্ষকরা তাকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন ঠিকই।

শিক্ষক তপন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এসব দেখেও তাকে কিছুই বলতাম না। আমি ভাবলাম, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত সে কী করে? কিছুদিন যাওয়ার দেখা গেলো সে আর খেলছে না। অন্যদের দেখাদেখি সেও পড়শোনা করতে থাকলো। এমনকী তার সহপাঠীরা যখন খেলাধুলা করতো তখন সে ক্লাসে বসে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।’

jagonews24

‘ওর ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন শিক্ষকরা। স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষার আগে সব শিক্ষকই তার পাঠোন্নতির বিষয়টি খেয়াল করলেন। শিক্ষক-ছাত্রদের মধ্যে একটা সাড়া পড়ে গেলো। সবাই ফাইনালে দিকে তাকিয়ে থাকলেন।’

‘ফাইনাল পরীক্ষায় সে খুব ভালো করলো। লেখাপড়া বাদ দিয়ে সে দুবছর রাখালি করেছে। এরপর দুক্লাস ডিঙিয়ে ক্লাস ফোরে ভর্তি হয়ে তার ভালো করা দেখে সব শিক্ষক অভিভূত হলেন। ক্লাস ফাইভে এসে সে আরও সিরিয়াস হয়ে গেলো। তার বাড়িতে জায়গা না থাকায় বাড়ির কাছে এক ব্যক্তির একটি ছাপরা ঘরের মধ্যে কাঁথা বিছিয়ে সে থাকত এবং পড়াশোনা করতো। প্রাথমিক সমাপনি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেল মোস্তাকিম শিপন’, যোগ করেন সহকারী শিক্ষক ফেরদৌস আলম তপন।

এরপর শিক্ষক তপনের পরামর্শে নগরবাড়ী ঘাটের পাশে হরিনাথপুর এসইএসডিপি মডেল হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন শিপন। সেখানে ভর্তি হওয়ার কারণ ছিল যেন তিনি নগরবাড়ী ঘাটে সহজেই কুলির কাজটি করতে পারেন। সেখানেও একইভাবে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।

jagonews24

সপ্তাহে তিনদিন স্কুলে না গিয়ে ঘাটে কুলি হিসেবে কাজ করতেন। তা সত্ত্বেও ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভালো ফল করে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু দ্রুত হাইস্কুল জীবন শেষ করার জন্য তাকে এক ক্লাস ডিঙিয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়।

হাইস্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি ঘাটে বস্তা টানার কাজ করতেন অদম্য শিপন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি অষ্টম শ্রেণিতে গোল্ডেন এ প্লাস পান। এ সময় স্কুল থেকে লটারি করে ক্লাসের রোল নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে শিপনের রোল নম্বর হয় ১।

ক্লাস নাইনের ‘ফার্স্ট বয়’ নগরবাড়ী ঘাটে সপ্তাহের অর্ধেক দিন কুলির কাজ করতেন। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। বাড়ি থেকে আসা-যাওয়া দূরে বলে ওই স্কুলেই থাকতেন। অন্য কিছু সহপাঠী স্কুলে থাকতো। তারা রাতে কোচিং করত। শিপনও তার আয়ের টাকায় রাতে কোচিং করতেন।

jagonews24

শিক্ষক ফেরদৌস তপন জানান, তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন শিপন সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে রাত জেগে পড়াশোনা করে। তিনি তার জন্য মাঝে মধ্যেই স্কুল ফিডিংয়ের উন্নতমানের বিস্কুট পাঠিয়ে দিতেন। কারণ এটা ছিল খুবই পুষ্টিকর ও ক্ষুধা নিবারক।

এভাবে ঘাটে শ্রমিকের কাজ আর রাত জেগে পড়াশোনা করার পর ২০১৮ সালে এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস পান শিপন। তারপর ঢাকার একটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। সেই শিপন এখন চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র।

জানতে চাইলে মোস্তাকিম শিপন জাগো নিউজকে বলেন, ‘তপন স্যারের জন্যই আজ আমি রাখালি জীবন ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হতে পেরেছি। এজন্য আমি স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

সহকারী শিক্ষক ফেরদৌস তপন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঝরে পড়া শিপনকে তুলে আনতে পারা আমার শিক্ষকতা জীবনের একটি বড় পাওয়া। শিপন ধীরে ধীরে তার স্বপ্ন পূরণ করতে শুরু করেছে। তার স্বপ্ন পূরণ হলেই আমার শিক্ষকতা জীবন সার্থক হবে।’

শিপনের বাবার নাম আশরাফুল মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বোরামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলেকে ভর্তি করে দিয়েছিলাম। সেখানে শুরুর দিকে ছেলে লেখাপড়া করতে চাইতো না। আবার আমারও আর্থিক সঙ্গতি ছিল না। তাই তখন আমাদের গ্রামের বক্কার মাতবরের (আবু বকর মেম্বার) বাড়িতে ছেলেকে রাখাল রেখেছিলাম। তখন তপন স্যার ছেলেকে আবার স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। এরপর সে নিজে কাজ করে টাকা উপার্জন করে সেই টাকায় লেখাপড়া করতে থাকে। সে নিজের উপার্জনের টাকাতেই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, তপন স্যার না থাকলে আমার ছেলেকে সারাজীবন হয়তো রাখালগিরিই করা লাগতো।

jagonews24

শিপনের মা শান্তি বেগম বলেন, ‘ছেলে ক্লাস টু থেকে লেখাপড়া বাদ দিয়ে আবার লেখাপড়া শুরু করে। সে নগরবাড়ী ঘাটের লেবারিও করেছে। আমার ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।’

সাবেক ইউপি মেম্বার আবু বক্কারের বাড়িতে রাখাল ছিলেন শিপন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার বাড়ির সেই ছোট্ট রাখাল শিপন আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এটা জেনে আমার খুব ভালো লাগছে।’

প্রাথমিকে পড়ার সময় শিপনের জন্য একটি টিনের ছাপরা ঘর ছেড়ে দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষকদের অনুরোধে ছাপরা ঘরটি দিয়েছিলাম। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলা শিপন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তার জন্য কিছুটা হলেও সহযোগিতা করতে পেরেছি বলে ভালো লাগছে।’

শিপনের সহপাঠীরা অনেকেই এখন তার এক বছরের জুনিয়র হয়ে গেছে। কারণ তিনি সপ্তম শ্রেণি ডিঙিয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তার প্রাইমারি ও হাইস্কুল জীবনের তিন বন্ধু রেজাউল করিম, মাইনুদ্দিন, জাকিরুল হাসান অনার্সে ভতি হয়েছেন। তারা জানান, শিপনের সংগ্রামী জীবনের কথা তারা আগে থেকেই জানতেন। তাদের ভাষ্য, দেশে খুবই কম সংখ্যক এমন সংগ্রামী ছাত্র রয়েছে। শিপনের জন্য আমরা গর্বিত।

বোরামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার রসুল ফরিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিপনের কথা আজও মনে আছে। কারণ সে ছিল একজন ব্যতিক্রমী ছাত্র। যে প্রাইমারি স্কুলে থাকা অবস্থায় নগরবাড়ী ঘাটে লেবারের কাজ করতো। দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে সে আজ সাফল্যের সিঁড়িতে। শিপনের জন্য শুভ কামনা।’

এসআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।