৭ বছর পর কমিটি
বগুড়া ছাত্রলীগের নতুন সভাপতি ব্যবসায়ী, সম্পাদককে চেনেন না কেউ
আল মহিদুল ইসলাম জয়। বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের মিছিলে কেউ কোনোদিন তাকে দেখেননি। ছিলেন না কোনো মাঠের কর্মসূচিতেও। স্বাভাবিক কারণে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তার চেহারাটা পর্যন্ত চিনেন না। অথচ জেলার সাধারণ সম্পাদকের পদটি জয় করে নিয়েছেন তিনি।
কমিটিতে সভাপতির পদ পাওয়া সজীব সাহার গল্পটাও একই ধরনের। আগের কমিটিতে তিনি ছিলেন গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক। দলের কর্মসূচিতে জোড়ালো অংশ গ্রহণের চেয়ে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মজিবর রহমান মজনুর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে বেশি দেখা যেতো তাকে। এছাড়া শহরের মানিকচকে বাবার আটা ময়দার ব্যবসাও দেখাশোনা করেন তিনি।
সাত বছর পর ৭ নভেম্বর বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের আংশিক কমিটির নেতাদের অবয়ব দেখে ত্যাগী নেতাকর্মীরা সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। নানা ফন্দিফিকির করে ওই কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সেবনকারী, ছাত্রদল থেকে আসা নেতা, যুবলীগ থেকে ব্যাকফুটে আসা নেতাসহ ডাকাতি মামলার আসামিও। অথচ দিনরাত মাঠে ঘাম ঝরানো ত্যাগী অনেক নেতাই বঞ্চিত হয়েছেন তাদের প্রাপ্যপদ থেকে।
অভিযোগ উঠেছে, কেন্দ্রীয় নেতারা কমিটি গঠনে দলীয় সংবিধান ও প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা মানেননি।
সোমবার রাতে কেন্দ্র থেকে আংশিক ঘোষিত এ কমিটিতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ৩০ জনের নাম আছে। তবে কেন্দ্রের এ ঘোষণা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেননি স্থানীয় নেতাকর্মীরা। রাত থেকেই বগুড়া শহরের টেম্পল সড়কে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জড়ো হন তারা। ওই ভবনে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সহযোগী সব সংগঠনের কার্যালয় অবস্থিত।
বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা কমিটি প্রত্যাখ্যান করে ওই ভবনের ফটকে তালা লাগিয়ে দেন। কার্যালয়ের সামনে টেম্পল সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে স্লোগান দিতে থাকনে। মঙ্গলবারও দিনব্যাপী এ বিক্ষোভ কর্মসূচি চলে। এ কমিটি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন।
কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছাড়া সহসভাপতি পদ পেয়েছেন ১৭ জন। তারা হলেন তৌহিদুর রহমান, মিথিলেস কুমার, রাকিবুল হাসান, সাজ্জাদ আলম, নুর মোহাম্মদ, মুকুল ইসলাম, শেখ হৃদয়, আতিকুর রহমান, রায়হান কবীর, তোফায়েল আহমেদ, সিদ্ধার্থ কুমার দাস, শামিমা সুমি, জাহিদ হাসান, আল আমিন হোসেন পাপ্পু, অনুরাগী তিশা, সবুজ বিশ্বাস ও রাকিবুল হাসান।
যুগ্ম সম্পাদক পদ পেয়েছেন পাঁচজন। মাহফুজার রহমান, রাকিবুল হাসান, মিনহাজুল ইসলাম সজল, আহসান গালিব ও আহসান হাবীব। সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পেয়েছেন ছয়জন আল নোমান সাব্বির, আল ইমরান হোসেন, নয়ন অধিকারী, বজলুর রহমান, রিয়াজ মাহমুদ রক্সি ও সুজন আকন্দ।

ছাত্রলীগের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা জানান, সদ্য ঘোষিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আল মাহিদুল ইসলাম জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নন। জেলা ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে কখনো অংশও নিতে দেখেননি কেউ। তিনি আদমদীঘি উপজেলার বাসিন্দা। থাকেন ঢাকায়। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খানের সঙ্গে সখ্য থাকায় তিনি পদ বাগিয়েছেন। সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়া ইমরান হোসেন আগে ছাত্রদলের রাজনীতি করতো। তার বাড়ি গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে। একই পদ পাওয়া বজলুর রহমানকে কেউ কখনো ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে দেখেনি। রিয়াজ মাহমুদ রক্সি নামের ছাত্রনেতাকে কেউ চিনতেই পারছেন না। তাকে এখন খোঁজা হচ্ছে বলে জানান তারা।
নেতাকর্মীরা আরও জানান, সহ-সভাপতি আল আমিন হোসেন পাপ্পু একটি ডাকাতি মামলার আসামি। তার ছবিসহ পত্রিকায় গণপিটুনির ছবিও ভাইরাল হয়। ছাত্রদল থেকে ক্ষমতার লোভে ছাত্রলীগে যোগ দেওয়া এ নেতা ডাকাতি মামলায় জেলও খেটেছেন। সহ-সভাপতি শামিমা সুমি সাহার বিরুদ্ধে রয়েছে সমকামিতার অভিযোগ। এ কারণে পুলিশের হাতে তিনি আটক হয়েছেন। শিক্ষকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বহিষ্কৃত নেতা আতিকুর রহমান পেয়েছেন সহ-সভাপতির পদ। আরেক সহ-সভাপতি শেখ হৃদয় ছাত্রদল থেকে ছাত্রলীগে এসে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ আছে। যুগ্ম সম্পাদক আহসান গালিব প্লাবন মদ থেকে মাতলামি করার সাক্ষী হয়েছেন অনেকেই। সাংগঠনিক সম্পাদক নয়ন অধিকারী আগে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। এখন ব্যাকফুটে এসে ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়ে গেছেন। এ রকম আরও অনেক নেতাই আছেন যাদের চেনে না স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ পাওয়া মাহফুজার রহমান বলেন, ‘আমরা মাঠে থেকেছি। অথচ যার চেহারা কখনো নেতাকর্মীরা দেখেনি তাকে সাধারণ সম্পাদকের পদ দেওয়া হয়েছে। সে ঢাকায় পড়াশোনা করে। কেন্দ্রের কিছু নেতার সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে। এটা কোনো যোগ্যতা হতে পারে না।’
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন নতুন কমিটিতে সহ-সভাপতি পদ পাওয়া সিদ্ধার্থ কুমার দাস, রাকিবুল হাসান, নুর মোহাম্মদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া আহসান হাবীব।
বগুড়া ছাত্রলীগের কমিটির ব্যাপারে সাবেক সভাপতি নাইমুর রাজ্জাক বলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনই জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমানের অনুসারী। হয়তো এ কারণে যোগ্যতার বিবেচনা করা হয়নি। দলে অনেক যোগ্য ছেলে ছিল। স্বাভাবিক কারণে অনেকের মন ভেঙে যাবে। দল করতে চাইবে না।
সভাপতি পদপ্রত্যাশী ছিলেন মুকুল হোসেন। তবে তাকে দেওয়া হয়ে ৬ নম্বর সহ-সভাপতির পদ। এরপরই তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। লিখেছেন, ভালোবাসার সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বিদায়।
জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনু জাগো নিউজকে বলেন, সবার মন রক্ষা সম্ভব নয়। অনেকেই তদবির করেছে। কেন্দ্র যাকে যোগ্য মনে করেছে তাকে দায়িত্ব দিয়েছে। এখানে বিক্ষোভ করা বা কাউকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই। এছাড়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি তদন্ত করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ব্যবস্থা নেবে।
এসজে/জেআইএম