কুয়াকাটা

সৈকতের বালিতে পাউবোর কোটি টাকার বাণিজ্য

আব্দুস সালাম আরিফ আব্দুস সালাম আরিফ , জেলা প্রতিনিধি, পটুয়াখালী
প্রকাশিত: ০৬:১৬ পিএম, ০৮ জুন ২০২৩

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের বালিতেই কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রতি বছর সৈকত রক্ষার নামে কোনো ধরনের নিয়মনীতি না মেনে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ভরাটের কাজ হাতে নিচ্ছে সংস্থাটি। কাজের সিডিউলে বাইরে থেকে বালি এনে তা জিও টিউব ও জিও ব্যাগে ভরার কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে ড্রেজার মেশিনে সৈকতের বালি দিয়েই জিও টিউব ভরা হয়। এবছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে অভিযোগ পেয়ে এবার কাজ বন্ধ করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

অভিযোগ রয়েছে গত চার বছরে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষার নামে ৮ কোটি টাকা ব্যয় করলেও কোনো কাজেই আসেনি সেসব। আর এ বছরও প্রায় দুই কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

এদিকে সৈকতের যত্রতত্র জিও টিউব ও জিও ব্যাগ স্থাপনের ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমে এসব জিও ব্যাগের কারণে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন সৈকতে নামা পর্যটকরা। বেশ কয়েকজন পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

কুয়াকাটার স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী রাজু আহম্মেদ বলেন, বুধবার (৭ জুন) সকাল থেকে হঠাৎ করেই দেখি সৈকতের জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন পূর্বদিকে ৪টি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে সৈকতের বালি কেটে জিও টিউবে ভরাট করা হচ্ছে। আমরা নিষেধ করলেও তারা সৈকতের বালি দিয়েই জিও টিউব ভরাট করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়া সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, সৈকতের বালি কেটে জিও ব্যাগে ভরছে এমন সংবাদ আমিও পেয়েছি, বর্তমানে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সৈকতের বালি কাটার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই পানি উন্নয়ন বোর্ড বিচ রক্ষার নামে জিও টিউব ও জিও ব্যাগের অস্থায়ী প্রকল্প হাতে নেয়, যা সৈকতের কোনো কাজেই আসে না। উল্টো সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। কুয়াকাটায় দরকার স্থায়ী কোনো প্রকল্প। যাতে করে বিচ রক্ষাও হবে, সৌন্দর্যও বাড়বে। এখন যা করছে তা শুধু অর্থ অপচয়।

সৈকতের বালিতে পাউবোর কোটি টাকার বাণিজ্য

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে উত্তাল সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ে সাগর পাড়ে। এ কারণে বিগত কয়েক বছর থেকে সমুদ্র সৈকতে বালিভর্তি জিও ব্যাগ এবং জিও টিউব বসাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। গত ৪ বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড সমুদ্র সৈকতের জিরো পয়েন্টের দুই পাশে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ফেলে জরুরিভাবে তীর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে ২০১৯ সালে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই কিলোমিটার এলাকায় সৈকতের জিও টিউব এবং জিও ব্যাগ স্থাপন করে। যা কিছুদিন পরেই সমুদ্রে ভেসে যায়। এছাড়া ২০২১ সালে ৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সৈকতের দেড় কিলোমিটারে জিও টিউব এবং জিও ব্যাগ স্থাপন করে। এতে বিগত বছরের তুলনায় কম জায়গায় দ্বিগুণ ব্যয় করলেও বর্তমানে তা এখন অদৃশ্য। সর্বশেষ ২০২২ সালে সৈকতের দুই কিলোমিটার এলাকায় ২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব স্থাপন করে যা এখন পর্যটকদের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে এসব জিও ব্যাগ সৈকতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকায় সমুদ্র সৈকতে এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং বড় বড় গর্তের তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে এবছরও ১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সৈকতের দেড় কিলোমিটার এলাকায় জিও টিউব ও ৩৭ হাজার জিও ব্যাগ দিয়ে একটি অস্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। আর এসব জিও ব্যাগ ও জিও টিউবে বাইরে থেকে বালি এনে কাজ করার কথা থাকলেও তা শুধু কাগজে কলমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে।

জিও ব্যাগ ও জিও টিউবের কাজ বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাচারাল’র ঠিকাদার মো. লিটন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ অভিযোগ মিথ্যা। আমরা বাইরে থেকে বালি এনে কাজ করছি।

তবে ৪টি ড্রেজার দিয়ে সৈকত থেকে বালু কাটছেন এমন ভিডিওর বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন আপনি এসে দেখেন। এরপরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

সৈকতের বালিতে পাউবোর কোটি টাকার বাণিজ্য

এ বিষয়ে কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ও পটুয়াখালীর জেল প্রশাসক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, সৈকত থেকে বালি তুলে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ভরাট করার বিষয়ে এরইমধ্যে আমি অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মহিববুর রহমান মহিব বলেন, কাজটি ঠিকভাবে করা উচিত, সৈকতের বালি ব্যবহার করে এমনটি করা ঠিক নয়। এ বিষয়ে আমি খোঁজ খবর নিচ্ছি।

এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।