গেটম্যানের ঘুমে প্রাণ গেলো ট্রাকচালক-হেলপারের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ০৬:৪৩ পিএম, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩

ভুষিবোঝাই ট্রাকটি যখন রেলগেটে ঢুকে পড়ে তখন ক্রসিংয়ের গেট ছিল খোলা। আর সে কারণেই খুলনামুখী রকেট মেইল ট্রেনটির সামনে পড়ে যায় এটি। সরে যাওয়ার আগেই ধাক্কা লেগে চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে উল্টে যায় ট্রাকটি। এতে ট্রাকের ভেতরে থাকা চালক ও হেলপার ঘটনাস্থলেই নিহত হন।

রোববার (২৪ ডিসেম্বর) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে যশোর সদরের চুড়ামনকাটি রেলক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটার পর থেকে ওই রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান পলাতক রয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

তাদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার সময় প্রচণ্ড কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল। ওই সময় গেটম্যান ঘুমিয়ে ছিলেন। গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

নিহতরা হলেন, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার কাগমারী গ্রামের বাহাদুর মিয়ার ছেলে ট্রাকচালক পারভেজ হোসেন (৫০) ও মহেশপুর উপজেলার আজমপুর গ্রামের মৃত শহিদুল ইসলাম ওরফে শহিদের ছেলে হেলপার নাজমুল ইসলাম (৪০)।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চিলাহাটি থেকে ছেড়ে আসা রকেট মেইল ট্রেনটি খুলনার উদ্দেশে যাচ্ছিল। ট্রেনটি যখন যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি রেলক্রসিং পার হচ্ছিল সেসময় চৌগাছাগামী ভুষিবাহী (ঝিনাইদহ ট-১১-১৬৬৭) একটি ট্রাক ক্রসিংয়ে উঠে পড়ে। রেল ক্রসিংয়ের ব্যরিয়ার (প্রতিরোধক বার) খোলা থাকায় ট্রাকটি ক্রসিংয়ে ঢুকে পড়ে। এমন সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ট্রাকের হেলপার ও ড্রাইভার ঘটনাস্থলেই মারা যান। দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস, রেলওয়ে পুলিশ, সদর পুলিশসহ প্রশাসন উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে।

স্থানীয় বাসিন্দা চুড়ামনকাটি গ্রামের আনিসুর রহমান বলেন, আজ ভোর থেকেই এলাকায় ঘন কুয়াশা ছিল। বাড়ির মধ্যে থেকে বিকট শব্দ শুনে রাস্তায় বের হয়ে দেখি রেললাইনের পাশে উল্টে আছে বড় ট্রাক। ট্রাকটি দেখেই বুঝলাম ট্রেনে ধাক্কা লেগেছে। কাছে গিয়ে দেখি ট্রাকের ভেতরে দুটি মানুষ। তারা দুজনেই রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এরপর পুলিশ আর ফায়ার সার্ভিস এসে ট্রাকে থাকা ভুষি সরিয়ে রেললাইন পরিষ্কার করে। এ সময় নিহত দু’জনের মরদেহ উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

তিনি জানান, এই রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বে ছিলেন চুড়ামনকাটি দাসপাড়া এলাকার সজল কুমার। তিনি গেট লাগানোর দায়িত্ব পালন না করে ঘুমিয়ে থাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

ট্রাক হেলপার নিহত নাজমুলের মা নাসিমা বেগম বলেন, ওরে ট্রাকে হেলপারি করতে নিষেধ করেছি। তারপরও আমার কথা না শুনে গাড়ি চালাতে আসে। গতকাল সন্ধ্যায় আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়। আর সকালে শুনি আমার ছেলে এই দুনিয়াতে নেই।

আহাজারি করে তিনি বলেন, দোষ সব ওই গেটম্যানের। যদি রেলগেটের বারটি নামাতো গেটম্যান, তাহলে আমার ছেলেটারে এভাবে জীবন দিতে হতো না। এতোক্ষণে ছেলেটা আমার বুকে থাকতো। চার বছর আগে আমার স্বামী মারা গেছে। আমার একটাই ছেলে। এই ছেলেটা আমার সংসার চালাতো। এখন আমার কী হবে! আমার সব শেষে হয়ে গেছে।

ট্রাকটির মালিক শাহীন হোসেন জানান, শনিবার ঢাকার সিটি মিল থেকে আমার ট্রাকে করে ভুষি নিয়ে আসছিল। ভুষিগুলো দেওয়ার কথা ছিল চৌগাছার শফি স্টোরে। গেটম্যানের ভুলের কারণে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। ট্রেন আসার আগে গেটের বারটি লাগানো থাকলে এই দুর্ঘটনাটি ঘটতো না। গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলার কারণে আমার দুই কর্মচারীর প্রাণ গেলো। একইসঙ্গে আমার ট্রাকটি দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে গেলো।

এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে যশোর সেনানিবাস ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।

সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা নাহিদ মামুন বলেন, সকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে আমরা দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। ভুষিবোঝাই ট্রাকটি উল্টে গেছিল। তার সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আমরা স্পটডেড হিসেবে ট্রাকের চালক ও হেলপারকে উদ্ধার করি।

তিনি আরও বলেন, আমরা রেললাইনের ওপরে পড়া থাকা ভুষি পরিষ্কার করি। পরে পুলিশ এসে ট্র্যাকার দিয়ে ট্রাকটি সরিয়ে ফেলে।

যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ট্রেনের সঙ্গে ট্রাকের ধাক্কায় ট্রাকচালক ও হেলপারের মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি জিআরপি পুলিশের। এই ঘটনায় আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর থেকে গেটম্যান পলাতক রয়েছে।

যশোর রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার আইনাল হাসান বলেন, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চিলাহাটি থেকে খুলনামুখী রকেট মেল ট্রেনটিতে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর খুলনাগামী সকল রেললাইনে ট্রেন চলাচল কিছুক্ষণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে আবার ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।

মিলন রহমান/এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।