হাতকড়া পরিয়ে রিকশাচালককে ৫ ঘণ্টা নির্যাতনের অভিযোগ
যশোর শহরের রায়পাড়া সার গোডাউন এলাকায় ইউনুস আলী নামের এক রিকশাচালক র্যাবের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রোববার (২৪ ডিসেম্বর) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের শিকার ইউনুস সোমবার দুপুরে প্রেস ক্লাব যশোরে এসে নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দেন। তবে নির্যাতন চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছে র্যাব।
নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে রিকশাচালক ইউনুস আলী (৩৫) বলেন, “রোববার ৩০-৩৫ বছর বয়সী চারজন আমার বাসায় আসেন। এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নাম কি ইউনুস? বললাম ‘হ্যাঁ’। এরপরই তারা ঘরে ঢুকে গেলেন। ঘরে ঢুকেই তারা বললেন, ‘আমরা র্যাবের লোক’। এরপর ঘরের এদিকে- ওদিকে একটু তাকিয়েই তাদের মধ্যে থেকে একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, মালডা কই?’ বুঝতে না পারাতে আমি বললাম, ‘কী জিনিস স্যার?’ তখন তাদের মধ্যে একজন বললো, ‘বুঝবি! যখন হাত-পা বেঁধে ঝুলাবো!”
ইউনুস আরও বলেন, ‘কিছু না পেয়ে আমাকে হাতে হ্যান্ডকাফ লাগালেন তারা। চেয়ারে পড়ে থাকা আমার ১০ বছর বয়সী মেয়েটার হিজাবটা দিয়ে মুখ বেঁধে ফেললেন। এরপর তাদের কাছে থাকা লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি নির্যাতন করতে থাকেন। বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তাদের এলোপাতাড়ি মারার কারণে শুধু কাতরিয়েছি। মুখ বাঁধার কারণে চিৎকারও করতে পারিনি। তারপরও তারা নির্যাতন বন্ধ করেননি।’
ইউনুস যশোর শহরের রায়পাড়া সার গোডাউন এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী, দুই সন্তান ও বয়স্ক মাকে নিয়ে বসবাস করেন। নির্যাতনের শিকার হয়ে পুলিশের কাছে দারস্থ হলেও তারা কোনো প্রতিকার পাননি। শেষমেশ আজ দুপুরে প্রেস ক্লাবে এসে সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দেন ইউনুস আলী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইউনুস আলীর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত শাহাদাত মোল্লা। প্রায় এক দশক ধরে পরিবার নিয়ে যশোর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রায়পাড়া সার গোডাউন এলাকায় বসবাস করেন। নিয়মিত রিকশা চালানোর পাশাপাশি সার গোডাউনেও কাজ করেন তিনি। র্যাবের কাছে নির্যাতনে আহত হয়ে বর্তমানে যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইউনুস।
তবে র্যাবের দাবি, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারেন রিকশাচালক ইউনুসের বাড়িতে এক সন্ত্রাসীর অস্ত্র রাখা রয়েছে। এজন্য ইউনুসের বাড়িতে অভিযান চালায় র্যাব। তবে অভিযানে অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

সোমবার মাকে নিয়ে প্রেস ক্লাবে এসে ইউনুস আলী যখন জামাকাপড় খুলে সাংবাদিকদের নির্যাতনের ক্ষত দেখাচ্ছিলেন, তখন তিনি অঝোরে কাঁদছিলেন। তার শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ক্ষতের চিহ্ন দেখা গেছে। পায়ে আঘাত করার কারণে দুই পা দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন তিনি।
ইউনুস আলী বলেন, ‘আমি রিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। প্রতিদিনের মতো রোববার শহরে রিকশা চালিয়ে দুপুরে ভাত খেতে বাড়িতে যাই। ভাত খাওয়ার পরপর র্যাবের লোকজন আসে। এসে অস্ত্রের কথা জিজ্ঞাসা করে। তারা অভিযান চালিয়ে কোনো অস্ত্র পাননি।’
তিনি বলেন, ‘আমি কখনো অস্ত্রই দেখেনি। তারপরও আমাকে এভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। র্যাবের সদস্যরা যখন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, তখন আমি কোরআন শরিফ ও আমার মায়ের হাত মাথার ওপরে হাত রেখে বলেছি, আমার কাছে অস্ত্র নেই। তারপরও তারা বিশ্বাস করেননি। হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে, মুখে আমার মেয়ের হিজাব দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করেছেন। আমি এখন অসুস্থ, আতঙ্কিত।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইউনুসের মা রাবেয়া বেগম বলেন, ‘আমরা অনেক গরিব মানুষ। আমার ছেলে রিকশা চালিয়ে সংসার চালায়। কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না। কোনো মামলাও নাই। তারপরও মিথ্যা অভিযোগে আমার ছেলেটারে র্যাব এসে নির্যাতন করেছে। আমরা তাদের কতবার বুঝিয়েছি, তারপরও তারা কোনো কথা শোনেনি। ছেলেটা এখন অনেক অসুস্থ।’
সার গোডাউন পাড়ায় গিয়ে কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউনুসরা দীর্ঘদিন ধরে এ সার গোডাউন এলাকায় বসবাস করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। র্যাব যখন তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে, তখন উৎসুক এলাকাবাসীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে ঘরের ভেতরে কী হয়েছে তা তারা জানেন না।
এ বিষয়ে র্যাব-৬ যশোরের কোম্পানি অধিনায়ক মোহাম্মদ সাকিব হোসেন বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিকে ইউনুসের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। আমাদের কাছে তথ্য ছিল তার বাড়িতে অস্ত্র রাখা আছে। জিজ্ঞাসাবাদে অস্ত্র রাখার কথা ইউনুস ও তার মা স্বীকার করেছেন। তবে অভিযানের আগেই অস্ত্রটি যিনি রেখেছিলেন তিনি নিয়ে গেছেন।’
র্যাবের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, অভিযানে তাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি। তার অভিযোগ মিথ্যা।
মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, কেউ অপরাধ করলে সাংবিধানিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। কিন্তু নির্যাতন করা মানবাধিকার লঙ্ঘন। রিকশাচালক ইউনুসের ওপর নির্যাতনের ভয়াবহতা দেখেছি। অমানবিক নির্যাতনের চিহ্ন তার শরীরে ফুটে উঠেছে। তার আইনগত ব্যবস্থার দরকার হলে আমরা তাকে সহযোগিতা করবো।
মিলন রহমান/এসআর/এএসএম