সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারে কর বাড়তে পারে ৪০% পর্যন্ত
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের নির্দেশ বাস্তবায়িত হলে রপ্তানিমুখি নিটওয়্যার পণ্য উৎপাদনকারীদের ৩৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ থেকে ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কর পরিশোধ করতে হতে পারে।
এর আগে গত ১২ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের অনুরোধ জানায়।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে এইচএস কোড ৫২০৫ ও ৫২০৬ এর সুতা আমদানিতে, যা বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাকশিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, পোশাক রপ্তানিকারকরা মনে করছে এর ফলে রপ্তানির বাজারে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবেন না এবং রপ্তানির কার্যাদেশ হারাবেন। বর্তমানে রপ্তানিতে যে নেতিবাচক ধারা চলছে তা আরও লম্বা এবং বড় আকার ধারণ করবে।
এইচএস কোড ৫২০৫ এর (কটন সুতা) ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের এখন আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ এবং অগ্রিম শুল্ক (এটি) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে। ফলে মোট শুল্কহার দাঁড়িয়েছে ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
আরও পড়ুন
১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার
নির্দেশনা বাতিলের দাবিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিজিএমইএ-বিকেএমইএর চিঠি
বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ বাতিলের আহ্বান
টানবাজারে সুতার ব্যবসায় টান
অন্যদিকে, এইচএস কোড ৫২০৬ ও অন্যান্য সুতা আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি ৫ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ ও অগ্রিম কর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ দিতে হতে পারে। ফলে মোট শুল্কহার দাঁড়াতে পারে ৩৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
যা বলছেন রপ্তানিকারকরা
শিল্প বিশ্লেষকরা বলছেন, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা না থাকলে আমদানিকারকরা শুল্ক আগেই পরিশোধ করতে বাধ্য হবেন। এতে সুতা আমদানি ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় দেশের বস্ত্রখাতের যোগানশৃঙ্খলায় চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে স্থানীয় বাজারে সুতার মূল্যবৃদ্ধি পেতে পারে এবং পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে।
চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বৈশ্বিক চাপ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্কের প্রভাব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা এজন্য দায়ী। নতুন করে বন্ডের অধীনে ১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানির সুবিধা প্রত্যাহার করলে তৈরি পোশাকশিল্পের সংকট আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশ সুতা আমদানি বন্ধ করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতের চাষিরা
বাংলাদেশের কাপড়-পাট-সুতার পণ্য আমদানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞা
তুলা আমদানিতে ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার চান টেক্সটাইল মালিকরা
সুতা আমদানি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ
১০-৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহার জাতীয় অর্থনীতি, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাত মোট রপ্তানি আয়ে ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে বলে জানান বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান।
অন্যদিকে, এ খাতের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সুতা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার আওতায় আমদানির সুযোগ পেয়ে আসছে, যা বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার একটি মৌলিক ভিত্তি। এই সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে রপ্তানিমুখী শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তিনি দাবি করেন।
ফজলে শামীম এহসান আরও বলেন, এতে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পে কাঁচামাল সরবরাহে গুরুতর বিঘ্ন ঘটবে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং পণ্যের মূল্য বাড়বে, যা ক্রেতা-নিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব হবে না।
আরও পড়ুন
সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারে বায়াররা উদ্বিগ্ন
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ বাতিলের দাবি
ট্যারিফ কমিশন একপক্ষীয় সুপারিশ করেছে, দাবি রপ্তানিকারকদের
স্থলবন্দর ব্যবহার করে সুতা আমদানি বন্ধের আহ্বান বিটিএমএ’র
কাঁচামাল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে অর্ডার সরিয়ে ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ অন্যান্য প্রতিযোগী দেশে স্থানান্তর করতে পারে। ফলে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান শামীম।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (অ্যাপারেল) রপ্তানিতে বোনা (ওভেন) ও নিট—দুই খাতই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে মোট পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
আরও পড়ুন
সুতা আমদানি বন্ধে নতুন বিপদে পোশাক রপ্তানিকারকরা
ভারতীয় সুতার কারণে ক্ষতির মুখে দেশীয় টেক্সটাইল মিলস
কম দামে সুতা রপ্তানি করে ভারত আগ্রাসন চালাচ্ছে: রাজীব হায়দার
সুতা, রং, রাসায়নিক আমদানিসহ ৪ দাবিতে তাঁতবোর্ড ঘেরাও
এর মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি হয়েছে ২০ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, যা মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, নিটওয়্যার খাতই এখন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে স্থিতিশীল চাহিদা এ খাত এগিয়ে রেখেছে।
অন্যদিকে, ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৮ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ। নিটের তুলনায় কিছুটা কম হলেও, উচ্চমূল্যের পণ্য ও পণ্যের বৈচিত্র্যের কারণে ওভেন খাত এখনো রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে রয়েছে।
আইএইচও/এমএমএআর/এমএফএ/এমএস