পাইপলাইন ফুটো করে চুরি, সিস্টেম ছিল নিশ্চুপ
একের পর এক ত্রুটি ও জটিলতা সামনে আসছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পৌনে ৪ হাজার কোটি টাকার চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন (সিডিপিএল) প্রকল্পে। পাইপলাইন ফুটো করে ডিজেল চুরির ঘটনার পর প্রকাশ্যে আসছে প্রকল্পটির নির্মাণ পর্যায়ের শত অসঙ্গতির তথ্য। সম্পূর্ণ অটোমেটেড বলা হলেও নির্মাণ-সংযোজনের পর থেকেই মাসের পর মাস বন্ধ থাকছে অটোমেশন সিস্টেম। পাইপলাইন ফুটোর ঘটনা তদন্তে উঠে এসেছে—অটোমেশন সিস্টেমে ত্রুটির বিষয়টি, তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার তা অস্বীকার করেছেন।
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, বছরে ৫০ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহের সক্ষমতাসহ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জ্বালানি পরিবহনের সিস্টেম লস কমানো, নৌপথে তেল পরিবহনের বিপুল খরচ সাশ্রয়সহ দ্রুততম সময়ে তেল পৌঁছানোর লক্ষ্যে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। পুরো প্রকল্পে ব্যয় হয় তিন হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
গত ৮ জানুয়ারি মিরসরাইয়ে চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন ফুটো করে ডিজেল চুরির ঘটনা ধরা পড়ে। এ ঘটনায় পাইপলাইন তত্ত্বাবধানকারী বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসি) পিএলসি চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হককে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত সপ্তাহে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে, সিডিপিএল প্রকল্পের নানান অসঙ্গতি উঠে আসে। ২৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন প্রকল্পে পুরো অটোমেশন সিস্টেম কার্যকর করতে আরও এক বছর সময় লাগার কথা জানান প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হক।

চট্টগ্রামে পাইপলাইনের ওপর ঘর বানিয়ে মাটির নিচে লাইনে ফুটো করে তেল চুরি করে আসছিল অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা, ছবি: সংগৃহীত
ওপরে লেপ-তোষকের কারখানা বানিয়ে পাইপলাইন ফুটো
গত ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই থানাধীন হাদি ফকিরহাট এলাকায় পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। পাইপলাইনে ফুটো করার ঘটনা আরও আগে ঘটলেও প্রকল্পে সংযোজিত অটোমেশন সিস্টেমে তা ধরা পড়েনি। ওইদিন চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার অটোমেশন ডিপোতে পাম্পিং করার অতিরিক্ত চাপে তেল ছড়িয়ে পড়লে ঘটনা প্রকাশ্যে আশে। মিরসরাইয়ের ওই এলাকায় পাইপলাইনের ওপর ঘর বানিয়ে মাটির নিচের লাইনে ফুটো করে তেল চুরি করে আসছিল অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পাইপলাইনের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান জেএসএসএসএল-এর লোকজন পিটিসি পিএলসিকে মোবাইলে খবর দিলে ডেসপাস টার্মিনালে জানতে পারে পাইপলাইন ফুটোর খবর। অথচ প্রকল্পে ডেসপ্যাচ টার্মিনালে সংযোজিত পাইপলাইন ইন্ট্রুশন ডিটেকশন সিস্টেম (পিআইডিএস) এবং লিক ডিটেকশন সিস্টেমের (এলডিএস) মনিটরে এ ঘটনা জানার কথা ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের। কিন্তু পাইপলাইন ফুটোর সংকেত দেয়নি পিআইডিএস এবং এলডিএস। ঝুঁকি এড়াতে অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ে নিরাপত্তামূলক সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয় চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন প্রকল্পে। কিন্তু টাকা ব্যয় হলেও প্রকল্পের সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন (সিডিপিএল) প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, প্রতি বছর প্রকল্প থেকে ৩২৬ কোটি টাকা আয় হবে। পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ, ফুয়েল, বিদ্যুৎ বিল, জমির ভাড়াসহ আরও কিছু খাতে ব্যয় হবে ৯০ কোটি টাকা। এতে প্রতি বছর সাশ্রয় হবে ২৩৬ কোটি টাকা। আগামী ১৬ বছরের মধ্যে প্রকল্পের বিনিয়োগ উঠে আসবে।
পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি পিএলসির গঠিত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইনের ডেসপ্যাচ টার্মিনালের কন্ট্রোলরুমে স্থাপিত পিআইডিএস এবং এলডিএস সিস্টেমের হিস্টোরিক্যাল তথ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, ৮ জানুয়ারি উক্ত স্থানে (পাইপ ফুটোর স্থান) পাইপলাইনের লিকের কোনো সংকেত এলডিএসের মাধ্যমে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া পিআইডিএস’র হিস্টোরিক্যাল ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনাস্থলের (ডেসপ্যাচ টার্মিনাল থেকে ৬২ দশমিক ৪৮৩ কিলোমিটার) কোনো খনন কাজের সংকেত পাওয়া যায়নি। তবে ৬৩ দশমিক ২৩ কিলোমিটার দূরত্বে সংকেত পেলেও সেখানে কোনো খননকাজ পরিলক্ষিত হয়নি।
আরও পড়ুন
ওপরে ঘর তুলে পাইপলাইন ফুটো করে বিপিসির তেল চুরি
পাইপলাইনে জ্বালানি পরিবহনে বছরে সাশ্রয় হবে ২৩৬ কোটি টাকা
পাইপলাইন থেকে যমুনার পৌনে ৪ লাখ লিটার ডিজেল গেলো কোথায়
৬৮.৩৫ লাখ টন জ্বালানি বিক্রি বিপিসির, শীর্ষে পদ্মা অয়েল
কন্ট্রোলরুমের শিফট রেজিস্ট্রার পরীক্ষা করে দেখা যায়, টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেমের যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন না থাকার কারণে পিআইডিএস প্রায়শ অকার্যকর অবস্থায় ছিল। গত তিন মাসে (২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত) পিআইডিএস ১০৮ বার অকার্যকর হয়ে যায়। পাইপলাইন বরাবর ও বিভিন্ন স্টেশনে স্থাপিত ফিল্ড ইনস্ট্রুমেন্ট যথাযথভাবে কার্যকর না থাকায় এলডিএসও ৪৯ দিন অকার্যকর ছিল।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, পাইপলাইন ফুটোর ঘটনার পর দিন ৯ জানুয়ারি মেরামতের জন্য পাইপলাইনের ওপর এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি খনন করার সময় পিআইডিএসে কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি। পরে পাইপলাইনের ছিদ্রের ওপর রিপেয়ার ক্লাম্প বসাতে কোটিং অপসারণের জন্য সিজিলিং করার সময়ও পিআইডিএসে কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি। ডিজাইন স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী, পাইপলাইন থেকে ১০-২০ মিটার দূরত্বের মধ্যে খনন করা হলে পিআইডিএস থেকে সংকেত পাওয়ার কথা। কিন্তু পিটিসি পিএলসির কন্ট্রোল রুম থেকে এই দূরত্বে কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে তেল সরবরাহের পাইপলাইন/ফাইল ছবি
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে গোদনাইল রিসিপ্ট টার্মিনালের (আরটি) সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইজিশনের (স্কাডা) চারটি সার্ভার নষ্ট হয়ে যায়। এগুলো হচ্ছে—স্কাডা প্রাইমারি, স্কাডা সেকেন্ডারি, এলডিএস সার্ভার এবং ওয়েভ সার্ভার। পরে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি ওই সার্ভারগুলো গোদনাইল রিসিপ্ট টার্মিনালে বসানো হলেও সেগুলি অদ্যাবধি (তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখে) কার্যকর হয়নি। গোদনাইল রিসিপ্ট টার্মিনালে এলডিএস সার্ভার দীর্ঘদিন নষ্ট থাকায় এবং আরটিইউ প্যানেলে পাওয়ার বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ এলডিএস অকার্যকর ছিল।
পিআইডিএসে হাজার হাজার অপ্রয়োজনীয় সংকেত
তদন্তকালে গোদনাইল রিসিপ্ট টার্মিনালের ব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) মুরাদ হাসান তদন্ত কমিটিকে জানান, গত ২ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ভেহিক্যাল সিগন্যাল বাদে ১৮৫টি সিগন্যাল পাওয়া যায়। কিন্তু ভেহিক্যাল সিগন্যালসহ ওই তিন ঘণ্টায় ১০ হাজারের বেশি সংকেত আসে পিআইডিএসে। এতগুলো সংকেতের মধ্যে ভেহিক্যাল সিগন্যাল ব্যতীত অন্যান্য সংকেতের মধ্যে কিছু সংকেত মিসিং হয়ে যায়। যা পরে হিস্টোরিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে যায়। এ অবস্থায় একটি সিগন্যাল বিবেচনা করে পেট্রোল ম্যানকে নির্দেশনা দিলে, সেটির ফলাফল আসার আগেই আরও অনেকগুলো সংকেত চলে আসে। এতো বিপুল সংখ্যক সংকেত থেকে পাইপলাইনের জন্য বিপদজনক সংকেত চিহ্নিতকরণ একজন কন্ট্রোল রুম শিফট ইঞ্জিনিয়ারের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে অনেক সংকেতই কন্ট্রোল রুমে নিয়োজিত শিফট ইঞ্জিনিয়ারের অগোচরে রয়ে যাচ্ছে।
‘মিরসরাইয়ে পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মূলত, প্রকল্পে অটোমেশনের লিক ডিটেকশন সিস্টেম (এলডিএস) কাজ করেনি। পিআইডিএস প্রযুক্তিও তারা ঠিকমতো দেননি। স্কাডাতেও ডিগিং চলছে। এটিও কার্যকর হতে আরও দেরি হবে।’—রায়হান আহমাদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসি) পিএলসি
পতেঙ্গা ডেসপ্যাচ টার্মিনালের (ডিটি) ব্যবস্থাপক আল মো. জায়েদ এবং তার অধীনস্ত তিনজন সহকারী ব্যবস্থাপক মৌখিক ও লিখিত বক্তব্যে তদন্ত কমিটিতে জানায়, গত ২ ডিসেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফাইবার ব্রেকজনিত কারণে ডিটিতে পিআইডিএস বন্ধ ছিল। গত ২৮ ডিসেম্বর ডিসেম্বর বেলা ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পিআইডিএস সিস্টেমের মনিটরে ১৮ হাজারের বেশি সংকেতের উপস্থিতি ছিল।
আরও পড়ুন
জ্বালানি মজুত সক্ষমতা না বাড়ালে ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ
বেসরকারিতে ঝুঁকছে জ্বালানি খাত, একক নিয়ন্ত্রণ হারাবে বিপিসি
পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণে আলাদা কোম্পানি করছে বিপিসি
কর্মকর্তাদের দাবি, যথাযথ ফাইন টিউনিং না হওয়ার কারণে অপ্রয়োজনীয় অধিক সংখ্যক সংকেতের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এসব সংকেতের বিপরীতে প্রতিকারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দুরূহ বলে কমিটির তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

দেশে প্রথমবারের মতো স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) জ্বালানি বিপণন ডিপোর কার্যক্রম উদ্বোধন হয়েছে কুমিল্লায়/ফাইল ছবি
তদন্ত কমিটির ১০ সুপারিশ
তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে ১০টি সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো হলো—
১. দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য পাইপলাইনের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত জেএসএস সার্ভিস লিমিটেডের বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জমিতে পাইপলাইনের সন্নিকটে স্থাপিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান অপসারণ করতে হবে।
৩. পাইপলাইন বরাবর অধিগ্রহণকৃত ভূমি থেকে অবিলম্বে ঘরবাড়ি, দোকান ও গাছ-পালা অপসারণ করা।
৪. প্রকল্পে নিয়োজিত ভেন্ডর বেঞ্চমার্ক কনসালটিং কর্তৃক পিআইডিএস ও এলডিএসের কার্যকারিতা দ্রুত নিশ্চিত করা।
৫. ঠিকাদার নিউটেক ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক পাইপলাইন বরাবর ইনস্ট্রুমেন্টগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং মিসিং ইনস্ট্রুমেন্ট দ্রুত স্থাপন করা।
৬. পাইপলাইনের অপারেশন ও নিরাপত্তা নিরবচ্ছিন্নভাবে তদারকির জন্য স্কাডা, পিআইডিএস, টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম ও সিসিটিভি’র কার্যকারিতা নিশ্চিতে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের (ওএফসি) কার্যকারিতা নিশ্চিতে এফসি দ্রুত প্রতিস্থাপন।
৭. পিটিসি পিএলসিতে জনবল নিশ্চিত করতে অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের অতিদ্রুত নিয়োগ।
৮. রাইট অব ওয়ে প্রটেকশনের জন্য নীতিমালা তৈরি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন পাস।
৯. পাইপলাইন সংলগ্ন সরকারি জমি ও অধিগ্রহণকৃত জমির ওপর অবৈধ স্থাপনা অপসারণের পিটিসি পিএলসির অধীনে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত করা।
১০. পাইপলাইনের চেইনেজ পোস্টের দূরত্ব হালনাগাদসহ চেইনেজ পোস্টে লিখিত টেলিফোন নম্বরের পরিবর্তে টার্মিনালের কন্ট্রোলরুমের মোবাইল নম্বর লিপিবন্ধ করতে হবে।
মেকানিক্যাল ও অটোমেশন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারের বক্তব্য
তদন্ত কমিটির সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার নিউটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. বেলায়েত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি অপেক্ষাকৃত অনেক কমমূল্যে কার্যাদেশ মোতাবেক সর্বোচ্চ মানসম্মত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি সরবরাহ এবং সংযোজন করেছি। এখানে ইনস্ট্রুমেন্ট মিসিং হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের কোনো কথা উঠলে তা সঠিকও নয়।’

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)/ফাইল ছবি
‘পাইপলাইন ফুটোর ঘটনার সময়ে এলডিএস এবং পিআইডিএস কাজ করেনি। রিপোর্টে এগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর কাজ শেষ হয়নি। ফাইন টিউনিং করতে আরও কিছুদিন কাজ চলবে।’ —আমিনুল হক, মিরসরাইয়ে পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক
চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন প্রকল্পে পাইপ সরবরাহ থেকে শুরু করে অটোমেশন সিস্টেমের কাজ করেছে গণি গ্রুপের দুই অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বিল্ডস্টোন কন্সট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড এবং বেঞ্চমার্ক কনসাল্টিং কোম্পানি।
পিআইডিএস, এলডিএস প্রযুক্তি কাজ করেনি—তদন্ত প্রতিবেদনে এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গণি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর গণি চৌধুরী বলেন, ‘সিডিপিএল প্রকল্পে আমি অটোমেশনের কাজ করিনি, বেঞ্চমার্ক করেছে। বেঞ্চমার্কের সিইও আমার ভাই হলেও ব্যবস্থাপনা আলাদা।’
আরও পড়ুন
কর্ণফুলীতে বিপিসির ‘তেল চুরির’ সত্যতা মিলেছে, বন্ধে ১২ সুপারিশ
সাগর থেকে ডাঙায় ধাপে ধাপে জ্বালানি তেল চুরি
কুমিল্লায় চালু হলো দেশের প্রথম স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি বিপণন ডিপো
পরে কথা বলতে গণি গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বেঞ্চমার্ক কনসাল্টিং কোম্পানির সিইও ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ গণি চৌধুরীকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে সিডিপিএল প্রকল্পে পিআইডিএস এবং এলডিএসের কার্যকারিতা নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তার উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাদের সিস্টেম ঠিকঠাক কাজ করছে, এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি।’

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও পদ্মা-মেঘনা-যমুনা অয়েলের লোগো/ফাইল ছবি
যা বলছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা
পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসি) পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান আহমাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘মিরসরাইয়ে পাইপলাইন ফুটো করে তেল চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। মূলত, প্রকল্পে অটোমেশনের লিক ডিটেকশন সিস্টেম (এলডিএস) কাজ করেনি। পিআইডিএস প্রযুক্তিও তারা ঠিক মতো দেননি। স্কাডাতেও ডিগিং চলতেছে। এটিও কার্যকর হতে আরও দেরি হবে।’
প্রকল্পে বিপিসির পক্ষের প্রকল্প পরিচালক ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক আমিনুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাইপলাইন ফুটোর ঘটনার সময়ে এলডিএস এবং পিআইডিএস কাজ করেনি। রিপোর্টে এগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর কাজ শেষ হয়নি। ফাইন টিউনিং করতে আরও কিছুদিন কাজ চলবে।’
গত ৮ জানুয়ারি মিরসরাইয়ে চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন ফুটো করে ডিজেল চুরির ঘটনা ধরা পড়ে। এ ঘটনায় পাইপলাইন তত্ত্বাবধানকারী বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসি) পিএলসি চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইন প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হককে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত সপ্তাহে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে, সিডিপিএল প্রকল্পের নানান অসঙ্গতি উঠে আসে।
ঠিকাদার বেঞ্চমার্কের কাজে গাফিলতি রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওদের সঙ্গে যে চুক্তি, তাতে শেষ হতে আরও এক বছর সময় লাগবে। এখন তারা মনিটরিং করছে। যেটি সমস্যা হচ্ছে, সেটিতে কাজ করছে।’

২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম-ঢাকা পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, ফাইল ছবি
প্রকল্পের ইতিহাস
পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পরিবহনের এই প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে অনুমোদন পায়। শুরুতে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল। কিন্তু কাজ শুরু করতেই ২০২০ সাল লেগে যায়। পরে প্রথম দফায় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় দফায় আবারও ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। বিপিসির এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায়।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে বছরে সরবরাহ করা হবে ২৭ লাখ টন ডিজেল। পাইপে পরিবহন শুরু হলে প্রায় ২৩৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, প্রতিবছর প্রকল্প থেকে ৩২৬ কোটি টাকা আয় হবে। পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ, ফুয়েল, বিদ্যুৎ বিল, জমির ভাড়াসহ আরও কিছু খাতে ব্যয় হবে ৯০ কোটি টাকা। এতে প্রতিবছর সাশ্রয় হবে ২৩৬ কোটি টাকা। আগামী ১৬ বছরের মধ্যে প্রকল্পের বিনিয়োগ উঠে আসবে।
এমডিআইএইচ/এমএমকে/এমএমএআর/এমএস