প্রত্যাশার বারুদ
ভোটের পর সূচক বাড়লো ২০০ পয়েন্ট, বাজার মূলধনে যোগ ১২ হাজার কোটি টাকা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের পর প্রথম কার্যদিবসে দেশের শেয়ারবাজারে বড় উত্থান হয়েছে। একদিনেই প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ২০০ পয়েন্ট বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে বাজার মূলধন বেড়েছে ১২ হাজার কোটি টাকার ওপরে। পাশাপাশি পাঁচ মাস পর হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেনের দেখা মিলেছে।
বাজারটিতে পৌনে একশো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট দাম বাড়ার সর্বোচ্চ সীমায় (সার্কিট ব্রেকার) লেনদেন হয়েছে। অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) উল্লম্ফন হয়েছে। বাজারটিতে প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে প্রায় ৫০০ পয়েন্ট। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা যেন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হয়ে বাজারে তৈরি হয়েছে ‘প্রত্যাশার বারুদ’, এ যেন তারই প্রতিফলন।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া এবং নতুন সরকারের দ্রুত নীতিগত দিকনির্দেশনার আশায় বিনিয়োগকারীরা কেনার দিকে ঝুঁকেছেন। নির্বাচনের আগে টানা কয়েক মাস অনিশ্চয়তা, তারল্য সংকট ও আস্থাহীনতার কারণে বাজারে স্থবিরতা ছিল। অনেক বিনিয়োগকারী সাইডলাইনে ছিলেন। ফলাফল ঘোষণার পর তারা নতুন করে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন।
যে কারণে বাজারে লেনদেনের গতি বাড়ার পাশাপাশি মূল্যসূচকের বড় উত্থান হয়েছে। এদিন লেনদেনের শুরুতেই ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা ও বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারে ক্রেতার চাপ বেশি দেখা যায়। ফলে লেনদেন শুরু হতেই ডিএসইর প্রধান সূচক ১৩০ পয়েন্টের ওপরে বেড়ে যায়। যা অব্যাহত থাকে লেনদেনের শেষ পর্যন্ত। এমনকি লেনদেনের শেষদিকে বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও বাড়ে। ফলে সূচকের বড় উত্থান দিয়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়। অনেকে এটিকে ‘রিলিফ র্যালি’ বলছেন—অর্থাৎ অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ার স্বস্তি থেকেই এই উল্লম্ফন।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশাই নয়—অর্থনৈতিক সংস্কার, সুদহার নীতি, ডলার বাজারে স্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে নতুন সরকারের পদক্ষেপের দিকেও নজর থাকবে। যদি ঘোষিত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়নের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্থায়ী হতে পারে।
তবে তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, টেকসই ঊর্ধ্বগতির জন্য করপোরেট আয় বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য।
অবশ্য নির্বাচনের পরদিনই শেয়ারবাজারে যে উচ্ছ্বাস দেখা গেল, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে—রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটলে পুঁজিবাজার কতটা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই ‘প্রত্যাশার বারুদ’ সাময়িক উল্লাসেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি স্থিতিশীল ও সংস্কারভিত্তিক অগ্রযাত্রার ভিত্তি গড়ে তোলে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ৩৬৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ২৬টির। আর ৪টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। দাম বাড়ার তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৭৫টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম একদিনে যতটা বাড়া সম্ভব ততোটাই বেড়েছে।
এদিকে ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৯১টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৪টির দাম কমেছে এবং ২টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ৭৭টি কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ার বিপরীতে ৩টির দাম কমেছে এবং ১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৯৬টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৯টির এবং ১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আর তালিকাভুক্ত সবগুলো (৩৪টি) মিউচুয়ার ফান্ডের দাম বেড়েছে।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার কারণে ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২১ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। যা আগের কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ছিলো ৭ লাখ ৮ হাজার ৯৭৭ টাকা। অর্থাৎ বাজার মূলধন বেড়েছে ১২ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা।
ভালো-মন্দ সব ধরনের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দাম বাড়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ২০০ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট ডিএসইর প্রধান সূচক ৩০৬ পয়েন্ট বেড়েছিলো। এরপর এই প্রথম একদিনে ডিএসইর প্রধান সূচক ২০০ পয়েন্ট বাড়লো।
অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৩০ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১২৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ৮৬ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে উঠে এসেছে।
সবকটি মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ২৭৫ কোটি ৯ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৭৯০ কোটি ১৫ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ৪৮৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হলো।
এই লেনদেনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সিটি ব্যাংকের শেয়ার। কোম্পানিটির ৮০ কোটি ৭২ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ঢাকা ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৪২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার। ৪১ কোটি ৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস।
এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে—ব্র্যাক ব্যাংক, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, রবি, সায়হাম কটন, যমুনা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ওরিয়ন ইনফিউশন।
অন্য শেয়ারবাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই বেড়েছে ৪৮৪ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৪৭ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২০টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৭টির এবং ১০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
শেয়ারবাজারের পরিস্থিতির বিষয়ে ডিএসই পরিচালক মো. শাকিল রিজভী জাগো নিউজকে বলেন, বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এসেছে। বাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা বাড়ছে। তারই প্রতিফল দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা ধারণা করছি আগামী কয়েকদিন বাজার ভালো থাকবে। তবে বাজারের এই ভালো পরিস্থিতি স্থায়ী করতে হলে দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানির শেয়ার আনতে হবে। সেই সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগবান্ধন পলিসি নিতে হবে। ভালো কোম্পানির আইপিও আনার পাশাপাশি বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক লুটপাট যেন আর না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই শেয়ারবাজার নিয়ে কমিটমেন্ট করেছে। এই কমিটমেন্ট যদি ধরে রাখে তাহলে অবশ্যই আমরা একটি ভালো শেয়ারবাজার পাবো। আমাদের একটাই প্রত্যাশা যে কমিটমেন্ট দিয়ে সরকার আসছে, ওনারা সেই কমিটমেন্ট রাখবেন।
তিনি বলেন, বাজার ভালো রিটার্ন দিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অটোমেটিক বেড়ে যাবে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় শেয়ারবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। এখন দ্রুত কিছু ভালো কোম্পানির আইপিও আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
এমএএস/এমকেআর