দেশে এলপিজির রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি, নেপথ্যে কী

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ১০:০১ পিএম, ০২ এপ্রিল ২০২৬
এলপিজির দাম বাড়ায় রেকর্ড দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করেছে বিইআরসি/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

 

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দামে এ যাবৎকালের সব রেকর্ড ভেঙেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সব ধরনের জ্বালানির বাজার অস্থির বিশ্বজুড়ে। মাসের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম বাড়ায় রেকর্ড দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

বিইআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ৩ এপ্রিল থেকে ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা হয়েছে। মার্চ মাসে এ গ্যাসের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। এক মাসের ব্যবধানে এক লাফে ১২ কেজির সিলিন্ডারে এলপিজির দাম বেড়েছে ৩৮৭ টাকা।

এর আগে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক লাফে ২৬৬ টাকা বেড়েছিল ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম। ওই বছরের জানুয়ারিতে দাম ছিল ১২৩২ টাকা। ফেব্রুয়ারিত দাম নির্ধারণ করা হয় ১৪৯৮ টাকা। ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে একবার বেড়েছিল ২২৬ টাকা । ওই বছরের সেপ্টেম্বরে দাম ছিল ১০৩৩ টাকা। অক্টোবর মাসে দাম নির্ধারণ করা হয় ১২৫৯ টাকা।

মূলত মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিইআরসিকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বিইআরসি বলছে, চলতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দামে রেকর্ড না হলেও ডলারের রেট তারতম্যের কারণে বর্তমানে আগের চেয়ে দাম বেড়েছে। এর আগে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে রেকর্ড দাম বেড়েছিল তখন দেশে ডলারের দাম এত বেশি ছিল না।

বর্তমানে সিলিন্ডারের দাম

বিইআরসি ঘোষিত নতুন দামে বিভিন্ন ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যও সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫.৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৭৭ টাকা বেড়ে ৭৯২ টাকা, ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বেড়ে এক হাজার ৭২৮ টাকা, সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪০৪ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৮০১ টাকা, ১৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৬৭৬ টাকা থেকে ২ হাজার ১৬১ টাকা, ১৬ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৮৮ টাকা থেকে ২ হাজার ৩০৫ টাকা, ১৮ কেজিরটি ২ হাজার ১১ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫৯৩ টাকা, ২০ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৬৪৬ টাকা বেড়ে দুই হাজার ৮৮১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

২২ কেজিরটি ২ হাজার ৪৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ১৬৯ টাকা, ২৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮০৭ টাকা বেড়ে তিন হাজার ৬০১ টাকা, ৩০ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৯৬৯ টাকা বেড়ে চার হাজার ৩২১ টাকা, ৩৩ কেজিরটি ৩ হাজার ৬৮৭ টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৭৫৩ টাকা, ৩৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ১৩০ টাকা বেড়ে পাঁচ হাজার ০৪১ টাকা, ৪৫ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৪০০ টাকা বেড়ে ছয় হাজার ৪২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম

বিইআরসির তথ্য বলছে, সৌদি আরামকোর সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইস) অনুযায়ী, পেট্রোলিয়াম গ্যাসজাত পণ্য প্রোপেন ও বিউটেনের সংমিশ্রণে এলপিজি তৈরি হয়। এতে প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত থাকে ৩৫:৬৫। বিইআরসির গঠিত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি এপ্রিল মাসের জন্য সৌদি আরামকো ঘোষিত সৌদি সিপি অনুসারে প্রতি টন প্রোপেন ৭৫০ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ৮০০ মার্কিন ডলার। প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ হিসেবে গড় এলপিজির সৌদি সিপি মূল্য প্রতি মেট্রিক টন ৭৮২ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার।

এলপিজির দামে রেকর্ড

সৌদি সিপি মূল্যের সঙ্গে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম, অন্য চার্জ এবং এপ্রিল মাসে বিবেচিত এলপিজি আমদানিতে এলসি সেটেলমেন্টে মার্কিন ডলারের গড় মূল্য ১২২ টাকা ৯৪ পয়সা বিবেচনা করে এপ্রিল ২০২৬-এর জন্য ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে আগের মার্চ মাসে সৌদি আরামকো ঘোষিত সৌদি সিপি অনুসারে প্রতি টন প্রোপেন ৫৪৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ৫৪০ মার্কিন ডলার। প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ হিসেবে গড় এলপিজির সৌদি সিপি ম‍ূল্য প্রতি মেট্রিক টন ৫৪১ দশমিক ৭৫ মার্কিন ডলার।

সৌদি সিপি মূল্যের সঙ্গে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডারের প্রিমিয়াম, অন্য চার্জ এবং মার্চ ২০২৬ মাসে বিবেচিত এলপিজি আমদানিতে এলসি সেটেলমেন্টে মার্কিন ডলারের গড় মূল্য ১২২ টাকা ৪৭ পয়সা বিবেচনা করে মার্চ ২০২৬-এর জন্য ভোক্তাপর্যায়ে বেসরকারি এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এতে মার্চ মাসে ১২ কেজি এলপিজির খুচরা দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্বে জ্বালানি নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশে যাতে এলপিজির সংকট না হয় সেদিকে বেশি নজর রাখছি। সারাদেশে এলপিজি মনিটরিং করার জন্য কমিটি করে দিয়েছি। তারা নিবিড়ভাবে কাজ করছে।-বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান

সৌদি আরামকো ও বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সৌদি সিপি অনুসারে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৫৪৫ মার্কিন ডলার ও বিউটেন ৫৪০ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির সৌদি সিপি মূল্য প্রতি মেট্রিক টন ৫৪১ দশমিক ৭৫ মার্কিন ডলার। জানুয়ারি মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৫২৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৫২০ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৫২১ দশমিক ৭৫ ডলার।

একইভাবে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৬১৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৬০৫ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৬০৮ দশমিক ৫০ ডলার। ওই মাসে দেশে ১২ কেজির এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ৪৫০ টাকা। ওই বছরের মার্চ মাসেও দর ছিল একই। আগে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৬৩৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৬২৫ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৬২৮ দশমিক ৫০ ডলার। জানুয়ারি মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৬২৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৬১৫ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৬১৮ দশমিক ৫০ ডলার।

আরও পড়ুন

এলপিজির দাম বাড়লো, ১২ কেজি সিলিন্ডার ১৭২৮ টাকা
সিলিন্ডার গ্যাসের দাম নিয়ে থামছে না নৈরাজ্য
১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারে কার ভাগে কত টাকা?

২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৬১৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৬২০ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৬১৮ দশমিক ২৫ ডলার। ওই মাসে দেশে ১২ কেজির এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ৪৪২ টাকা। মার্চ মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৬৩০ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৬৪০ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৬৩৬ দশমিক ৫০ ডলার। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেও একই দর ছিল। তবে জানুয়ারি মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৬২০ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিলো ৬৩০ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৬২৬ দশমিক ৫০ ডলার।

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৫৫৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৫৪৫ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৫৪৮ দশমিক ৫০ ডলার। ওই মাসে বাংলাদেশে ১২ কেজির এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ১৭৮ টাকা। মার্চ মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৭২০ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৭৪০ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৭৩৩ ডলার।

ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি টন প্রোপেন ও বিউটেন ছিল ৭৯০ মার্কিন ডলার করে। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৭৯০ ডলার। তবে জানুয়ারি মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৫৯০ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৬০৫ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৫৯৯ দশমিক ৭৫ ডলার।

আন্তর্জাতিক বাজারে এ যাবৎকালের এলপিজির রেকর্ড মূল্য ছিল ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে। ওই মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৯৪০ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৯৬০ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৯৫৩ ডলার। ওই মাসে বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজির দাম নির্ধারণ করেছিল ১ হাজার ৪৩৯ টাকা। তার আগে মার্চ মাসে প্রতি টন প্রোপেন ছিল ৮৯৫ মার্কিন ডলার এবং বিউটেন ছিল ৯২০ মার্কিন ডলার। এতে এলপিজির মূল্য ছিল প্রতি টন ৯১১ দশমিক ২৫ ডলার। ওই মাসে দেশে ১২ কেজির এলপিজির খুচরা মূল্য ছিল ১ হাজার ৩৯১ টাকা।

মূলত ওই সময়ে এলপিজি আমদানিতে এলসি সেটেলমেন্টে মার্কিন ডলারের গড় মূল্য ছিল ১০৬ টাকা ৩৯ পয়সা। ফলে বর্তমানে ডলারের ঊর্ধ্ব মূল্যের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যে রেকর্ড না হলেও দেশে আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে রেকর্ড দর নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে দাবি বিইআরসির।

যা বলছে বিইআরসি

বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে মার্চ মাসের চেয়ে এপ্রিল মাসে এলপিজির দাম বেড়েছে। বাংলাদেশে সৌদি সিপি অনুযায়ী এলপিজি আমদানি হয়। সৌদি সিপি অনুযায়ী মার্চ মাসের চেয়ে এপ্রিলে প্রতিটন এলপিজিতে গড়ে ২৪১ ডলার বেড়েছে। মার্চ মাসে এলপিজির গড় মূল্য ছিল ৫৪১ ডলার ৭৫ সেন্ট। এপ্রিলে সেটি হয়েছে ৭৮২ ডলার ৫০ সেন্ট। যে কারণে বাধ্য হয়েই এলপিজির দাম বাড়াতে হয়েছে। এটি হিসাব করলে রেকর্ড নয়। ডলারের দামের তারতম্যের কারণে দর বেশি হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্বে জ্বালানি নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশে যাতে এলপিজির সংকট না হয় সেদিকে বেশি নজর রাখছি। সারাদেশে এলপিজি মনিটরিং করার জন্য কমিটি করে দিয়েছি। তারা নিবিড়ভাবে কাজ করছে। আজও আমরা সাড়ে ৯ হাজার টন এলপিজি পেয়েছি। মার্চ মাসে আমদানি হওয়া এলপিজি এখনো সরবরাহ করা হচ্ছে। পাইপলাইনেও কয়েকটি জাহাজ রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

এমডিআইএইচ/এএসএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।