অর্থনৈতিক রূপান্তরে স্পষ্ট ও টেকসই প্রবৃদ্ধিভিত্তিক ভিশন দরকার
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও বৈশ্বিক সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিনটন পবকে। তিনি রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, আর্থিক খাত সংস্কার ও ই-ট্যাক্স অগ্রগতিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করে বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট ও টেকসই প্রবৃদ্ধিভিত্তিক ভিশন নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) যৌথ উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর: বাণিজ্য, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও কাঠামোগত সংস্কার’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানান ক্লিনটন পবকে।
১২ এপ্রিল (রোববার) ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইনের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে নীতিনির্ধারক, বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন কর্মী, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, ব্যবসায়িক সমিতি এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা একত্রিত হন।
বিশেষ অতিথি ক্লিনটন পবকে এই অনুষ্ঠানকে সানেমের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মতো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে জমে এসেছে। তবে তিনি বলেন, সংকট নীতিগত সুযোগ সীমিত করলেও এটি গভীর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। তিনি রাজস্ব আহরণের গুরুত্ব তুলে ধরে আর্থিক খাত সংস্কার ও ই-ট্যাক্স ব্যবস্থার অগ্রগতিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য একটি সুস্পষ্ট ইতিবাচক ভিশন নির্ধারণের আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান রচিত ছয়টি নীতি গবেষণাপত্রের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। এই গবেষণাপত্রগুলো অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের সঙ্গে সানেমের চলমান প্রজেক্টের অংশ, যেখানে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কাঠামোগত সংস্কার-সংক্রান্ত ১০টি নীতি গবেষণাপত্র প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ড. রায়হান উপস্থাপনা প্রদান করেন এবং পরবর্তী উন্মুক্ত আলোচনা পরিচালনা করেন।
গবেষণাপত্রগুলো বাণিজ্য ও শিল্পনীতির সমন্বয়, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক প্রভাব, এলডিসি উত্তরণ ও স্থগিতাদেশ বিতর্ক, মুক্ত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি, চামড়া খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত আলোচনা করে।
এলডিসি উত্তরণের প্রশ্নে গবেষণায় মসৃণ রূপান্তর কৌশলের (এসটিএস) বর্তমান অবস্থা সমালোচনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা হয় এবং স্থগিতাদেশের অনুরোধ বিবেচনা করা উচিত কিনা তা যাচাই করা হয়। আলোচনায় উল্লেখ করা হয় যে স্থগিতাদেশ বিতর্ক প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
ড. রায়হান জোর দিয়ে বলেন যে উত্তরণকে বোঝা হিসেবে নয়, বরং সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে এবং সম্ভাব্য তিন বছরের বর্ধিত সময়কে স্পষ্ট অগ্রাধিকার ও ধাপায়িত কর্মপন্থা অনুযায়ী কাজে লাগাতে হবে।
চামড়া শিল্প নিয়ে একটি পৃথক গবেষণায় বাংলাদেশের চামড়া খাতের বিরোধাভাস তুলে ধরা হয়। প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি ও প্রায় ২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সত্ত্বেও শিল্পটি নিম্নমূল্যের পণ্য রপ্তানিতে আবদ্ধ। গবেষণায় পরিবেশগত টেকসইতা ও সম্মতি, শক্তিশালী প্রশাসন এবং উন্নত বৈশ্বিক বাজার অবস্থান — এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি নীতি কাঠামো প্রস্তাব করা হয়।
আলোচকরা উল্লেখ করেন যে সাভার সিইটিপির দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা এবং এলডব্লিউজি সার্টিফিকেশনের অভাবে বাংলাদেশি চামড়া প্রিমিয়াম আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
বাণিজ্য ও শিল্পনীতির সমন্বয়বিষয়ক গবেষণায় দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতা চিহ্নিত করা হয়। আলোচকরা উল্লেখ করেন যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের গড় প্রযোজ্য শুল্কহার সর্বোচ্চগুলোর একটি এবং ক্রমবর্ধমান প্যারা-ট্যারিফ সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। বাংলাদেশের অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত রপ্তানি ঝুড়ি এবং ভিয়েতনামের বৈচিত্র্যময় রপ্তানি কাঠামোর মধ্যে তীক্ষ্ণ বৈপরীত্যও আলোচনায় উঠে আসে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিবিষয়ক গবেষণায় জিটিএপি মডেলিং ব্যবহার করে আটটি পরিস্থিতি সিমুলেশন করা হয়। বেসলাইন ফলাফলে এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশের নিট কল্যাণ ক্ষতি দেখা যায়, তবে আরসেপ এবং চীন-এফটিএ সর্বোচ্চ রপ্তানি সম্ভাবনা দেখায়। অভ্যন্তরীণ সংস্কার উল্লেখযোগ্য কল্যাণ লাভ দেয়, যা প্রমাণ করে যে বাণিজ্য চুক্তি একাই যথেষ্ট নয়।
ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জিডিপি ২.৯ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হওয়ার, রপ্তানি ৫.৮ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার এবং ভোক্তা মূল্য ৬.১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির পূর্বাভাস পাওয়া যায়।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন, বিশেষ করে বাণিজ্যের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং এশিয়ার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, চীন বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করলেও বাংলাদেশ সে সুযোগ কতটা কাজে লাগাচ্ছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০১০ থেকে ২০২১ পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে, যেখানে নিম্ন-প্রযুক্তির পণ্যের আধিক্য দেখা যায়; বিপরীতে ভিয়েতনামের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর কৌশলে বিদেশি বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি এবং এসটিএসের ১৫৭টি কর্মপরিকল্পনাকে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ অগ্রাধিকার নির্ধারণ প্রয়োজন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. আব্দুর রহিম খান বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি নীতির মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বিদ্যমান বাণিজ্য কাঠামোগুলোকে আরও সক্রিয় ও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত ধীরে ধীরে স্যাচুরেটেড হয়ে পড়ছে, অথচ প্লাস্টিকের মতো সম্ভাবনাময় খাত এখনো অনাবিষ্কৃত রয়েছে। বিশ্ব যখন ম্যান-মেড ফাইবারে এগিয়েছে, বাংলাদেশ তখনো তুলার ওপর নির্ভরশীল।
আব্দুর রহিম খান জোর দিয়ে বলেন, বাস্তবভিত্তিক ও লক্ষ্যনির্দিষ্ট নীতি গ্রহণ জরুরি এবং নতুন অপ্রাপ্য সমাধানের পেছনে না ছুটে বিদ্যমান সম্পদ ও নীতির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
আইএইচও/এমএমএআর