তেল সংকট ও রপ্তানি কমার অজুহাতে বেড়েছে পিকআপ-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া
জ্বালানি তেলের সংকট ও রপ্তানি কমে যাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে বেড়েছে কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপের ভাড়া। ছোট ও মাঝারি পিকআপে প্রতি টিপে ৫০০ থেকেএক হাজার টাকা ভাড়া বেড়েছে। এছাড়া কাভার্ড ভ্যানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য আনতে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। উল্টো চিত্র ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাওয়ার পথে, ভাড়া নেমে এসেছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকাতেও।
মালিক ও চালকরা বলছেন, ডিজেলের দাম না বাড়লেও পাম্পে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে তাদের সময় ও শ্রম নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি যুদ্ধের প্রভাবে রপ্তানি কমে জাওয়ায় চট্টগ্রামে সেভাবে ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান যাচ্ছে না। ফলে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য আনতে ভাড়া বেশি পড়ছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) রাতে তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড ও কারওয়ান বাজারে একাধিক কাভার্ড ভ্যান-পিকআপ চালক ও মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বৃদ্ধির কথা অধিকাংশ চালক অস্বীকার করেন, যদিও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কেউ কেউ আবার সরাসরিই ভাড়া বৃদ্ধির কথা স্বীকার করেন।
কারওয়ান বাজারে কথা হয় পিকআপচালক শামীমের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘ট্রিপ প্রতি ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা ভাড়া বেড়েছে। কারণ, তেল নিতে গেলে পাম্পে আমাদের রাত-দিন অপেক্ষা করতে হয়। যাদের ভাড়া মারি তাদের বললে তারা ভাড়া বাড়িয়ে দেন।’
আরেক পিকআপচালক সজীব বলেন, ‘তেলের সংকট, তেল পাই না। রংপুরে গিয়েছিলাম। পথে পথে বিভিন্ন জায়গার পাম্পে তেল নিয়ে ঢাকায় আসতে হয়েছে। তিনদিন লেগেছে এই ভাড়া মেরে ঢাকা আসতে। এর ফলে বাধ্য হয়ে আমাদের ভাড়া ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা বেশি নিতে হচ্ছে।’
মোশারফ নামের আরেক পিকআপ চালক জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকার বাইরে কোনো কোনো পাম্পে ৫ লিটার তেল দেয়। কিছু পাম্পে ২০ থেকে ৩০ লিটার তেল দেয়। ডিজেলের জন্যে দীর্ঘ লাইনে থাকতে হয়। রাতে সিরিয়াল দিয়ে সকালেও তেল পাওয়া যায় না। তেলের সংকটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা। সন্ধ্যার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হয়। সন্ধ্যার পরে ট্রিপ থাকতো, এখন ট্রিপ একটু কম।’
আরও পড়ুন
৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে ট্রাকভাড়া, বাড়ছে মাছের দাম
জ্বালানি সংকটে বান্দরবানে হোটেল-রিসোর্টে কমেছে আগাম বুকিং
সোমবার রাতে মাদারীপুরের শিবচরের চালক রুবেল ১০ টনের পিকআপে পণ্য নিয়ে জয়পুরহাট থেকে কারওয়ান বাজারে আসেন। ভাড়া ১৫ হাজার ৫০০ টাকা, আলু নিয়ে এসেছেন। জাগো নিউজকে রুবেল বলেন, ‘ভাড়া বাড়েনি। আগের মতোই আছে। গ্রাম থেকে তেল লোড দেই। আর ঢাকায় ধোলাইপাড় থেকে লোড দেই। ফলে সিরিয়ল লাগে না।’
রফিকুল নামের আরেক চালক বলেন, ‘আমরা যারা নির্দিষ্ট মালিকের ভাড়া মারি তারা তো আর বেশি ভাড়া নিতে পারি না। আমরা আগের মতোই ভাড়া নিচ্ছি।’
তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে কথা হলে ভাড়া বৃদ্ধির তথ্য স্বীকার করে কাভার্ডভ্যানের মালিক আফসার উদ্দিন বাবুল বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে আসার ভাড়া আজ ৩০ হাজার টাকা, ২৯ হাজার টাকা চলছে। আর ঢাকা থেকে ওদিকে গেছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এই পথের ভাড়া মারতে গেলে আমাদের মালিকদের ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা থাকতে হবে। তিন থেকে চারদিন লাগে গাড়িটা ঘুরে আসতে। একদিনে যদি ৩ হাজার টাকাও হয় তাহলে তিন দিনে ৯ হাজার টাকা, ১০ হাজার টাকা। আমাদের গাড়িটা না চললে আমাদের গাড়ির কাগজপত্র, গাড়ির খরচ, চাকা, বিভিন্ন ড্রাইভার খরচ মিলে আমাদের পোষায় না।’

ঢাকা থেকে পণ্য যাচ্ছে না ও তেল সংকট- এ দুই কারণে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বেড়েছে উল্লেখ করে আফসার উদ্দিন বাবুল বলেন, ‘যখনই ঢাকা মাল থাকে, এই মালটা হলো গিয়ে রপ্তানি। রপ্তানি যখনই থাকে তখন আমদানির ওপরে চাপ কমে। রপ্তানি না হলে আমদানি বাড়ে। যুদ্ধের কারণে ঈদের আগে থেকে অর্থাৎ মার্চ মাসেই আমাদের ব্যবসার ওপরে প্রভাব শুরু হয়। বিদেশি আমাদের যত অর্ডার আছে, যেগুলো গার্মেন্টস শিল্পের সঙ্গে জড়িত, এগুলো এখন তেমন বাইরে যাচ্ছে না। বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধবিধ্বস্ত এরিয়া, এই কারণে মাল যাচ্ছে না। এতে আমাদের রপ্তানিটা কমে গেছে। রপ্তানি কমে গেলেও চিটাগাং থেকে ঢাকাতে গাড়ি আসলে ২৫ হাজার টাকা খরচ আছে। ফলে আমদানির পণ্য আনার ওপরে খরচ বাড়ছে।’
তিনটি কাভার্ড ভ্যানের মালিক সুজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে এই ধরনের (২৩ ফিট) গাড়ির ভাড়া ১৩ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে থাকতো। কিন্তু বর্তমানে বাজারের অবস্থা এত খারাপ যে ভাড়া নেমে এসেছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায়। তবুও বাজারে পর্যাপ্ত মাল নেই, এক্সপোর্টও নেই বললেই চলে। ফলে অনেক গাড়ি অলস পড়ে আছে, ভাড়া পাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ভাড়া তুলনামূলক বেশি। আগে যেখানে এই পথে ভাড়া ছিল ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ভারী মাল, যেমন ১৩ থেকে ১৪ টন পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ভাড়া আরও বেশি ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা পর্যন্তও হচ্ছে।’
কাভার্ড ভ্যানের এই মালিক জাগো নিউজকে আরও বলেন, ‘মূলত মালামালের ওজন বেশি হলে ভাড়া বাড়ে- এটাই এই খাতের প্রচলিত নিয়ম। আগে ১৩ টন মাল পরিবহনে যেখানে ১০ হাজার টাকা ভাড়া ছিল, সেখানে তা বেড়ে ১৫ হাজার টাকায় যেত। এখন সেই একই রুটে বিশেষত চট্টগ্রাম থেকে আসার পথে ভাড়া বেড়েছে।’
ইএইচটি/কেএসআর