রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, সামষ্টিক অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ০৭:২৫ এএম, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি বেড়েই চলেছে, ছবি: জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এগোচ্ছে না। উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগে স্থবিরতা, আমদানি কমে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির চাপ—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রাজস্ব আদায়ে, ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, বিপরীতে আদায় হয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা—অর্থাৎ লক্ষ্য থেকে প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে সংস্থাটি।

অর্থবছরের বাকি চার মাসে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা আদায়ের বড় চাপ রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রতি মাসে গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব সংগ্রহ প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মাসেই আদায় ৪০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেনি। ফলে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজস্ব বাড়াতে হলে প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। -ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি

সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি থাকলেও (প্রায় ১২ শতাংশ) তা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় যথেষ্ট নয়। আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক—তিনটি প্রধান খাতের কোনোটিই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা গেছে আয়কর খাতে।

এদিকে করদাতাদের একটি বড় অংশ এখনও রিটার্ন দাখিল করছেন না। প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএনধারীর মধ্যে মাত্র ৪৬ লাখ রিটার্ন জমা দিয়েছেন, যা মোটের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই কমপ্লায়েন্স ঘাটতি রাজস্ব আদায়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুন
আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা
করের আওতা বিস্তৃত করে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী
রাজস্ব আদায়ে ভ্যাট বাড়ানোই সহজ পথ?
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়াচ্ছে সরকার

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট টিআইএনধারীর প্রায় ৬৪ শতাংশই রিটার্ন দাখিল করেননি, যদিও সময়সীমা চার দফা বাড়ানো হয়েছিল। দাখিলকৃত ৪৬ লাখ রিটার্নের মধ্যে প্রায় ৪২ লাখ ৯৭ হাজার অনলাইনে এবং ৩ লাখ ৪ হাজার কাগজে জমা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ হাজার কোম্পানির রিটার্ন রয়েছে। আগের অর্থবছরে রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা ছিল ৪২ লাখ ৫০ হাজার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করভিত্তি সম্প্রসারণ ও করজাল বিস্তারের মাধ্যমে রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, রাজস্ব বাড়াতে হলে প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও আধুনিক কর কাঠামো গড়ে তোলা গেলে রাজস্ব আদায়ে স্থিতিশীলতা আসবে।

করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং কর ফাঁকি রোধ, করছাড়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক—এই তিন খাতে পৃথক টাস্কফোর্স কাজ করছে।- ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, করের হার বাড়িয়ে নয়, বরং কর ফাঁকি রোধ, করছাড়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক—এই তিন খাতে পৃথক টাস্কফোর্স কাজ করছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া মানে সরকারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা, যেখানে রাজস্ব আয় ছিল ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা—অর্থাৎ ব্যয় আয়কে ছাড়িয়ে গেছে।

রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, সামষ্টিক অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

চলতি অর্থবছরেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে পরিচালন খাতে অর্থ স্থানান্তর করতে হয়েছে। শুধু বেতন-ভাতা বাবদই অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম বলেন, রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে সরকারকে ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি বলেন, রাজস্ব ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি ঋণ বাড়লে সুদ পরিশোধের চাপও বৃদ্ধি পায়।

আরও পড়ুন
অনলাইন রিটার্ন বাধ্যতামূলক করায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে
রাজস্ব আদায়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা চায় এনবিআর
সাত মাসে রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকা
যথার্থ মূল্যায়ন ছাড়া ভ্যাট বাড়ালে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হবে না

ইতোমধ্যে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বেড়ে ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ঘাটতি সামাল দিতে উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হওয়ায় অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ঋণ, উচ্চ সুদহার এবং কঠোর মুদ্রানীতির কারণে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে, যা আবার রাজস্ব আদায় কমিয়ে দিচ্ছে—ফলে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হয়েছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বর্তমান কর কাঠামো অনেকাংশেই পরোক্ষ করনির্ভর। আয়কর ভিত্তি বাড়ানো না গেলে টেকসই রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। তিনি কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এসএম/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।