শ্রম আইন সংশোধনে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
শ্রমিকদের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে জীবিকাযোগ্য মজুরি, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান কারিগরি প্রশিক্ষণ দরকার। প্রযুক্তিখাতে নারীদের পিছিয়ে পড়ার কারণ দূর করতে হবে।
মহান মে দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের শ্রম অধিকার পরিস্থিতি ও নতুন শ্রম আইন সংশোধন নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি ইব্রাহীম হুসাইন অভি।
সম্প্রতি বাংলাদেশে শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। আপনার মতে বর্তমানে দেশের শ্রম অধিকার পরিস্থিতি কোন অবস্থায় আছে?
আমরা আশা করেছিলাম শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আগের অবস্থায়ই রয়ে গেছে। যেমন ভবিষ্য তহবিল (প্রভিডেন্ট ফান্ড) নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটা আগের আইনের অবস্থায় ফিরে গেছে।
শ্রমিক ইউনিয়ন করার ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। এছাড়া মাতৃত্বকালীন সুবিধার ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতা থেকে গেছে। ফলে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে—এমনটা আমরা বলতে পারছি না।
আপনারা যে সুপারিশগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলোর মধ্যে কোন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়নি?
আমরা মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু এখনো ১২০ দিনের কাঠামোই বহাল রয়েছে। আবার ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থনের শর্ত শিথিল করার দাবি ছিল, সেটাও বাস্তবায়ন হয়নি পূর্ণাঙ্গরূপে।
আরও পড়ুন
‘দিবস কী জানি না, মাথায় টুকরি উঠলে আসে টাকা, চলে পেট’
শ্রমিক সুরক্ষায় আইন আছে, কিন্তু কতটা কার্যকর?
মে দিবসে অন্যান্য দেশে যত মজার রীতি
‘বিরতিহীন’ কাজে দিশেহারা পরিবহন শ্রমিকরা, বাড়ছে দুর্ঘটনা
এছাড়া আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১৯০ বাস্তবায়নসহ নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সহিংসতা প্রতিরোধের বিষয়েও আমরা সুপারিশ দিয়েছিলাম, কিন্তু সেগুলোর অগ্রগতি খুব সীমিত।
শ্রমিকদের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে এখন কোন বিষয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
প্রথমেই শ্রমিকদের জন্য বাঁচার মতো মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে এখনো সব খাতের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নেই। এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নারী ও পুরুষ উভয় শ্রমিকের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেখা যায়, প্রযুক্তিগত অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকদের সুযোগ বেশি, নারীরা পিছিয়ে থাকেন। এই বৈষম্য দূর করতে হবে।
মাতৃত্বকালীন সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আপনাদের কী দাবি?
মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করতে হবে এবং চার মাস ও ছয় মাসের বৈষম্য দূর করতে হবে। পাশাপাশি প্রভিডেন্ট ফান্ড ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করতে হবে। শ্রম আইনের মধ্যে এসব বিষয় সহজ ও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো কী?
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ভয়। অনেক সময় ইউনিয়ন করার চেষ্টা করলে শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়। মামলা, হামলা ও প্রশাসনিক জটিলতাও থাকে। ফলে শ্রমিকরা ভয় পেয়ে যায়। ইউনিয়ন করার অধিকার সহজ ও নিরাপদ করতে হলে এই ভয় ও প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে।
শ্রমিক, মালিক ও শিল্প—তিন পক্ষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকারের এখন কোন বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত?
শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সামাজিক সংলাপ বা সোশ্যাল ডায়ালগ শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার—বিশেষ করে সংগঠন করার অধিকার ও দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যদি এই ভিত্তি মজবুত হয়, তাহলে শিল্পের টেকসই উন্নয়ন হবে, শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত হবে ও বিভিন্ন বিরোধ বা অসন্তোষও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হবে।
আইএইচও/এএসএ/এমএফএ