ডিজেল জেনারেটরের বিকল্প সম্ভাবনাময় ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪১ পিএম, ০৪ মে ২০২৬
ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম/ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি মোকাবিলায় দীর্ঘদিন ধরে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। শিল্প-কারখানা, হাসপাতাল ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম, পরিবেশ দূষণ এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে এখন বিকল্প সমাধানের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বেস) নতুন সম্ভাবনা হিসেবে আলোচনায় আসছে।

বেস কী?

বেস হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর তা ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়। সহজভাবে বললে, এটি বড় আকারের একটি বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা, যা উৎপাদন ও ব্যবহার এই দুইয়ের মধ্যে সময়ের ব্যবধান পূরণ করে। বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রযুক্তির গুরুত্বও বাড়ছে। সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মতো অনিয়মিত উৎস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেস কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

ডিজেল বনাম বেস

ডিজেল জেনারেটর চালাতে নিয়মিত জ্বালানি প্রয়োজন, যা আমদানিনির্ভর এবং দামের ওঠানামা রয়েছে। অন্যদিকে বেসে একবার বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করলে তা পুনরায় ব্যবহার করা যায়, ফলে দীর্ঘমেয়াদে খরচ কমে। পরিবেশগত দিক থেকেও দুই প্রযুক্তির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ডিজেল জেনারেটর থেকে কার্বন নিঃসরণ, ধোঁয়া ও শব্দদূষণ হয়। বিপরীতে বেস ব্যবহারে সরাসরি কোনো নির্গমন নেই। বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বেস তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ দিতে সক্ষম। ডিজেল জেনারেটর চালু হতে কিছুটা সময় লাগে, যা জরুরি সেবায় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

ডিজেল জেনারেটরে যান্ত্রিক অংশ বেশি থাকায় নিয়মিত সার্ভিসিং প্রয়োজন। বেসে চলমান অংশ কম, ফলে রক্ষণাবেক্ষণ সহজ ও কম ব্যয়বহুল।

বেস-এর অর্থনৈতিক প্রভাব

বেস ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খরচ কমানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে সমন্বয় করেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব, যা টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবহার বাড়ছে বিভিন্ন খাতে

বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি, সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রে এবং শিল্প-কারখানায় বেসের ব্যবহার বাড়ছে। এছাড়া বাণিজ্যিক স্থাপনা ও ডাটা সেন্টারে ব্যাকআপ হিসেবে এটি ব্যবহারের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বাড়িতে সোলার প্যানেলের সঙ্গে যুক্ত করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে পরবর্তীতে ব্যবহারের প্রবণতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।

বাণিজ্যিকভাবে সোলার থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বেস-এর গুরুত্ব

সরকার সোলার থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এবং কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সোলার অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন সোলারে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে তখন সেটি সংরক্ষণ করা না গেলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আবার রাতের বেলায় যখন কম উৎপাদন হবে তখন গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলে সোলার খাত অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে সমাধান হচ্ছে বেস।

সোলার খাতে বিনিয়োগকারীরা যদি বেস প্রযুক্তি কম খরচে আনতে পারেন তাহলে এ খাতে তারা সফলতা পাবেন এবং ভবিষ্যতে আরও বড় বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন।

বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

দেশে বেস প্রযুক্তির প্রসারে প্রধান বাধা উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ ও আমদানি শুল্ক। বর্তমানে এই প্রযুক্তি আমদানিতে প্রায় ৬২ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপিত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে বা ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে না। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় এটি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনলে বাংলাদেশ উপকৃত হবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বিশ্বজুড়ে ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং ব্যয় কমে আসায় বেস ক্রমেই সহজলভ্য হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগ বাড়লে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে। ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিকল্প প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম কার্যকর সমাধান হতে পারে।

এনএস/বিএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।