চামড়া খাতে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা
সাভারের বেশিরভাগ ট্যানারি এখনো লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, সনদ পেতে যে নম্বর প্রয়োজন ২০টি ট্যানারির মধ্যে সেখানে ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে মাত্র ৩টি ট্যানারি। এছাড়া ছয়টি ট্যানারি ৪০ শতাংশের ওপরে নম্বর পেলেও বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো সন্তোষজনক অবস্থানে নেই।
একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না থাকায় উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘এলডব্লিউজি সনদ অর্জনে ট্যানারি প্রস্তুতিকরণে গ্যাপ অ্যাসেসমেন্ট ও ফলো-আপ কর্মসূচির ফাইন্ডিংস শেয়ারিং ওয়ার্কশপে’ এ তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) ও বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (বিপিসি) যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. নুরুজ্জামান। সভাপতিত্ব করেন বিটিএ সভাপতি শাহীন আহমেদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. নুরুজ্জামান বলেন, বর্তমান কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ নতুন স্থাপনা করতে অন্তত দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। তাই বিদ্যমান সিইটিপিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পাশাপাশি নতুন আরেকটি সিইটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে পিছিয়ে থাকা ট্যানারিগুলোকে ইটিপি স্থাপনে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার বিষয়েও সরকার ইতিবাচকভাবে কাজ করছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিলের (বিপিসি) পরিচালক রাজ্জাকুল ইসলাম বলেন, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সদন না থাকার কারণে আমাদের চামড়া তিন ভাগের এক ভাগ দাম পাচ্ছে আন্তর্জাতিক মার্কেটে।

বিটিএ সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে উদ্যোক্তারা প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সিইটিপি ছাড়া শিল্পনগরী চালু করায় উদ্যোক্তারা কাঙ্ক্ষিত আন্তর্জাতিক বাজার সুবিধা পাচ্ছেন না। আমরা এর দ্রুত সমাধান চাই।
তিনি বলেন, সময়মতো লবণ ব্যবহার ও সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত না হওয়ায় কোরবানির চামড়ার মান নষ্ট হয় এবং দাম কমে যায়। পাশাপাশি পানি ব্যবহারে মিটারিং ব্যবস্থা, সোলার এনার্জি ব্যবহার এবং সলিড ওয়েস্টকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নিলে শিল্পটি আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে।
আলোচনায় আশা প্রকাশ করা হয়, চলমান গ্যাপ অ্যাসেসমেন্ট, প্রশিক্ষণ, তদারকি ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সাভারের ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক মান পূরণে সক্ষম হবে এবং ভবিষ্যতে এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের পথ সুগম হবে। এতে বাড়বে রপ্তানি আয়।
সাসটেইনেবল লেদার এক্সপার্ট আফজাল হোসাইন প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলেন, এলডব্লিউজি সনদ অর্জনে ট্যানারিগুলোকে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস, প্রি-ট্রিটমেন্ট ব্যবস্থা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নতি আনতে হবে।
তিনি জানান, এলডব্লিউজি সনদের মোট ১ হাজার ৭১০ নম্বরের মধ্যে সিইটিপি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট অংশে রয়েছে ৩০০ নম্বর, যেখানে সাভারের ট্যানারিগুলো সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে। ট্যানারিগুলোতে পানি ব্যবহারের জবাবদিহিমূলক হিসাব রাখতে হবে এবং পরিশোধিত পানির চূড়ান্ত গন্তব্য নিশ্চিত করতে হবে।
এলডব্লিউজি গাইডলাইন অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক ব্যবহার, প্রসেস কন্ট্রোলের জন্য দক্ষ টেকনিক্যাল টিম গঠন এবং অন্তত ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চামড়া সংরক্ষণে ব্যবহৃত লবণ পুনরুদ্ধারে মেকানিক্যাল ডিসল্টিং ও সোক লিকার পৃথকীকরণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়।
কর্মশালায় জানানো হয়, বর্তমানে দেশের মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। সাভার শিল্পনগরীতে বরাদ্দ পাওয়া ১৬২টি ট্যানারির মধ্যে প্রায় ১৪০টি চালু থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান সনদ না থাকায় সরাসরি ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করতে পারছে না। ফলে তুলনামূলক কম দামে চীনের কাছে চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে, আর চীন সেই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে ইতালি, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে উচ্চমূল্যে রপ্তানি করছে।
ঢাকার হাজারীবাগের স্বাস্থ্যঝুঁকি, বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধ ও চামড়া শিল্পের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০০৩ সালে ‘বিসিক চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সরকার। সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে প্রায় ২০০ একর জমিতে এই ট্যানারি গড়ে তোলা হয়। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করে সাভারে নেওয়া হয়। আর ২০২১ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ১৬২টি ট্যানারিকে সেখানে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বর্তমানে দেশে সচল ট্যানারির সংখ্যা প্রায় ১৬০টি। এর মধ্যে সাভারে আছে ১৪৭-১৪৮টি। এই ট্যানারিগুলোর মধ্যে মাত্র আটটির এলডব্লিউজি সনদ রয়েছে। এগুলো হলো সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর পাইওনিয়ার সিমোনা ট্যানিং বিডি লিমিটেড (বে ট্যানারি), খুলনার সুপার এক্স, চট্টগ্রামের রিফ ট্যানারি, যশোরের এস এফ, গাজীপুরের শফিপুরের এপেক্স ট্যানারি, এবিসি ট্যানারি, অস্টান ও কুমিল্লার সংসিন লেদার (বিডি) লিমিটেড।
ইএইচটি/এমকেআর