নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে এডিপিতে থোক বরাদ্দে রেকর্ড

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৫৯ এএম, ১৩ মে ২০২৬
৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হয়েছে/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ইতিহাসের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার অধিকাংশই বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এবার একলাখ কোটি টাকার বেশি থোক বরাদ্দ রাখতে যাচ্ছে সরকার, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত তিন লাখ কোটি টাকার এডিপির মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ বা মোট বরাদ্দের ৩৯ শতাংশ রাখা হচ্ছে ‘থোক’ ও ‘বিশেষ বরাদ্দ’ হিসেবে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সুবিধার্থে ১ লাখ ৭ হাজার ২০১ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে আরও ৯ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৬১ শতাংশ।

থোক বরাদ্দের অর্থ যাবে কৃষক কার্ডে

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলা নববর্ষ-১৪৩৩ উপলক্ষে দেশের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ জন প্রান্তিক কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ তুলে দেওয়ার মাধ্যমে সারাদেশে প্রি-পাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের ১১টি উপজেলার ২২ হাজার ৬৭ জন কৃষকের প্রত্যেকের কাছে মোবাইলের মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আড়াই হাজার টাকা নগদ অর্থ চলে যায়।

সরকারের কিছু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সেগুলোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কিছু প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। আমরা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জোর দিচ্ছি। আমরা লোক দেখানো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাই না। তবে যে সব মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেই চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবো।-পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি

কার্ড পাওয়া কৃষকরা ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। সেগুলো হলো- ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রাপ্তি, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজার তথ্য, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ, কৃষি বিমা সুবিধা ও ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুবিধা।

কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সংশ্লিষ্ট ডিলারের কাছে সরবরাহ করা পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন ব্যবহার করে সার, বীজ, মৎস্য বা প্রাণী খাদ্যসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন। এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে কৃষক কার্ডে ১ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন উপকারভোগীকে এ ভাতা দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তীসময়ে পর্যায়ক্রমে দেশের চার কোটি পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আরও ৮০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে যাচ্ছে সরকার। এসব চাহিদা মেটাতেই মূলত এডিবিতে থোক বরাদ্দের রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে সরকার।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের কিছু নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সেগুলোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কিছু প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জোর দিচ্ছি। আমরা লোক দেখানো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাই না। তবে যে সব মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে সেই চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবো।’

কৃষি কার্ডসহ নানান খাতের ব্যয় মেটাতে থোক বরাদ্দ বাড়তি কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি কোনো মন্তব্য করেনি।

৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত

এসব কাজে গুরুত্ব দিয়ে আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

গত শনিবার (৯ মে) কমিশনের বর্ধিত সভায় এডিপির খসড়া অনুমোদন দেওয়া হলেও খাতভিত্তিক বরাদ্দ আগামী ১৬ মে চূড়ান্ত করা হবে। পরে এটি ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি সঠিকভাবে প্রণয়ন করা জরুরি। সাশ্রয়ী বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি করতে হবে। এডিপিতে অহেতুক ব্যয় কমাতে হবে। বিদেশ ভ্রমণের নামে প্রকল্পের টাকা খরচ করা যাবে না। যদি অপচয় রোধ করা যায় তাহলে অল্প অর্থে বেশি উপকার পেতে পারি।-অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী

এবারের এডিপিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও বিদ্যুৎখাত অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বড় অংশজুড়ে রয়েছে ‘থোক বরাদ্দ’। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিশেষ উন্নয়ন সহায়তা ও সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট উন্নয়ন বাজেটের এক-তৃতীয়াংশের বেশি।

বিপরীতে সরাসরি প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। ফলে নানা ধরনের ভাতা, কৃষক কার্ডসহ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়াতেই রেকর্ড পরিমাণে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) মুসরাত মেহজাবীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এডিপির কাজ শুরু করেছি। তবে এটা চূড়ান্ত হয়নি। সব কিছুই প্রস্তাবিত। আমাদের এটা চূড়ান্ত করতে দিন, তারপর সব কিছু বলা যাবে।’

কোন খাতে কত বরাদ্দ

সূত্র জানায়, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ খাতে কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। তবে গত অর্থবছর কৃষিঋণ মওকুফে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা খাতে আগামী অর্থবছর তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, চলতি অর্থবছর এ খাতে ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আর্থিক সহায়তা বাড়াতে আগামী অর্থবছর ৬৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, চলতি অর্থবছর এ খাতে ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

আরও পড়ুন

৮ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ৩০%, টাকার অঙ্কে পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন
মুখ থুবড়ে পড়েছে এডিপি বাস্তবায়ন, একযুগে সর্বনিম্ন
দেশে বিনিয়োগ ইতিহাসে সর্বনিম্ন, এডিপি বাস্তবায়ন ১০ বছরে সবচেয়ে কম

সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে পরিবহন ও যোগাযোগ খাত—৫০ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য খাতে ৩৫ হাজার ৫৩৫ কোটি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে থোক বরাদ্দের পরিমাণ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ৮ কোটি টাকা, অথচ একই খাতে থোক বরাদ্দ ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ ৫ হাজার ৪৮ কোটি টাকা হলেও থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা।

মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি পাচ্ছে স্থানীয় সরকার বিভাগ—৩৩ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার বরাদ্দ ৩০ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।

রেকর্ড থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন

বড় আকারের এডিপি ও বিপুল থোক বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। এ অবস্থায় আরও বড় উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়।

প্রস্তাবিত এডিপিতে মোট ১ হাজার ১২১টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৪৯টি এবং কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ১০৭টি। পাশাপাশি ১ হাজার ২৭৭টি নতুন অননুমোদিত প্রকল্পও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

এডিপির আকার না বাড়িয়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের পরিস্থিতি ভালো নয়। আমাদের বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। বাজেটের বড় অংশই বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে চলে যাচ্ছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত এটা বাড়বে।’

তিনি বলেন, ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি সঠিকভাবে প্রণয়ন করা জরুরি। সাশ্রয়ী বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি করতে হবে। এডিপিতে অহেতুক ব্যয় কমাতে হবে। বিদেশ ভ্রমণের নামে প্রকল্পের টাকা খরচ করা যাবে না। যদি অপচয় রোধ করা যায় তাহলে অল্প অর্থে বেশি উপকার পেতে পারি।’

এমওএস/এএসএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।