ভ্যাটের হিসাবপত্র ছাড়া ব্যবসা, ‘মি. বেকার’র ব্যাংক হিসাব তলব

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৫৩ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০২০

মূল্য সংযোজন করের (ভ্যাট) হিসাবপত্র ছাড়া ৩৪টি বিক্রয়কেন্দ্রে ব্যবসা পরিচালনা করে ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘মি. বেকার’র বিরুদ্ধে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব তলব করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা।

নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের (ভ্যাট) মহাপরিচালক ড. মইনুল খান বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, মি. বেকারের টঙ্গী ও গাজীপুরের হেড অফিসে (কারখানা) অভিযান পরিচালনা করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা। এতে গোয়েন্দা দল ব্যাপক ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ পায়। অধিকতর তদন্তের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেনের হিসাব তলব করা হয়েছে।

রাজধানীতে প্রতিষ্ঠানটির পেস্ট্রি শপের ২৯টি ও সুইটমিটের ৫টি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এই হেড অফিসের ঠিকানায় তাদের কারখানাও অবস্থিত।

বৃহস্পতিবার ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতর থেকে এ সংক্রান্ত বিষয়ে টঙ্গীর ঢাকা ব্যাংক, কামারপারা শাখা ও সাউথইস্ট ব্যাংকে নোটিশ ইস্যু করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভ্যাট গোয়েন্দার দুটি পৃথক দল ঢাকার তুরাগ ধোউড়ের আলী সরকার রোডের ‘মি. বেকার কেক অ্যান্ড পেস্ট্রি শপ’ এবং গাজীপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত ‘মি. বেকার সুইটস’- এই দুটি প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস ও কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে।

পেস্ট্রি শপের ভ্যাট নিবন্ধন নং- ০০০৯৬৪৬৮২ -০১০২। অন্যটির ভ্যাট নিবন্ধন নং- ০০১১৪৬১৭৭-০১০৩। প্রতিষ্ঠান দুটি ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটে কেন্দ্রীয়ভাবে নিবন্ধিত।

অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপ-পরিচালক নাজমুন নাহার কায়সার, ফেরদৌসি মাহবুব ও তানভীর আহমেদ।

এর আগে, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব আসিফ জামান গত ১৮ অক্টোবর তার নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর রোডে অবস্থিত ‘মি বেকার’-এর বিক্রয়কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ভ্যাট চালান না দেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করেন।

তিনি ওই স্ট্যাটাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের কাছে প্রতিকার চেয়ে উল্লেখ করেন, ভোক্তারা ভ্যাট দিলেও তা সরকার পাচ্ছে না। ওই কেন্দ্রটিতে ভ্যাট কর্তন করে একটি কাঁচা চালান দিয়ে ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়।

এই অভিযোগ ও আরও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এনবিআরে চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম তদন্ত করার জন্য ভ্যাট গোয়েন্দাকে নির্দেশ দেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ভ্যাট গোয়েন্দা দলের আকস্মিক পরিদর্শনকালে প্রতিষ্ঠান দুটিতে ভ্যাট আইনের বাধ্যবাধকতা অনুসারে ক্রয় হিসাব পুস্তক (মূসক-৬.১) ও বিক্রয় হিসাব পুস্তক (মূসক-৬.২) পাওয়া যায়নি। ভ্যাট আইন অনুযায়ী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই দুটি হিসাব সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে- বলে জানান মইনুল খান।

তিনি জানান, পরিদর্শনকালে ভ্যাট সংক্রান্ত অন্যান্য দলিলাদি দেখাতে বলা হলে, উপস্থিত মালিকপক্ষ তা দেখাতে পারেননি এবং এগুলো সংরক্ষণ না করার বিষয়ে তারা কোন সদুত্তরও দিতে পারেননি। ভ্যাট গোয়েন্দাদের অভিযানের আশঙ্কায় প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে মালিকপক্ষ নিজস্ব বাণিজ্যিক দলিলাদিও রাখেন না।

এতে ভ্যাট গোয়েন্দা দলের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, নিজস্ব মনগড়া হিসাবের ভিত্তিতে ‘মি. বেকার’ স্থানীয় ভ্যাট সার্কেলে রিটার্ন দাখিল করে আসছে। একইসঙ্গে, তারা ভোক্তাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ভ্যাট সরকারি কোষাগারে যথাযথভাবে জমা দেয়নি।

তিনি আরও জানান, অভিযানের এক পর্যায়ে গোয়েন্দা দল প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে অবস্থিত অন্য একটি ভবনের বিভিন্ন তলায় ও ছাদে অবস্থিত কর্মচারীদের থাকার কক্ষ তল্লাশি করে তাদের পুরনো কিছু অসংগঠিত তথ্যাদি পাওয়া যায়। গোয়েন্দা দল সেখান থেকে এসব কাগজপত্র জব্দ করে।

গোয়েন্দা দলের জিজ্ঞাসাবাদে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এমনকি অভিযানের আগের দিন যেসব পণ্য ফ্যাক্টরি থেকে বের করেছে তার মূসক-৬.৫ চালান দেখতে চাইলেও তারা দেখাতে পারেননি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান দুটি কেন্দ্রীয় নিবন্ধিত হওয়ায় মূসক-৬.৫ এর মাধ্যমে পণ্য ফ্যাক্টরি থেকে আউটলেটে নেয়ার বিধান থাকলেও তা পরিপালন করা হয় না।

পাশাপাশি, ভ্যাট গোয়েন্দা অধিদফতরের আরেকটি দল উত্তরার ৩ নং সেক্টরের ৪ নং রোডে অবস্থিত মি. বেকার কেক অ্যান্ড পেস্ট্রি শপের বিক্রয়কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে। কর্মকর্তারা প্রথমে পরিচয় গোপন করে পণ্য ক্রয় করে দেখতে পান যে, এই বিক্রয়কেন্দ্রটি মূসক চালান (মূসক-৬.৩) ব্যতীত পণ্য বিক্রি করছে। এখানে তারা অভিযোগকারী অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিবের অভিযোগের সত্যতা পান।

একইসঙ্গে, গোয়েন্দা দল ২১ অক্টোবর বেইলি রোডে অবস্থিত ‘মি. বেকার’-এর দুটি বিক্রয়কেন্দ্র থেকে পণ্য ক্রয় করেও দেখতে পান যে, তারা মূসক চালান ব্যতীত পণ্য সরবরাহ করছে।

এতে প্রমাণিত হয় ভ্যাট আইন অনুসারে রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ না করে এবং ভ্যাট আইন লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানটি ৩৪টি বিক্রয়কেন্দ্রে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে।

প্রতিষ্ঠানের কারখানা ও বিক্রয়কেন্দ্রে ভ্যাট চালান ব্যতীত পণ্য সরবরাহ ও বিক্রয় করায় ‘মি. বেকার’-কে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। একইসঙ্গে, প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব সাময়িকভাবে অপরিচালনযোগ্য করা হয়েছে- বলে জানান মইনুল খান।

তিনি আরও জানান, অভিযানে জব্দ করা ও ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত দলিলাদির ভিত্তিতে ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ নির্ণয় ও অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। একইসঙ্গে, ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিযুক্ত ‘মি. বেকার’-এর যাবতীয় উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রয় সরাসরি তত্ত্বাবধান করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঢাকা উত্তর কমিশনারেটকে সুপারিশ করা হয়েছে।

এমএএস/এফআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]