বেসরকারি কলেজ উন্নয়ন প্রকল্প

বারবার মেয়াদ বাড়ায় অসন্তোষ, কঠোর হচ্ছে আইএমইডি

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:২৫ এএম, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
প্রকল্পেও আওতায় নির্মাণাধীন কয়েকটি কলেজভবন/সংগৃহীত

শিক্ষার মানোন্নয়নে নির্বাচিত দেড় হাজারের বেশি বেসরকারি কলেজকে প্রযুক্তিগত সুবিধার আওতায় আনতে চায় সরকার। ভবন নির্মাণসহ আরও কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকবে প্রকল্পের আওতায়। এ বিষয়ক একটি প্রকল্প অনুমোদন হয় ২০১২ সালে। ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজই শুরু হয়নি। বারবার বাড়ছে মেয়াদ ও ব্যয়। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। দ্রুত কাজ শেষ না করলে আরও কঠোর হবে সংস্থাটি।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় সরকারি-বেসরকারি কলেজের মধ্যকার ভৌত সুবিধাদির পার্থক্য কমানো, শিক্ষা উপকরণ অর্জন, একাডেমিক ভবন, ইন্টারনেট সুবিধাসহ কম্পিউটার ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, স্মার্ট ক্লাসরুম, ফার্নিচার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রভৃতি সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। পুরো বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার সুযোগের ভারসাম্য নিশ্চিত করা এবং জেলা-উপজেলা সদরে অবস্থিত কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির অতিরিক্ত চাপ কমানো প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।

আরও পড়ুন>> বারবার বাড়ে প্রকল্পের মেয়াদ, খরচ বাড়ে শত শত কোটি

প্রকল্পের আওতায় থাকা এমন একটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা উইমেন কলেজ। এ প্রকল্প থেকে আট তলা ভবন নির্মাণে কার্যাদেশ দেওয়া হয় এক দশক আগে। অথচ কাজ শুরুই হয়নি। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে কাজ শুরু না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা বলছেন, প্রকল্প সাইট তিনবার পরিবর্তন হওয়ার কারণে কার্যাদেশ দিতে বিলম্ব হয়েছে। ঠিকাদার বলছেন, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়বে কি না এ বিষয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কাজ শুরু করেননি।

উইমেন কলেজের প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় শুরুতে ছিল ২৩ লাখ আট হাজার ৭৭০ টাকা। সবশেষ অনুমোদিত প্রকল্পে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬০ টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

আরও পড়ুন>> বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় কমেছে ৩৯ কোটি ডলার

নভেম্বর ২০২২ পর্যন্ত মূল প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিতে আর্থিক অগ্রগতি ৭৭ শতাংশ। জুলাই ২০১২ সালে অনুমোদিত প্রকল্পের কাজ জুন ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। অথচ চার ধাপে ডিসেম্বর ২০২২ নাগাদ সময় বাড়ালেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। এখন নতুন করে আরও দুই বছর অর্থাৎ, ডিসেম্বর ২০২৪ নাগাদ সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে আইএমইডিতে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর।

প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখা) আনিকা রাইসা চৌধুরী।

আরও পড়ুন>> ‘মুজিব কিল্লা’ নির্মাণে অগ্রগতি নেই, ফের বাড়ছে সময়-ব্যয়

এক দশকে কাজ শুরু না হওয়া প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর আইএমইডিকে জানায়, প্রকল্পের সাইট তিনবার পরিবর্তন হয়েছে। এ কারণেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। কাজ বাস্তবায়নের জন্য আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে।

jagonews24

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এভাবেই চলতি বছরের ছয় মাস না যেতেই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে চলমান ১৭৫ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে একনেকের আটটি সভায় ২৪টি প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়। এতে একদিকে সরকারের অর্থের যেমন অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সুবিধাভোগীরা।

কঠোর অবস্থানে আইএমইডি
বৈশ্বিক মন্দা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বারবার মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব এলেও কঠোর অবস্থানে আইএমইডি। কেন বারবার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে জানতে চেয়ে আরও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। বারবার মেয়াদ বাড়ানোর কারণে অসন্তোষও প্রকাশ করেছে প্রকল্প তদারকি সরকারি সংস্থাটি।

আইএমইডি সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের কাছে মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব আসা মানেই অনুমোদন নয়। আমরা এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাবো। কেন প্রকল্প ডিলে হচ্ছে, কে দায়ী- এ বিষয়ে আমরা ক্ষতিয়ে দেখবো।

আরও পড়ুন>> বজ্রপাত থেকে কৃষকদের রক্ষায় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের টার্গেট সঠিক সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করে সুফল দেওয়া। বারবার মেয়াদ বাড়ানো নয়। কারণ মেয়াদ বাড়া মানেই টাকা বাড়াতে হয়। বড় প্রকল্প দ্রুত অর্থায়ন করে শেষ করে দেবো। যেগুলো শুরু করা হয়নি দরকার হয় পরের বছর অর্থ বরাদ্দ দেবো। এক কথায় সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে।’

প্রকল্পের উদ্দেশ্য
‘তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজসমূহের উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় কলেজগুলোতে বর্ধিতহারে ভৌত সুবিধাদি বাড়ানো, একাডেমিক ভবন, ইন্টারনেট সুবিধাসহ কম্পিউটার ল্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, স্মার্ট ক্লাসরুম, ফার্নিচার, শিক্ষক প্রশিক্ষণসহ নানান শিক্ষা উপকরণ বাড়ানো, শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন, বেসরকারি কলেজগুলোর ভৌত অবকাঠামোগত পার্থক্য কমানো, পুরো বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার সুযোগের ভারসাম্য এবং সমবণ্টন নিশ্চিত করা, জেলা ও উপজেলা সদরে অবস্থিত কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির অতিরিক্ত চাপ কমানো।

প্রকল্পের আর্থিক ব্যয়েও ধীরগতি
প্রকল্পের বাৎসরিক ক্রয় পরিকল্পনা অনুসারে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যায়নি। নভেম্বর, ২০২২ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি ৪ হাজার ২৯২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৭৭ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৮০ শতাংশ। এডিপিতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হলে প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হবে।

ধীরগতির প্রকল্পে আইএমইডির অসন্তোষ
প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ভোলা ও ঢাকা অংশে আইএমইডির পরিচালক সোনিয়া বিনতে তাবিব সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের আলোকে একটি খসড়া মেয়াদ বাড়ানোর মতামত সম্বলিত প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে শর্তসাপেক্ষে ব্যয় বাড়িয়ে বাস্তবায়ন মেয়াদ দুই বছর বৃদ্ধি করে ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছে আইএমইডি।

আরও পড়ুন>> ‘টাকার অভাব’, এডিপিতে কচ্ছপগতি

একই সঙ্গে বারবার মেয়াদ বাড়ানোর কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। প্রকল্পের অনুকূলে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিতকরণসহ নির্মাণকাজের কাঙ্ক্ষিত গতি ও গুণগতমান বজায় রাখতে প্রকল্পের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে তদারকি করতে বলা হয়েছে। পরবর্তীসময়ে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো সমীচীন হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি।

আইএমইডির সতর্কতা
যেসব ভবন নির্মাণে কাজের গতি আশানুরূপ নয় প্রকল্প পরিচালকের মাধ্যমে সেসব নির্মাণ সাইটে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি, মালামাল ও লোকবলের মবিলাইজেশন বাড়ানোর কথা বলেছে আইএমইডি। এক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি পরিলক্ষিত হলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির কারণে ঠিকাদারের কাজের গুণগতমান যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকতে হবে বলে জানায় সংস্থাটি।

আইসিটি ল্যাব এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম সঠিকভাবে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে কি না- সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিষয়টি নিয়মিত তদারকি করবে। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পরপরই স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী আসবাবপত্র সরবরাহ, আইসিটি ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের জন্য কেনা পণ্য শনাক্তকরণে প্রকল্পের নামকরণ করতে হবে অমোচনীয় কালি দিয়ে।

বর্তমানে দ্বিতীয় সংশোধনীতে নতুন সংযুক্ত ১২১টি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৫৭টি প্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মাণকাজ চলছে। এছাড়া প্রকল্পভুক্ত ১ হাজার ৬১০টি কলেজের মধ্যে ৮০৬টি কলেজে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ এবং ৯০৭টি কলেজে আইসিটি ল্যাব স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট কলেজগুলোতে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ ও আইসিটি ল্যাব স্থাপনের জন্য ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) সংস্থান রয়েছে। এসব চলমান কাজ শেষ করা এবং নির্মাণ শেষে সরবরাহ কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর অর্থাৎ, ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে বলে জানায় আইএমইডি।

এমওএস/এএসএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।