বই আলোচনা
ট্রেন টু ভিলেজ: সমাজ পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি
উম্মে হাবিবা কনা
‘ট্রেন টু ভিলেজ’ জিল্লুর রহমানের চমৎকার একটি কিশোর উপন্যাস। কয়েকজন কিশোর-কিশোরী ও শহর-গ্রামের পরিবেশ-প্রকৃতি নিয়ে দারুণ বর্ণনা করেছেন লেখক। ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থী, যারা কখনো গ্রামে যায়নি এবং গ্রাম সম্পর্কে নেগেটিভ ধারণা পোষণ করে। গ্রাম মানেই তারা জানে নোংরা, কাদামাটি, অপরিচ্ছন্ন, অশিক্ষিত, বিদুৎবিহীন অন্ধকার, যেখানে যাওয়ার কথা ভাবতেই নাক ছিটকায়। কিন্তু সমবয়সী ক্লাসমেট রকি জানায় তাদের বাসায় গ্রাম থেকে তার আত্মীয় এসেছিল, তিনি গ্রামের হাইস্কুলের ইংলিশের শিক্ষক এবং ইংলিশে কথা বলতে পারেন। এমনকি তার মেয়ে তুলিকে নিয়ে শহরে এসেছে, সে জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলে সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে রানার্সআপ হয়। যথেষ্ট স্মার্ট এবং নম্র-ভদ্র সে। এসব প্রশংসা শুনে ছুটিতে বন্ধুরা মিলে গ্রামে যেতে চায়।
বাসা থেকে প্রথমে প্রতিক্রিয়া দেখালেও আস্তে আস্তে নানাবিধ কৌশল করে, এমনকি স্ট্রাইক পর্যন্ত করে ওরা বাসায় রাজি করায় গ্রামে গিয়ে ছুটি কাটানোর জন্য। পরবর্তীতে অনেক মজার মজার ঘটনা ঘটে এবং অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করে ওরা। গ্রামে গিয়ে পচাত্তর বছর বয়সের দাদা, এভারগ্রিন বয়ের সাথে দেখা ও পরিচয় হয় সবার। ওনার কাছ থেকে শিক্ষণীয় এবং বাস্তবধর্মী অভিজ্ঞতা লাভ করে সবাই। বাংলাদেশে বিভিন্ন উপজাতি রয়েছে, এসবের সম্যক ধারণা লাভ করে ও বিপদে সহযোগিতা পায়। গ্রামে হিন্দু-মুসলিমে বিভাজন নেই, ধর্মের দেওয়াল নেই, সম্প্রীতির চমৎকার চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক। মোটকথা রকি, টনি, তিথি, রিতু এদের সম্পূর্ণ মনমানসিকতা ও চিন্তা-চেতনা বদলে যায় গ্রামে যাওয়ার পর।
উপন্যাসে লতিফ সাহেব একজন চমৎকার ব্যক্তি। যিনি গ্রামের বয়ঃজ্যেষ্ঠ এবং সকলে তাকে শ্রদ্ধা করে ও ভালোবাসে। তিনি গ্রামে লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন। ফেসবুক আইডির পজিটিভ ব্যবহার করে গ্রাম ও শহুরে মানুষের মধ্যকার বিভেদ দূর করতে চান। রকি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে এবং তার মাধ্যমেই সবাই মিলে প্ল্যান করে গ্রামে ঘুরতে যায়। তিথি একটু জেদি ও বেশি শহুরে। ইংলিশ মিডিয়ামের মেয়ে হওয়ায় একটু বেশিই স্বাধীনচেতা। তুলি গ্রামের সহজ-সরল ও স্মার্ট মেয়ে। তার সাথে মিশে সবাই তাদের গ্রামকে উপভোগ করে।
উপন্যাসের কিছু কথা পাঠকের ভালো লাগবে। একইসঙ্গে তা স্মরণ রাখার মতো:
- বেশি রাগি মানুষ এমনই হয়। খুব তাড়াতাড়ি রেগে যায় আবার তাড়াতাড়ি থেমেও যায়।
- মানুষ প্রকৃতি থেকে যে শিক্ষা পায় শুধু বই পড়ে সে শিক্ষা কোনোদিন অর্জন করা সম্ভব হয় না।
- মাম্মি বলবে না দাদু। মা বলবে, মা কথায় যেমন একটা রক্তের টান, নাড়ির টান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার টান আছে মাম্মি কথাটাতে তেমনটি আছে বলে মনে হয় না। একটু দূরত্ব বেশি বেশি বলে মনে হয়। অথচ মা ও সন্তানের সম্পর্কের মতো সম্পর্ক পৃথিবীতে আর নেই, কোনোদিন হবেও না।
- আঙুল তো ছেলেমেয়ে সবারই আছে কিন্তু মেয়েদের আঙুল সুন্দর বলে তো মেয়েদের আঙুলের একটা স্পেশ্যালিটি আছে। সেজন্যই তো বলে লেডিস ফিঙ্গার।
বইটি পড়ে অনেক মজা পেয়েছি। মনে হয়েছে চোখের সামনে যেন তাদের গ্রামে ঘুরতে যাওয়া দেখতে পেলাম। তাদের দুরন্তপনা, স্মার্টনেস অন্যমাত্রা যোগ করেছে। শহরের এবং গ্রামের চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক। এ ছাড়া অভিভাবকদের ভুলগুলো এবং সঠিক প্যারেন্টিং সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। ভদ্রতা, শিষ্টাচার, বন্ধুত্ব, পিতা-মাতার দায়িত্ব-কর্তব্য, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, শেকড়ের টান, অসাম্প্রদায়িকতাসহ বেশ কিছু বিষয় সুচারুরূপে ফুটিয়ে তুলেছেন। সবমিলিয়ে বেশকিছু সুন্দর মেসেজ রয়েছে বইটিতে। একটি অনবদ্য কিশোর উপন্যাস ‘ট্রেন টু ভিলেজ’।
বইয়ের নাম ‘ট্রেন টু ভিলেজ’ রাখার কারণটি চমৎকার। উপন্যাসের দাদু ‘ট্রেন টু ভিলেজ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ চালান। যেখানে গ্রামকে অপরূপ রূপে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি চান গ্রামবাংলার শোভা, কৃষ্টি-কালচার বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ুক। গ্রাম সম্পর্কে সমস্ত নেগেটিভ ধারণা বদলে যাক মানুষের এবং গ্রাম-শহরের মধ্যকার সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটুক। এ ছাড়া বইয়ের প্রোডাকশন অসাধারণ। বাইন্ডিং, বানানশৈলী এবং প্রচ্ছদ বইটিকে ষোলোকলায় পূর্ণ করেছে।
- আরও পড়ুন
আসমান: যে গল্প জীবনের চেয়েও বড়
আমি ভেবেছিলাম, গতানুগতিক ধরনের বই হয়তো। ট্রেন জার্নির বর্ণনা আশা করেছিলাম। কিন্তু পড়তে গিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা হলো। দারুণ একটা থিম মাথায় রেখে কথাসাহিত্যিক জিল্লুর রহমান বইটি লিখেছেন। তিনি সর্বদা সামাজিক বার্তা দিয়ে থাকেন লেখার মধ্য দিয়ে। তিনি মনে করেন, উপন্যাস হোক সমাজ পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
বই: ট্রেন টু ভিলেজ
লেখক: জিল্লুর রহমান
প্রকাশক: ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২১
মলাট মূল্য: ২৫০ টাকা।
এসইউ