সারাদিন নামাজ না পড়লেও তারাবির জন্য ছুটে যেতাম : জায়েদ খান

মইনুল ইসলাম
মইনুল ইসলাম মইনুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:২৬ এএম, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জায়েদ খান

তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, বিশেষ করে ধর্মচর্চা নিয়ে ভক্তদের কৌতূহল থাকেই। মুসলিম তারকারাও নিয়মিত রোজা রাখেন, শুটিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও ইবাদতে সময় দেন। রোজা নিয়ে তাদের থাকে নানা মধুর স্মৃতি ও ব্যক্তিগত অনুভব। সেই তালিকায় ঢাকাই সিনেমার আলোচিত নায়ক জায়েদ খানও রয়েছেন।

রোজা নিয়ে নিজের দর্শন ও উপলব্ধির কথা জানিয়েছেন তিনি। গত প্রায় দুই বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এই অভিনেতা। সেখানেও কাজের ব্যস্ততার মধ্যেই রোজা পালন করেছেন।

জাগো নিউজ: কেমন আছেন?
জায়েদ খান: আলহামদুলিল্লাহ, খুব ভালো আছি। রোজার জন্য প্রস্তুত নিচ্ছি। এখানে সময়, পরিবেশ, মানুষ-সবকিছুই আলাদা। তবুও নিজের ভেতরে একটা চেষ্টা অনুভব করলাম যে রোজা রাখতেই হবে। এই অনুভূতিটা একজন মুসলিম হিসেবে দারুন লেগেছে আমার কাছে। এখানে বাংলাদেশের একদিন আগেই শুরু হয়েছে রমজান। কারণ এরা সৌদি আরবের সঙ্গে মিলিয়ে রোজা রাখে। দোয়া চাই, যেন দেশের মতোই রমজানকে ধারণ করতে পারি।

জাগো নিউজ : এখন তো মনে হয় ভোর রাত। সেহরি কি শেষ?
জায়েদ খান : না। সেহরির প্রস্তুতি নিচ্ছি। একটু পরেই খাবো। দেশে থাকলে এই সময়টাতে বাসায় একটা অন্যরকম আমেজ থাকতো। মায়ের হাতের নানা পদের রান্নার সুগন্ধ, ভাই-বোনদের ঘুম ঘুম মুখ, আজানের অপেক্ষা… এখানে সেই কোলাহল নেই। নেই মাইকে ডেকে দেওয়ার শব্দ। চারপাশটা অনেক বেশি শান্ত। ভেতরে ভেতরে একটা শূন্যতাও কাজ করে।

জাগো নিউজ: দেশকে তাহলে খুবই তো মিস করছেন-
জায়েদ খান: খুব.. বাংলাদেশে থাকলে রোজার যে আলাদা একটা ফিলিং পেতাম, সেই আবহটা এখানে পাই না। ভাই-বোনদের খুব মিস করি। সহকর্মীদেরও মিস করি। দেশে থাকলে বিভিন্ন জায়গায় ইফতার পার্টিতে যেতাম। আর ঢাকায় থাকলে চেষ্টা করতাম বাসায় ইফতার করতে। সবার সঙ্গে একসঙ্গে বসে ইফতার করতে ভীষণ ভালো লাগতো। বাসার রান্নার স্বাদটাই আলাদা। বাইরে খাবার তেমন ভালো লাগে না। সবসময়ই খাবার নিয়ে একটু সচেতন ছিলাম আমি। আমেরিকায় সেই ধর্মীয় আবহটা তেমন বোঝা যায় না। ইফতারের সময় টুপি পরে বের হওয়া, সময় মতো মাইকে আজানের ডাক শোনা, মায়ের হাতে বানানো ইফতার, ইফতারের পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, মহল্লার সবার সাথে মসজিদে তারাবির নামাজ; এসব ছাড়া আমেরিকার রোজা যেন সত্যি বিষাদে মোড়ানো।

জাগো নিউজ: প্রথম রোজা রাখার স্মৃতি মনে পড়ে?
জায়েদ খান: প্রথম রোজা রাখার স্মৃতি আজও স্পষ্ট মনে আছে। তখন খুব ছোট, তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমি ছিলাম সবার ছোট। বড়দের দেখে আমিও জেদ ধরলাম-আমাকেও রোজা রাখতে হবে। বড়রা বলছিল, ‘তুই পারবি না’। কিন্তু আমি তো নাছোড়বান্দা! জোর করেই সেহরি খেয়ে রোজা শুরু করলাম।

সকালটা কোনোভাবে কেটে গেলেও দুপুরের পর থেকেই কষ্টটা বাড়তে লাগল। বিকেলের দিকে তো অবস্থা আরও খারাপ। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় ফ্লোরে গড়াগড়ি খেতে শুরু করলাম। সবাই হাসছিল, আর আম্মা মায়া মেশানো হাসিতে বললেন, ‘আচ্ছা, খেয়ে ফেলো। রোজা হয়েছে।’ আম্মা বলার পর আর দেরি করিনি। দৌড়ে গিয়ে খেয়ে ফেলেছিলাম। সেই অসমাপ্ত রোজাটাই আজ সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। কারণ সেটার ভেতরেই ছিল ছোটবেলার জেদ, সরলতা আর পরিবারের ভালোবাসা। 

জাগো নিউজ: শৈশব-কৈশোরের ইফতার ও সেহরি নিয়ে অনেক স্মৃতি নস্টালজিক করে অনেককে৷ আপনারও কোনো মজার স্মৃতি আছে নিশ্চয়ই?
জায়েদ খান: রমজান এলেই বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম পিরোজপুরের বাজারের দিকে। ইফতারের জন্য তরমুজ, ফল আর টুকটাক যা পাওয়া যায় সব কিনে আনতে যেতাম। তখন মফস্বল শহরে ফ্রিজ ছিলো না বললেই চলে। তাই গরমের দিনে ঠান্ডা শরবতের স্বাদ পেতে আইসক্রিম ফ্যাক্টরি থেকে পলিথিনে করে বরফ কিনে সাইকেলে করে বাড়ি ফিরতাম। সেই বরফ গলতে গলতেই যেন ছড়িয়ে পড়ত রোজার বিকেলের অন্যরকম উত্তেজনা। তরমুজটা মিষ্টি কি না, সেটাও ছিল আলাদা টেনশন। পথে এক বড় ভাই থাকতেন, তিনি একটু খেয়ে ‘চেক’ করে দিতেন-ভালো হয়েছে কি না! এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই আজও আমার কাছে অমূল্য স্মৃতি।

বিশেষ করে সারাদিন নামাজ পড়তে না গেলেও তারাবির নামাজ পড়তে মসজিদে ছুটে যেতাম। আবার এমনও হয়েছে, খুব উত্তেজনা নিয়ে তারাবির নামাজ পড়তে গিয়ে মাত্র দুই চার রাকাত পড়েই বন্ধুদের সঙ্গে চুপিসারে বেরিয়ে পড়েছি। নামাজের মহাত্মটা তো তখন বুঝতাম না। আমরা পড়াশোনা থেকে বাঁচতে নামাজের কথা বলে আড্ডা মারতাম বন্ধুরা মিলে। 

জাগো নিউজ: শৈশব ও বড়বেলার রোজার মধ্যে কী পার্থক্য পান?
জায়েদ খান: শৈশবে রোজা মানে লুকিয়ে খেয়ে ফেলা। মনে হতো, লুকিয়ে খেলে কেউ দেখবে না। রোজা ঠিক হয়ে যাবে। তখন রোজা ছিল যেন একটা নিয়ম মানার চেষ্টা, কিন্তু তার গভীরতা বুঝতাম না। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধিটা বদলে গেছে। এখন বুঝেছি, রোজা শুধু না খেয়ে থাকা নয়। এটা আল্লাহকে ভয় করা, অন্তর থেকে তার সন্তুষ্টি চাওয়া। সত্যিকারের রোজা হলো নিজের ভেতরের নিয়ন্ত্রণ, তাকওয়া আর আন্তরিকতা। কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন- এই বিশ্বাস থেকেই রোজা পূর্ণতা পায়।

যদি আরও সহজ করে বলি তো, শৈশবের রোজা ছিল অভ্যাসের, বড়বেলার রোজা হলো সচেতনতার। এখন নিজে বুঝতে শিখেছি, ধর্মটা কেবল পালন করার বিষয় নয়-অনুভব করার বিষয়। রোজাটা আসলে কীভাবে ঠিকভাবে রাখতে হয়, কেন রাখতে হয়-সেটা ধীরে ধীরে জানছি, শিখছি, আর মানার চেষ্টা করছি।

 

এমআই/এলআইএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।