‘বাবু-সোনা’ প্রেম ও অপ্রয়োজনীয় গানে আক্রান্ত ঈদের নাটক

বিনোদন প্রতিবেদক
বিনোদন প্রতিবেদক বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:০৪ পিএম, ১১ জুন ২০১৯

কেমন গেল ঈদের নাটক? গেল কয়েক বছরে এই প্রশ্নটার উত্তর আসতো ‘হেসে হেসে’। টিভি চ্যানেল খুললেই দেখা মিলতো অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সব ভাঁড় হয়ে গেছেন। তারা কারণ ও যুক্তি ছাড়াই জোর করে কাতুকুতু দিয়ে দর্শক হাসানোর বৃথা চেষ্টায় সংলাপ দিতেন।

নাটকের নাম থেকে শুরু করে পোস্টার, প্রচারণা সবকিছুতেই থাকতো কমেডির ছাপ। জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরীর মতো জাঁদরেল অভিনেতারা সেই কমেডির সবচেয়ে তারকা ছিলেন। এসব নিয়ে সমালোচনার শেষ ছিলো না।

বিরক্ত দর্শক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টিভি নাটক নিয়ে তাদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। সেসবের মুখে বেশ ক’জন নির্মাতা বদলে দেয়ার চেষ্টা করেছেন নাটকের হালচিত্র। যার ফলে এখন আর কমেডির নামে এমন ভাঁড়ামো খুব একটা দেখা যায় না টিভি চ্যানেলগুলোতে।

তবে মজার ব্যাপার হলো পরিবর্তন যা এসেছে সেটা নিয়েও এখন বিরক্ত দর্শক। কারণ হাসির বদলে টিভি নাটককে পেয়েছে কান্নার অসুখে। আগে যেখানে কারণ ও যুক্তি ছাড়াই হাসানো হতো সেখানে এখন কাঁদানো হচ্ছে।

গল্পের সাথে সামঞ্জস্য না রেখেই নাটক-টেলিফিল্মগুলোতে আবেগ ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। কোনো একটা ক্লু নিয়ে গল্পে বিষাদ-বেদনা যোগ করে মিনিটের পর মিনিট নায়িকাদের কাঁন্নার দৃশ্যে অভিনয় করানো চলছেই। বিশেষ করে অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী ও তানজিন তিশা কান্নার দৃশ্যে আলাদা পরিচিতি পেয়ে গেছেন।

অনেকে তাদের ‘কান্নার অভিনেত্রী’ বলেও ডাকা শুরু করে দিয়েছেন। নাটকে তাদের উপস্থিতি মানেই দর্শক ধরে নিচ্ছেন ৪৫ মিনিটের গল্পে ১৫ মিনিট কাঁদবেন এই দুজন- এমনই মন্তব্যে সয়লাব ফেসবুক। চলছে নানারকম ট্রলও।

অপূর্ব ও মেহজাবীনের ‘বড় ছেলে’ নাটক দিয়ে কমেডি সাম্রাজ্যে ধ্বস নামিয়ে একটা ইউটার্ন পেয়েছিলো বাংলা নাটক। ভাবা হচ্ছিলো জীবনের বাস্তবতা, পারিবারিক মূল্যবোধ, মানুষ ও মানবিক সম্পর্কের দায়বোধ নিয়ে বৈচিত্রময় হয়ে উঠবে নাটক-টেলিছবির গল্প ও নির্মাণ।

কিন্ত সে আশায় গুড়ে বালি। ‘বড় ছেলে’ ইউটার্ন দিলেও সেটা ধারাবাহিক থাকেনি। কেবল ধারাবাহিক থেকেছে ‘বড়ে ছেলে’র আদলে নির্মাণ ও কেঁদে জনপ্রিয়তা পাওয়া মেহজাবীনের কান্নার দৃশ্য। যোগ হয়েছে অপুর্বর সঙ্গে আফরান নিশো ও মেহজাবীনের সঙ্গে তানজিন তিশাসহ আরও কয়েকজন অভিনেত্রীর ন্যাকা ন্যাকা প্রেমিকা ও তরুণী বউ চরিত্রের অভিনয়।

গল্পের কমন ফর্মুলা দুইজন মানব-মানবীর প্রেম অথবা দাম্পত্য। সেখানে না থাকছে গল্পের বৈচিত্রতা, না থাকছে চরিত্রের বৈচিত্রতা, না থাকছে লোকেশনের বৈচিত্রতা। থাকছে না অভিনয়শিল্পীদের বৈচিত্রতাও।

ঘুরে ফিরে অপুর্ব-নিশোর সঙ্গে মেহজাবীন-তানজিন তিশাকে নিয়ে নির্মিত হচ্ছে নাটক। কখনো কখনো সাফা কবির, নুসরাত ইমরোজ তিশা, মমরা আসছেন। গেল ঈদে এই ক’জন তারকাকেই দেখা গেল চ্যানেলে চ্যানেলে। যার ফলে একঘেয়েমিতে আক্রান্ত দর্শক মুখ ফিরিয়ে ছিলেন নাটক থেকে।

নাটকগুলোতে কমন সংলাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বাবু’ ও ‘সোনা’। নাটকগুলোতে কমন একটি অনুষঙ্গ হয়ে গেছে অপ্রয়োজনীয় গান। যা কেবলই নাটকের সময়কে দীর্ঘ করা ছাড়া আর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বলার অপেক্ষা রাখে না, নাটক এখন গানকে সাপোর্ট দিচ্ছে মিউজিক ভিডিও হিসেবে। যা অত্যন্ত হতাশার ও মহামারী হিসেবে রুপ নিচ্ছে দিনে দিনে। 

বিরক্তির মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে নাটকগুলোতে অশ্লীল সংলাপ, গালাগালি ও ইশারা ইঙ্গিত। তানজিন তিশা ও আফরান নিশোর মতো তারকাদের দেখা গেছে গলা ফাটিয়ে গালি দিয়ে যাচ্ছেন মিনিটে মিনিটে! যার ফলে টিভি ও ইউটিউবের জন্য নির্মিত নাটকেও সেন্সর বোর্ডের নজরদারি প্রয়োজন আছে বলে দাবি উঠেছে।

অনেকে মনে করছেন ইউটিউব এখন টিভি চ্যানেলকে শাসন করছে, প্রভাবিত করছে। টিভিকে পাশ কাটিয়ে ইউটিউবের জন্যও নাটক নির্মাণের হিড়িক বেড়েছে। নাটক প্রযোজনায় আসছে মিউজিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো।

সেখানে ভিউকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে এখন। আর ইউটিউবের জনপ্রিয়তার চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েই অল্প ক’জন তারকায় আটকে গেছে নাটক নির্মাণের ভাবনা। এইসব নাটকে একটা-দুইটা গান ভিডিও আকারে প্রকাশ করার আলাদা ব্যবসাও চোখে লাগছে।

অন্যদিকে ইউটিউবের আধিপত্যে নির্মাতারা নিজেদের যোগ্যতা-মেধা ও নির্মাণের মুন্সিয়ানার চেয়ে, গল্পের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন ‘ভিউ’ আনা তারকাদের উপর। চটকদারি প্রচারণায় ইউটিউবে খানিক সময়ের জন্য ঢুঁ মেরে হয়তো ভিউ বাড়ছে। কিন্তু অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে টিভি চ্যানেলগুলো।

চ্যানেলের সামনে বসে বলা চলে নাটক দেখছেনই না দর্শক। গেল বছরগুলোর তুলনায় তাই সদ্য শেষ হওয়া ঈদে টিভি নাটকের দর্শক ছিলো খুবই কম।

এ নিয়ে সমালোচনাও হচ্ছে খুব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গেল ঈদের নাটক নিয়ে অনেক হতাশা ঝড়ছে দর্শক ও টিভি মিডিয়ার মানুষদের মধ্যে। তারা ‘সোনা-বাবু’ প্রেম ও অপ্রয়োজনীয় গান-লোকেশন দেখানোর বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে নির্মাতাদের অনুরোধ করছেন।

ইউটিউবের ভিউয়ের জন্য একই তারকা, স্বস্তা গল্প ও সংলাপকে প্রাধান্য না দিয়ে দেশ ও সমাজের নানা অসঙ্গতি নিয়ে, বিভিন্ন সাফল্য নিয়ে বৈচিত্রময় নাটক নির্মাণের পরামার্শ দিচ্ছেন।

কেননা একঘেয়েমি নাটকগুলোর ভিড়ে ঠিকই টিভিতে আলোচনায় এসেছে জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, মীর সাব্বিরদের নাটকগুলো। চাকচিক্যের প্রচারণা ছাড়াই ঈদের সেরা অনুষ্ঠান হিসেবে দর্শকের মনে দাগ কেটেছে হানিফ সংকেতের ইত্যাদি। এটি টিআরপি রেটিংয়ে যেমন ছিলো সবার শীর্ষে তেমনি ইউটিউবেও পেয়েছে অভাবনীয় সাফল্য।

এগুলো প্রমাণ করেছে বৈচিত্রতাই দর্শককে বিনোদিত করে, মুগ্ধতা দেয়। প্রেম ও নায়ক-নায়িকার কান্নাকাটিও হোক বৈচিত্রময়, সব শ্রেণি পেশার মানুষের মনকে ছুঁয়ে যাবার মতো।

এলএ/এমএস

বিনোদন, লাইফস্টাইল, তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ, তারুণ্য, ক্যাম্পাস নিয়ে লিখতে পারেন আপনিও - [email protected]

আপনার মতামত লিখুন :