আমি কখনো নুহাশ পল্লী যাইনি বলে দেখা হতো না : আবুল হায়াত

বিনোদন প্রতিবেদক
বিনোদন প্রতিবেদক বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৫০ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০২০ | আপডেট: ০১:০৫ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০২০

বহুবছর ধরে টিভি নাটকে, সিনেমায় আর বিজ্ঞাপনে সফলতার সাথে অভিনয় করে আসছেন। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ রচিত প্রচুর নাটকে তিনি অংশ নিয়েছেন। মিসির আলি তার একটি স্মরণীয় চরিত্র। তার প্রথম নাটক ইডিপাস ১৯৬৯ সালে বের হয়েছিল। এর পর একে একে ৫০০ এরও অধিক নাটকে অভিনয় করেছেন।

তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা আবুল হায়াত। আজ ১৩ নভেম্বর নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে তার স্মরণে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে-

জাগো নিউজ : হুমায়ূন আহমেদ আপনার বয়সে চার বছরের ছোট। তার সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কেমন ছিলো- বন্ধুত্বের নাকি সিনিয়র জুনিয়র?
আবুল হায়াত : বন্ধু বলতে যা বোঝায় তা ঠিক নয়। তবে খুব ক্লোজ ছিলাম। দারুণ আন্তরিকতা ছিলো আমাদের মধ্যে। সিনিয়র-জুনিয়র ব্যাপারটাও নয়। কাজের সূত্রে পরিচয়, তারপর আন্তরিকতা। সম্ভবত ১৯৮৪ সালে হুমায়ূন আহমেদ প্রথম নাটক নির্মাণ করেন। সে নাটকে কাজ করেছিলাম। এরপর আরও অসংখ্যবার তার সঙ্গে কাজ করেছি। তিনি চিত্রনাট্যে বড় বড় অক্ষরে আমার নাম লিখে উল্লেখ করে দিতেন, এই চরিত্রটি হায়াত ভাইয়ের।

জাগো নিউজ : একজন নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদকে একজন অভিনেতা হিসেবে কিভাবে দেখেছেন? তার সাফল্য-ব্যর্থতা কিভাবে বিশ্লেষণ করেন?
আবুল হায়াত : আমি তাকে বলবো অত্যন্ত উঁচু মানের একজন নাট্যকার ও গল্পকার। তার সংলাপ খুব সহজেই দর্শকের হৃদয়ে গেঁথে যেত। চমৎকার করে গল্প বলতে পারতেন। দর্শক মুগ্ধ হয়ে সেই গল্প দেখতেন। শিল্পীরাও মুগ্ধ হয়ে অভিনয় করতেন। আমি তাকে সাহিত্যিক, চিত্রনাট্যকার হিসেবেই বেশি এগিয়ে রাখবো।

জাগো নিউজ : দীর্ঘদিন একসঙ্গে মিশেছেন, কাজ করেছেন। একজন চলে গেলেন অনেকটা আগেই। এ বিষয়টা কি মনে বিষাদের শূন্যতা আনে?
আবুল হায়াত : অবশ্যই আনে। তিনি বন্ধুবৎসল মানুষ। অনেকদিন একসঙ্গে কাটিয়েছি। অনেক অনেক স্মৃতি আমাদের। তাকে হারিয়ে ফেলাটা তো বিষাদের বটেই। আর তার না থাকার শূন্যতাও আছে।

জাগো নিউজ : তাকে কী হঠাৎ কখনো একা একা ভাবনায় মনে পড়ে না?
আবুল হায়াত : মনে পড়ে। খুব মনে পড়ে। তিনি আড্ডাবাজ মানুষ ছিলেন। একটা সময় বিটিভিতে আমরা রেগুলার প্রচুর আড্ডা দিতাম। রিহার্সালগুলোতে উৎসব হতো। তিনি জমজমাট সব উৎসবের আয়োজন করে নানা রকম আইডিয়া নিয়ে। সেইসব আড্ডা ছিলো সুন্দর, নির্মল। সেইসব দিনগুলো মিস করি। বিশেষ বিশেষ স্টাইলে সংলাপগুলো পড়তেন তিনি। আমাদের সেসব মুগ্ধ করতো। আমার সঙ্গে তার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো না হলেও বললাম না যে খুব আন্তরিক ছিলাম আমরা। আমাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্কটাও ছিলো দারুণ।

আসলে হুমায়ূন আহমেদ বহু বহু গুণে গুনান্বিত একজন মেধাবী মানুষ। তাকে মনে পড়ে যায় বারবার, তার কর্ম ও গুণের কারণেই। তার চলে যাওয়াটা জাতির জন্য একটা বিরাট লস। আমাদের শোবিজের জন্যও বিরাট ক্ষতি হয়েছে।

জাগো নিউজ : হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যে বা পরিচালনায় আপনার অভিনীত কোন কাজটিকে এগিয়ে রাখবেন?
আবুল হায়াত : অয়োময়। সে নাটকে কাশেমের চরিত্রটি আমার কাছে খুব প্রিয়। মাল্টি ডাইমেনশনাল ক্যারেক্টার। সাধারণ জেলে থেকে চোর, চোর থেকে ব্যবসায়ী, সেখান থেকে জমিদার, জমিদার থেকে খুনী। সে আবার গান হায়, ঢোল বাজায়। সে আবার একজন স্নেহময়ী পিতা। মানে এমন পরিবর্তনশীল একটি চরিত্র আমি নিজে তো কখনো করিইনি আমার ধারণা এমন চরিত্র আমি কোথাও দেখিওনি। এই কাশেম চরিত্রটি হুমায়ূন আহমেদের অসাধারণ এক সৃষ্টি।

তারপর বলবো মিসির আলি চরিত্রটিও আমার খুব প্রিয়। অসাধারণ একটি চরিত্র এটি। এখনো অনেকে আমাকে মিসির আলি বলে ডাকে। অনেকে আবার সেই বহুব্রীহি নাটকের সোবহান সাহেব বলেও ডাকে। ওই চরিত্রটিও আমি খুব ভালোবাসি। আরেকটা নাটক ছিলো একা একা। এখানে ৯০ বছরের বৃদ্ধ চরিত্র করেছিলাম। খুব প্রশংসিত সেই চরিত্র। এইসব চরিত্রের নাটকগুলো হুমায়ূনের আউটস্ট্যান্ডিং নাটক। যুগ যুগ ধরে দর্শককে মুগ্ধ করে রেখেছে। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ যে এমন কালজয়ী, দুর্দান্ত সব চরিত্রে তিনি আমাকে কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন।

জাগো নিউজ : হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে প্রথম দেখা কোথায় হয়েছিলো? প্রথম আলোচনা বা পরিচয় পর্বটা জানতে চাই....
আবুল হায়াত : এটি ঠিক স্পষ্ট করে মনে নেই। তিনি নাট্যকার, আমি অভিনেতা। কাজের সূত্রেই আমাদের পরিচয় হয়েছিলো।

জাগো নিউজ : তার সঙ্গে শেষ দেখার স্মৃতি কি মনে পড়ে.....
আবুল হায়াত : হুমায়ূনের সঙ্গে অনেকদিন দেখা সাক্ষাৎ হতো না। ঢাকা ক্লাবেরই কোনো একটা অনুষ্ঠানে হয়তো শেষ তাকে দেখেছিলাম। সালটা মনে নেই। তবে অনেকে এসে বলতেন যে হুমায়ূন আহমেদ আপনার কথা খুব বলেন। আমি শুনতাম। আমারও তাকে মনে পড়তো। দেখা না হওয়ার আরেকটি কারণ ছিলো আমি কখনো নুহাশ পল্লীতে যাইনি। হুমায়ূন তখন নুহাশ পল্লীতেই বেশি সময় কাটাতেন। সেখানে আড্ডা-উৎসব হতো। আমি কখনো যাাইনি। এবং এখনো না।

জাগো নিউজ : এই বিরতি বা দেখা না হওয়া কিংবা কখনো নুহাশ পল্লীতে না যাওয়ার কারণটা কি? বিশেষ করে একটা রিউমার শোনা যায় যে হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় বিয়ের পর আপনিসহ আরও অনেকেই তার সঙ্গে একটা দুরত্ব তৈরি করেছিলেন। এটা আসলে কতটুকু সত্যি?
আবুল হায়াত : রিউমার কিছু নয়। একজন মানুষ তার ব্যক্তিজীবনে কি করবেন সেটা তার একান্ত বিষয়। লেখক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা হুমায়ূনে আমি চিরকাল মুগ্ধ। আজও।

আসলে একটা সময় তার চারদিকে অনেক লোক জুটে গেল, বিভিন্ন পেশার লোকজন। যারা তাকে ঘিরে থাকতো। তিনিও তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আমি একজন পেশাদার অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার হিসেবে। এখানে প্রতিদিন আমাকে কাজ করতে হয়েছে। সে কাজ ফেলে ওখানে গিয়ে যেসব মিলনমেলা, জমজমাট আড্ডা হতো সেসবে অংশ নিয়ে সময় নষ্ট করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। এমনও শুনতাম যে একটি নাটক হয়তো দুদিনে হবার কথা সেটা চারদিনে গিয়ে ঠেকেছে। আমি চাইলেও তার সঙ্গে তখন কাজ করা হয়ে উঠতো না শিডিউলের জন্য।

জাগো নিউজ : আজকের প্রেক্ষাপটে দর্শক যখন ভালো সিনেমার অভাবে দিন পার করছে তখন হুমায়ূন আহমেদকে একজন অভিনেতা হিসেবে আপনি কতোটা মিস করেন?
আবুল হায়াত : নির্মাণ তিনি করেছেন তো বটেই। তবে আজকের প্রেক্ষাপটে আমি তার লেখা গল্প, চিত্রনাট্য, সংলাপগুলো খুব মিস করি। ছোট গল্প বা খন্ড নাটকের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মাস্টারপিস। আমি অবাক হয়ে যাই তার ছোটগল্পগুলো দেখে যে এভাবেও চিন্তা করা সম্ভব। নাটকে তার সংলাপগুলো ম্যাজিকের মতো। বিশেষ করে নাটকে আবেগের দৃশ্যগুলো তিনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলতেন সংলাপের মধ্য দিয়ে।

এলএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]