ভেজাল খাদ্যের ক্ষতিকর প্রভাব

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৫৩ পিএম, ১০ জুন ২০১৮

শুধু রমজান মাস এলেই বাংলাদেশের রেস্টুরেন্ট, হোটেল মালিক কিংবা ফলের আড়তদাররা খাদ্যে ও ফলে ভেজাল মেশানো শুরু করেন না। তারা শতভাগ লাভের আশায় বছরের পর বছর এসব অখাদ্য বিক্রি করে আসছে। ভোজনরসিক বাঙালিও পরম তৃপ্তি নিয়ে তা খেয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন ডা. তাজবীর আহমেদ-

রমজান মাস এলেই যেন শুরু হয় ভেজালবিরোধী অভিযান। আর এসব অভিযানের পর দোষি রেস্টুরেন্টগুলো জরিমানার অর্থ পরিশোধ করেই রেহাই পেয়ে যায়। আর সেই সঙ্গে পরবর্তী একবছর ভেজাল খাবার পরিবেশনের এক অলিখিত লাইসেন্সও যেন পায়!

এক্ষেত্রে বিক্রেতাদের দোষ দিয়েই বা কী লাভ? কারণ তারা জানে- এ দেশের মানুষ খাবার কেনে দোকানের বাহারি আলোকসজ্জা, ব্র্যান্ড কিংবা রং-বেরঙের মোড়ক দেখে। চটকদার পরিবেশনার আড়ালে তাই অস্বাস্থ্যকর, নোংরা রান্নাঘরের দুর্গন্ধ নিমিষেই হারিয়ে যায় সুসজ্জিত শোরুমের সুরভিত এয়ার ফ্রেশনারে! অপরিণত ফলগুলোও তাই গাছপাকা হয়ে যায় বিষাক্ত রাসায়নিকের মাত্রাহীন ব্যবহারে! আর আমদানিকৃত ফলে ফর্মালিনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে পত্রিকার প্রতিবেদন তো সবারই জানা।

> আরও পড়ুন- যেভাবে করবেন ড্রাগ লাইসেন্স

এ কথাগুলো অবিশ্বাস্য মনে হলে গত একমাসে ভেজালবিরোধী অভিযানে অভিযুক্ত দোকানগুলোর সামনে ইফতারের আগে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় নিজ চোখে দেখে আসতে পারেন। তখন এটাও উপলব্ধি করতে পারবেন যে, ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক জরিমানাকৃত অর্থের পরিমাণ- সেই দোকানগুলোর একদিনের মুনাফার এক দশমাংশ মাত্র!

food-in

খুব জানতে ইচ্ছে হয়, ক্রেতাসাধারণ আসলে কতটুকু সচেতন? সব কিছু জেনেশুনে- এই আমরাই কেন বারবার চলে যাই সেসব দোকানগুলোতে? কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে কিনে আনা বিষাক্ত ফল কিংবা ভেজাল খাবার প্রিয়জনের মুখে তুলে দিতে পেরে আমরা হয়তো আনন্দিত হই। কিন্তু একবারও কেন ভাবি না- আমাদের অসচেতনতা এবং প্রতিবাদহীনতাই আমাদের আপনজনদের অপূরণীয় ক্ষতির মূল কারণ?

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি, গত একবছরে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ জাপানে’ খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার খবর যেমন শুনিনি তেমনি কোনো রেস্টুরেন্টে বাসি-পচা নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করতেও দেখিনি। খোদ টোকিওতেই অনেক বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট আছে কিন্তু সেই মালিকরাও অধিক মুনাফার আশায় অসুস্থ কোনো প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠেননি। আর জাপান সরকারের খাদ্য অধিদফতরের কঠোর আইন ও মনিটরিং ফাঁকি দিয়ে খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার কথা চিন্তাও করা কঠিন। এ আইন মান্য করা জাপানি রেস্টুরেন্টগুলোর জন্য যেমন প্রযোজ্য তেমনি ইতালীয়, মেক্সিকান বা ভারতীয় রেস্টুরেন্টের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।

> আরও পড়ুন- যে কোনো দেশের নাগরিকত্ব পাবেন যেভাবে

জাপানের কথা শুনে পাঠকগণ ভাবতে পারেন, আইনের সঠিক প্রয়োগই হয়তো ভেজাল খাদ্যের অভিশাপ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে জরুরি জিনিস হলো- ভোক্তাদের সচেতনতা। সবাই যদি আমরা সরকারের আশায় বসে থাকি, তাহলে এই সমস্যার সমাধান হতে হয়তো কয়েক যুগ লেগে যাবে। আর কালের পরিক্রমায় ভেজাল খাদ্যের ক্ষতিকর প্রভাবে আপনার শরীরেই তখন বাসা বাঁধতে পারে মরণঘাতী ক্যান্সার কিংবা বিকল হতে পারে কিডনি!

food-in

জীবন সায়াহ্নে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ না করে; সবাই যদি এখনই একটু সচেতন হই- তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্ম নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা পেতে পারে। সচেতনতা দিয়ে যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তখন বয়কট করা যেতে পারে ভেজাল বিক্রেতাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তাতেও ভেজাল দেওয়া বন্ধ না হলে- ঐক্যবদ্ধভাবে খুঁজে বের করতে হবে নতুন কোনো উপায়। কিন্তু তাই বলে, নীরবে এই অপরাধ আর কতদিন সহ্য করবো আমরা? দেশব্যাপী ভেজাল খাদ্য পরিবেশনের এই ঘৃণ্য মহোৎসব কি শেষ হওয়ার নয়?

মনে রাখবেন, ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে- তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’।

লেখক: চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব টোকিও এবং সদস্য, বাংলাদেশ সাংবাদিক-লেখক ফোরাম, জাপান।

এসইউ/এমএস