ইতিহাসের সাক্ষী ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৫২ পিএম, ০২ ডিসেম্বর ২০১৯

সবুজ ঘাসের গালিচায় শোভা পাচ্ছে হরেক রকমের ফুল। গাছ-গাছালি ঘিরে সুনসান নীরবতা। এখানেই শায়িত আছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকেরা। বলছি ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রির কথা। ঘুরে এসে বিস্তারিত জানাচ্ছেন নাহিদ হাসান-

কুমিল্লা জেলায় অবস্থিত কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি। ১৯৪১-৪৫ সালে বার্মায় (বর্তমান মায়ানমার) সংঘঠিত যুদ্ধে যে ৪৫ হাজার সৈনিক নিহত হন। তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা), আসাম এবং বাংলাদেশে মোট নয়টি রণ সামাধিক্ষেত্র তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ দুটি কমনওয়েলথ রণ সমাধিক্ষেত্র আছে। যার অন্যটি চট্টগ্রামে অবস্থিত। প্রতি বছরই দেশ-বিদেশের বহু দর্শনার্থী যুদ্ধে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসব রণ সমাধিক্ষেত্রে আসেন।

জানা যায়, ময়নামতি রণ সমাধিক্ষেত্র মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) নিহত ভারতীয় (তৎকালীন) ও ব্রিটিশ সৈন্যদের কবরস্থান। এটি ১৯৪৩-১৯৪৪ সালে তৈরি করা হয়েছে। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের খুব কাছেই এই সমাধিক্ষেত্রের অবস্থান। সামাধিক্ষেত্রটি কমনওয়েলথ ওয়ার গ্রেভস কমিশন (সিডব্লিউজিসি) ওই সময়ে প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাই তারাই এটি পরিচালনা করেন। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে সব ধর্মের ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থনাসভা অনুষ্ঠিত হয়।

war-in

তৎকালীন ময়নামতি একটি ছোট গ্রাম হলেও সেনাবাহিনীর একটি বড় ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এখানে বড় একটি হাসপাতাল স্থাপন করা হয়। এছাড়াও কুমিল্লা ছিল যুদ্ধ-সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্র, বিমানঘাঁটি আর ১৯৪৪ সালে ইম্ফলে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে চতুর্দশ সেনাবাহিনী সদর দফতর।

এ সমাধিক্ষেত্রে মোট ৭৩৬টি কবর আছে। এরমধ্যে অধিকাংশই সেই সময়কার হাসপাতালে মৃত সৈনিক। তাছাড়া যুদ্ধের পর বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু মরদেহ স্থানান্তর করে এখানে সমাহিত করা হয়। বাহিনী অনুযায়ী এখানে মোট ৩ জন নাবিক, ৫৬৭ জন সৈনিক এবং ১৬৬ জন বৈমানিক সমাহিত আছেন। সর্বমোট ৭২৩ জন নিহতের পরিচয় জানা সম্ভব হয়েছিল।

war-in

সমাধিক্ষেত্রটির প্রবেশমুখে একটি তোরণ ঘর। যার ভেতরের দেয়ালে সমাধিক্ষেত্রের ইতিহাস ও বিবরণ ইংরেজি-বাংলায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। তোরণ ঘর থেকে সরাসরি সামনে প্রশস্ত পথ। যার দুই পাশে সারি সারি এপিটাফ আর তাতে নিহতের নাম, পরিচয়, মৃত্যু তারিখ লেখা রয়েছে। এপিটাফে নিহত সৈন্যদের ধর্ম অনুযায়ী ধর্মীয় প্রতীক লক্ষ্য করা যায়। যেমন খ্রিষ্টানদের এপিটাফে ক্রুশ আর মুসলমানদের এপিটাফে আরবি লেখা। আর এই প্রশস্ত পথ ধরে সোজা সামনে রয়েছে সিঁড়ি দেওয়া বেদি। বেদির উপরে রয়েছে খ্রিষ্টধর্মীয় প্রতীক ক্রুশ। বেদির দুই পাশে রয়েছে আরও দুটি তোরণ ঘর। এ দুটি তোরণ ঘর দিয়ে সমাধিক্ষেত্রের পেছনের অংশে যাওয়া যায়। সেখানে রয়েছে আরও বহু এপিটাফ। দুই কবরের মাঝে রয়েছে একটি করে ফুলগাছ। তাছাড়া পুরো সমাধিক্ষেত্র জুড়ে রয়েছে অনেক গাছ।

সমাধিক্ষেত্রের সামনের অংশের প্রশস্ত পথের পাশেই ব্যতিক্রমী একটি কবর রয়েছে। যেখানে একসাথে ২৩টি এপিটাফ দিয়ে এক স্থানকে ঘিরে রাখা হয়েছে। স্থানটি ছিল মূলত ২৩ জন বিমান সৈনিকের একটি গণকবর। যেখানে লেখা রয়েছে, ‘These plaques bear the names of twenty three Airmen whose remains lie here in on grave.’

war-in

ঘুরতে ঘুরতে কথা হয় সমাধিক্ষেত্র দেখতে আসা নওশাদ হোসাইন নামের এক শিক্ষার্থীর সাথে। ঢাকা থেকে ‘সপ্তবর্ণ’ নামের একটি সংগঠন থেকে এখানে এসেছেন তারা। তিনি জানান, কুমিল্লা ট্যুরে এসে প্রথমে শালবন বিহার ঘুরে দেখেছেন। তারপর এখানে এসেছেন। এমন ঐতিহাসিক জায়গা দেশে খুব কমই আছে। এখানে এসে অনেক কিছু জানতে পেরেছেন।

আবুল হোসেন নামের এক স্থানীয় বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকেই দেখছি, এখানে অনেক লোক দেখতে আসে। মাঝে মধ্যে অনেক বিদেশিও আসেন। আসলে এটি ইতিহাসের একটি অংশ।’

এসইউ/জেআইএম