তারুণ্যের ভাবনায় স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:২৩ এএম, ২৬ মার্চ ২০২০

নাজমুল হুদা

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে সদ্য শত্রুমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসের (২৬ মার্চ ১৯৭২) ভাষণে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘শ্মশান বাংলাকে আমরা সোনার বাংলা করে গড়ে তুলতে চাই। যে বাংলায় আগামী দিনের মায়েরা হাসবে, শিশুরা খেলবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবো। ক্ষেত-খামার, কল-কারখানায় দেশ গড়ার আন্দোলন গড়ে তুলুন। কাজের মাধ্যমে দেশকে নতুন করে গড়া যায়। আসুন সকলে মিলে সমবেতভাবে আমরা চেষ্টা করি যাতে সোনার বাংলা আবার হাসে, সোনার বাংলাকে আমরা নতুন করে গড়ে তুলতে পারি।’

ধংসস্তূপ থেকে টেনে তুলে নতুন করে বাংলাকে সুখী, সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার শপথ ও স্বপ্নবীজ ছড়িয়ে দেওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার মাস মার্চ এলেই মনের দরজায় প্রশ্নটি কড়া নাড়ে যে, তরুণদের মন ও মগজে কতটা প্রোথিত হয়েছে স্বাধীনতার মর্মবাণী? ৭, ১৭ বা ২৬ নানা কারণেই মার্চ আমাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের কারণে এবারের মার্চটি বিশেষভাবে অর্থবহ ও অনবদ্য। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপনের আর মাত্র একবছর। এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তরুণরা কী ভাবছে-স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু ও আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে? তারা কতটুকু প্রাণিত হচ্ছে দেশপ্রেম ও দেশ গড়ার কাজে? কীভাবে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে জাতির পিতার জীবনাদর্শ, উন্নয়ন দর্শন, প্রেরণাময়ী ভাষণ ও ভাবনায়? এসব প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণে ‘স্বপ্নশীলন’ নামে একটি সৃজনশীল উন্নয়ন সংস্থা ‘আমার বঙ্গবন্ধু-প্রেম ও প্রেরণায়’ শীর্ষক প্রকাশনা ও প্রতিযোগিতার উদ্যোগ নেয়। এতে নানা দিক নিয়ে তরুণদের কাছ থেকে লেখা আহ্বান করা হয়। জানতে চাওয়া হয়, বঙ্গবন্ধুর কোন বিষয়টি তাদের আকৃষ্ট করে, অনুপ্রেরণা জোগায়, দেশাত্মবোধ জাগ্রত করে।

গত ১৭ মার্চ পর্যন্ত শতাধিক তরুণের ভাবনায় উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাদের নিজস্ব অনুভূতি, ভালো লাগার ও ভালোবাসার নানাদিক। শুধু তথ্যবহুল গৎবাধা লেখা নয়। তারা সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কেন তারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে, কোন বিষয়টি তাদের ভালো লাগে কিংবা কিভাবে তারা অনুপ্রাণিত হয়। যেমন অনেকেই বলেছে তাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব সবচেয়ে আকর্ষণীয় আবার অনেকেই তার কথা বলার স্টাইল, মানুষের সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা, মানুষকে ভালোবাসার ক্ষমতা, সাহসী নেতৃত্ব এসব বিষয় উল্লেখ করেছেন। তবে জাতির পিতার ৭ মার্চের ভাষণ তাদের সবচেয়ে অনুপ্রাণিত করে, তার আঙুলি হেলানো বজ্রকণ্ঠ, শব্দচয়ন তাদের ভীষণ শিহরিত করে বলে বেশিরভাগ তরুণ জানিয়েছে। একইসাথে তরুণদের একটি বড় অংশ মনে করে এদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গবন্ধুর সাম্যবাদী ভাবনা, উদার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শোষণহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয় আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে পারে।

একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নেতৃত্বে তরুণদের চোখে বঙ্গবন্ধু কেমন, সে বিষয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা জরিপ করা হয়। যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছর, যাদের ৭৩ শতাংশই শিক্ষার্থী—এরকম ১,৫২৩ জন তরুণকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু শব্দটি উচ্চারণ করলেই তাদের মনে কী দৃশ্যপট ভেসে আসে। কেমন করে তিনি সমসাময়িক সব নেতাদের ছাড়িয়ে এমন অনন্য হতে পেরেছিলেন? আগামী প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে কী হিসেবে স্মরণ করবেন? এসব প্রশ্নের উত্তরে ৭৬ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন যে, বঙ্গবন্ধুর নাম এলেই তাদের মনে প্রথমে আসে ৭ মার্চের ভাষণের কথা। এদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ বলেছেন, তারা মনে করেন ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য পুরো জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং দেশ স্বাধীন হয়েছিল তাই বঙ্গবন্ধুর কথা মনে এলেই তাদের প্রথমে ওই ঐতিহাসিক ভাষণটির কথা মনে আসে। ৬৫ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন যে, বঙ্গবন্ধুর নাম এলেই তাদের মনে প্রথমে আসে স্বাধীন বাংলাদেশের কথা। এদের মধ্যে ৮১ শতাংশ বলেছেন যে, বঙ্গবন্ধু নিঃস্বার্থভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলেই এদেশ স্বাধীন হয়েছিল। তাই তাঁর কথা উঠলেই স্বাধীন বাংলাদেশের কথা মনে আসে। বঙ্গবন্ধুর নাম এলেই আরও যেসব শব্দ বা শব্দগুলোর কথা মনে পড়ে বলে উত্তরদাতারা জানিয়েছেন, সেগুলো হলো: জাতির পিতা (৫৯ শতাংশ), ছয় দফা আন্দোলন (৫৬ শতাংশ) এবং সংগ্রামী দেশপ্রেমিক (৫১ শতাংশ)।

এসব তথ্য, উপাত্ত ও পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, এদেশের তরুণরা বঙ্গবন্ধুকে কিভাবে ধারণ করে সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে একনিষ্ঠ। এ জন্যই বুঝি বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। শোষিত, নির্যাতিত ও লুণ্ঠিত বাংলাদেশের সমাজ দেহে সমস্যার অন্ত নেই। এই সমস্যার জটগুলোকে খুলে সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে।’ (১৫ ডিসেম্বর ১৯৭৪)।

এটা ঠিক যে, স্বাধীনতার পর থেকে অব্যবহতভাবে বেড়ে চলেছে প্রবৃদ্ধি, রেমিটেন্স, রফতানি ও রিজার্ভের পরিমাণ। কিন্তু বেকারত্ব কমেনি! গত এক দশকে কর্মসংস্থানের সঙ্কট আমাদের সবচেয়ে পীড়া দিয়েছে। যে তরুণরা দেশেকে এগিয়ে নিয়ে যাবে; তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ না তৈরি হলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। ইকোনোমিস্ট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ দেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সমীক্ষামতে, প্রতিবছর ২২ লাখ লোক শ্রম বাজারে প্রবেশ করে অথচ কাজ পায় সাত লাখ। আর বাকিরা বেকার! এ বিপুল পরিমাণ কর্মহীন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে না পারলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সব ক্ষেত্রে। যারা শিক্ষা অর্জন করেও এদশে যোগ্যতানুযায়ী চাকরি বা কাজ পাচ্ছে না, তারা হতাশায় ভুগছে। ক্রমেই কমে যাচ্ছে তাদের আত্মবিশ্বাস। এতে তাদের পেছনে বিনিয়োগের অপচয় হচ্ছে, তেমনি ক্ষয় হচ্ছে দেশের জনশক্তি । বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশে যে পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ শ্রমশক্তি রয়েছে, তার মধ্যে ২ কোটি ৩২ লাখ বা ৪৭ শতাংশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। আর মাত্র ৩.৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং মাত্র ২ শতাংশ ডিপ্লোমাধারী।

এখন শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, বিদেশে দক্ষ, প্রশিক্ষিত শ্রমিক প্রেরণ, ভাসমান মানুষকে উৎপাদনশীল কাজে লাগানো এবং বেকারত্ব সমস্যা লাঘব করা জরুরি। অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করে একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করতে প্রয়োজন বহুমুখী পরিকল্পনা, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব হ্রাস, রফতানি, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, উৎপাদনসহ সব ক্ষেত্রে সঙ্কট মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়ার পালা। আর সেই সাথে সব শ্রেণিপেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও প্রগাঢ় দেশাত্মবোধ, উন্নত নৈতিকতা ও মূল্যবোধ প্রয়োজন। আর তা না হলে স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদন সবার পক্ষে সম্ভব হবে না। এ জন্যই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, যদি দেশবাসী খাবার না পায়, যুবকরা চাকরি বা কাজ না পায় তাহলে আমাদের এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে, পূর্ণ হবে না।’

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও উপপরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

এসইউ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]