বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঈদুল ফিতর উদযাপনের বিচিত্র রীতি
ঈদুল ফিতর, এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলিম জাতি উদযাপন করে তাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় এই উৎসব। এটি মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। আন্তর্জাতিকভাবে ঈদুল ফিতরকে বলা হয় ‘ফেস্টিভ্যাল অব ব্রেকিং দ্য ফাস্ট’। শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা মাত্র মুসলিমরা ঈদ পালন শুরু করেন। পুরো বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায় ঈদের আনন্দে মেতে ওঠে।
সুবহে সাদিকের নামাজ আদায়ের পর মিষ্টি খাওয়া, অন্য মুসলিমদের আলিঙ্গন করা এবং আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হওয়া ঈদের মূল রীতি। মজাদার খাবার তৈরি, আত্মীয়-প্রতিবেশীর বাড়িতে যাওয়া, অন্যদের দাওয়াত দেওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে ঈদুল ফিতর পালন করা হয়। তবে প্রতিটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিবেশের কারণে ঈদ উদযাপনের ধরনে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।
সৌদি আরব
সৌদি আরবে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা হলো জাতীয় উৎসব। তিন দিনের সরকারি ছুটি থাকে। পুরুষরা তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে বাবার বাড়িতে ঈদ উদযাপন করেন। ঈদ উপলক্ষে খাবার ও উপহার বিতরণ করা হয়, এমনকি অমুসলিমরাও উপহার পান। গরিবদের জন্য খাবার বিতরণ করা হয় এবং ঘরে ঘরে মিষ্টিজাতীয় খাবার তৈরি করা হয়। আত্মীয়-পরিজন বাড়ি ভ্রমণ করেন, কেউ কেউ বাইরে পার্কে গিয়ে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া উপভোগ করেন।
তুরস্ক
তুর্কিবাসীরা ঈদ উদযাপন করেন সমুদ্র সৈকতে। ঈদের প্রথম দিন পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়, আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন তারা সমুদ্রের আনন্দে কাটান। এই সময়ে মাছ ধরা, সাঁতার কাটা এবং বালুকাময় উপকূলে বসে ঢেউ দেখা তাদের আনন্দের অংশ। তুর্কিবাসীদের কাছে ঈদ মানে বিশ্রাম, আনন্দ এবং পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে মিলনমেলা।
মিশর
মিশরে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তিন দিনের সরকারি ছুটি থাকে। মানুষ পরিবারসহ পার্ক, সিনেমা, থিয়েটার বা সমুদ্রতটে ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। ঈদের সময় শারম আল শেখে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ খাবারের মধ্যে ‘কাহক’ কুকি এবং ‘কাতায়েফ’ জনপ্রিয়। কাহকের মধ্যে থাকে খেজুর, বাদাম বা টার্কিশ ডিলাইটের পুর। শিশুদের নতুন জামা ও ঈদ সালামি দেওয়া হয়। বিভিন্ন ধরনের খাবার রান্না করা হয়, যেমন ‘ফাতা’, যা বাদাম ও চিনি দিয়ে তৈরি। টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়, আর রাতে পরিবার একত্র হয়ে গল্প ও গান উপভোগ করে। শিশুদের জন্য শহর ঘুরে বেড়ানোর সময় মোটরসাইকেল ভাড়া করা হয়।
আফগানিস্তান
আফগানরা নতুন পোশাক পরিধান করে, ঈদের নামাজ আদায় করে এবং আত্মীয়দের বাড়িতে যান। তারা বাড়ি পরিষ্কার করে, মজার খাবার রান্না করে ঈদ উদযাপন করেন। বিশেষ রীতি হলো টখম-জ্যান্গি বা ডিম যুদ্ধ। সব বয়সের মানুষ খোলা জায়গায় একে অপরের ডিম ভাঙার চেষ্টা করে আনন্দ উপভোগ করেন।
সোমালিয়া
সোমালিয়ার মানুষ নতুন পোশাক পরিধান করেন এবং ঐতিহ্যবাহী নাচের মাধ্যমে ঈদ উদযাপন করেন। পরিবার ও প্রতিবেশীর সঙ্গে মুখরোচক খাবার উপভোগ করা হয়। নারী-পুরুষ সবাই মেহেদি ও উপহার দিয়ে ঈদ উদযাপনে অংশ নেন।
মরক্কো
মরক্কোর মুসলিমরা ঈদ উদযাপনের আগে যাকাত আল ফিতর আদায় করেন। এটি বাধ্যতামূলক এবং ঈদের নামাজের আগ পর্যন্ত শোধ করতে হয়। পরিবারের প্রধান দায়িত্ব পালন করেন। যাকাত হিসেবে সাধারণত গম, ময়দা, টাকা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য দেওয়া হয়। প্রতিটি পরিবারের সদস্যের জন্য এক ব্যাগ গম সমান দান করতে হয়। ঈদের দিনে পুদিনার চা, প্যানকেক, পেস্ট্রি এবং অন্যান্য খাবার পরিবারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাওয়া হয়।
সিঙ্গাপুর
সিঙ্গাপুরে ঈদ উদযাপিত হয় অত্যন্ত জাকজমকভাবে। গিলং সেরাই এলাকা রঙিন আলোয় আলোকিত হয় এবং ৫০টিরও বেশি আলোক ও ভিজ্যুয়াল ইনস্টলেশন করা হয়। এখানে ১০০-এর বেশি খাবারের দোকান বসে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী মালয় খাবার পরিবেশন করা হয়। মুসলিমরা এখানে একত্র হয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
আইসল্যান্ড
আইসল্যান্ডে গ্রীষ্মকালে সূর্য দীর্ঘ সময় থাকে, তাই মুসলিমরা প্রায় ২২ ঘণ্টা রোজা রাখেন। ইসলামিক নির্দেশনা অনুযায়ী, নিকটতম দেশের সূর্যাস্তের সময় অনুযায়ী রোজা ভাঙা হয়। রেকজাভাকের মসজিদ ও আশেপাশের এলাকায় ইন্দোনেশিয়ান, মিশরীয় ও এরিটরিয়ান খাবার ও পানীয় পরিবেশন করা হয়। শিশুদের নতুন পোশাক, খেলা এবং আনন্দে ছোটাছুটি লক্ষ্য করা যায়।
আরও পড়ুন
রমজানে ভিন্ন ছন্দ মালিনীছড়া চা বাগানে
মাঝরাতে জমে ওঠে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বেনারসির হাট
কেএসকে