দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষটির হাতেই তৈরি হয় ব্রেইল

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫০ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২২

কেউ বা জন্মগত ভাবেই চোখে দেখেন না কেউ বা জন্মের পর নানান দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। তবে দৃষ্টিশক্তি না থাকলেই তিনি সমাজের বোঝা নন। তারাও নিজেরা নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন সমাজে। এই সব মানুষদের জন্য একজন ব্যক্তি আবিষ্কার করেন ব্রেইল পদ্ধতি।

অন্ধদের শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজন বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা। যা সম্ভব ব্রেইল পদ্ধতির মাধ্যমে। ব্রেইল নামটির সঙ্গে সবাই কম-বেশি পরিচিত। বর্তমানে ব্রেইল পদ্ধতি ব্যবহার করে অন্ধদের শিক্ষা দেওয়া হয়। আর এ উপায়ে অনেক দৃষ্টিহীন মানুষ শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কেউ কেউ আবার উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও কর্মরত আছেন।

এর আবিষ্কারক নিজেও চোখে দেখতে পেতেন না। তাই তো দৃষ্টিহীনরা যাতে পড়াশোনা চালিয়ে সমাজের স্রোতে ফিরে আসতে পারেন সেই চেষ্টাই করছিলেন। লুই ব্রেইল ছিলেন সেই প্রদীপ। যার হাত ধরেই আজ দৃষ্টিহীন মানুষেরা আলো দেখতে পেয়েছেন।

jagonews24

লুই ব্রেইল ১৮০৯ সালের ৪ জানুয়ারি ফ্রান্সের ছোট্ট শহর কুপভ্রারে জন্মগ্রহণ করেন। লুই ব্রেইল একজন চামড়া ব্যবসায়ীর সন্তান ছিলেন। চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তিন বছর বয়সে অন্ধ হয়ে যান তিনি।

ছোট্ট ব্রেইল তার বাবাকে অনুকরণের চেষ্টা করতেন। চামড়ায় জুতা সেলাইয়ের সুই গর্ত করতে চেষ্টা করতেন। একদিন ব্রেইল খুব কাছ থেকে চামড়ায় সুই দিয়ে গর্ত করতে গিয়ে তার চোখে এসে বিঁধে এবং ভয়ংকরভাবে আহত হন তিনি। সেসময় এন্টিবায়োটিকের প্রচলন না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত চোখ সংক্রমিত হয়। এটি বিস্তৃত হয়ে অপর চোখকেও আক্রান্ত করে।

পাঁচ বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। তিনি তার বাবা-মাকে ক্রমাগত জিজ্ঞেস করতেন, চারপাশ অন্ধকার কেন? তিনি বুঝতে পারতেন না যে তিনি আর কখনোই দেখতে পাবেন না। ১০ বছর বয়সে অন্ধদের উপযোগী রাজকীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। ব্রেইল মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিজ্ঞান এবং সংগীতে দক্ষতা দেখান। পরবর্তীতে চার্চের অর্গ্যান যন্ত্রবাদক হিসেবে যোগদান করেন। যুবকদের অন্ধ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকও ছিলেন তিনি।

দৃষ্টিশক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীনদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে লুইস ব্রেইল ছিলেন অগ্রদূত। প্রথমে মোটা কাগজে ডটের সাহায্যে লেখা পড়ার এই পদ্ধতিতে সেভাবে প্রসার লাভ করেনি। নিজের এই আবিষ্কারের প্রবল জনপ্রিয়তা ব্রেইল তার জীবদ্দশায় সাক্ষী থাকার সুযোগ পাননি। ১৮৫২ সালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

১৯১৬ সালে প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুলে দৃষ্টিহীন ছাত্রছাত্রীদের ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ানো শুরু হয়। এর কয়েক দশকের মধ্যে দেশে দেশে দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের পড়াশোনা ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে এই পদ্ধতি। বর্তমানে দৃষ্টিহীন ও বা স্বল্পদৃষ্টিজনিত চ্যালেঞ্জের শিকারদের কাছে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে ব্রেইল পদ্ধতি। আজ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় ব্রেইল পদ্ধতিতে বই লেখা হচ্ছে।

jagonews24

ব্রেইল মাত্র ১৫ বছর বয়সে অন্ধদের জন্য বর্ণমালা তৈরি করেন। এটি ছিল তার স্বপ্ন। পাঁচ বছর পর ১৮২৯ সালে ব্রেইল পদ্ধতি প্রকাশ পায়। বিভিন্ন জ্যামিতিক প্রতীক এবং বাদ্যযন্ত্রের চিহ্ন অন্তর্ভুক্ত ছিল এ বর্ণমালায়। তবে এর শুরু হয়েছিল আরও আগে।তার বাবা তার জন্য বেতে খোদাই করে স্বাধীনভাবে কীভাবে চলাফেরা করতে হবে তা শেখাতেন।

কুপভ্রারের শিক্ষক ও পুরোহিতরা ব্রেইলের আস্থা ও দৃঢ়তা দেখে অবাক হয়ে যেতেন এবং ১৩ বছর বয়সী ব্রেইলের জন্য ব্লাইন্ড ইয়ুথ রয়্যাল ইন্সটিটিউটের কাছে সুপারিশ করেন। ব্লাইন্ড ইয়ুথ রয়্যাল ইন্সটিটিউটটি ছিল অন্ধদের জন্য পৃথিবীর প্রথম স্কুল। ইন্সটিটিউটটি প্রতিষ্ঠিত হয় ভ্যালেন্টাইন হাউ’র চেষ্টায়, যিনি অন্ধ ছিলেন না।

শিক্ষার্থীরা হাউয়ের তৈরি পদ্ধতিতে অক্ষরগুলো ব্যবহার করে পড়তে শিখতো সেখানে। যখন স্কুলটি প্রথম খোলা হয় তখন ছাত্র ছিল মাত্র তিনজন। হাউয়ের পদ্ধতিটি এতোটাই জটিল ছিল যে শিশুদের এই পদ্ধতি ব্যবহার করে লিখতে শেখা কিছুটা অসম্ভব ছিল। ব্রেইলের বাবা তাকে পুরু চামড়া দিয়ে বর্ণমালা তৈরি করে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি অক্ষরগুলো আয়ত্ত করে বাড়িতে লিখতে পারেন।

১২ বছর বয়সে, ব্রেইল ক্যাপ্টেন চার্লস বারবারের উদ্ভাবিত ডট এবং ড্যাশগুলো সংযোগের মাধ্যমে আলো ব্যবহার না করে অথবা শব্দ না করে রাতে তথ্য প্রচারের ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন। যা অত্যন্ত জটিল হওয়ার কারণে সামরিক বাহিনীর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়।

এই পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্রেইল পরবর্তী তিন বছর চেষ্টা করে যান অন্ধদের জন্য একই রকম কিন্তু অপেক্ষাকৃত সহজ পদ্ধতি উদ্ভাবনের। এ জন্য তিনি ব্যবহার করেন জুতা সেলানোর সুই যা ব্যবহার করতে গিয়ে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।

যোগাযোগের ক্ষমতা আমাদের জ্ঞানের জগতে প্রবেশের দার খুলে দেয়। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যদি আমরা অন্য স্বাভাবিক দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের দ্বারা ঘৃণিত কিংবা করুণার পাত্র না হতে চাই। আমাদের দয়ার প্রয়োজন নেই, আমরা দুর্বলও নই। আমাদের অবশ্যই সমান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত এবং যোগাযোগের দক্ষতা এই ব্যাপারে আমাদের সাহায্য করবে।

jagonews24

অবশেষে কিছু সংশোধনের পরে, ব্রেইল ১৫ বছর বয়সে অন্ধদের জন্য একটি বর্ণমালা তৈরি করেন এবং পাঁচ বছর পর এটি প্রকাশ করেন। বিভিন্ন জ্যামিতিক প্রতীক এবং বাদ্যযন্ত্রের চিহ্ন অন্তর্ভুক্ত ছিল এই বর্ণমালায়। ব্রেইল সংগীত সম্পর্কে উৎসাহী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান অর্গানিস্ট।

১৮৩৪ থেকে ১৮৩৯ সাল পর্যন্ত প্যারিসের সেন্ট-নিকোলাস-দেস-চ্যাম্প চার্চের গির্জায় এবং পরবর্তীতে সেন্ট ভিন-সেন্ট দে পল চার্চের অর্গানিস্ট ছিলেন তিনি। ব্রেইলকে সারা ফ্রান্সের বিভিন্ন গির্জার অর্গানিস্ট হিসেবে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

যখন ব্রেইল তার পড়াশুনা শেষ করে, তাকে শিক্ষকের সহকারী হিসেবে কাজ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ২৪ বছর বয়সে তিনি অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ব্রেইল তার সারা জীবনের বেশিরভাগ সময় ইতিহাস, জ্যামিতি এবং বীজগণিত অধ্যয়ন ও শিক্ষা দিয়ে কাটিয়েছেন।

jagonews24

মাত্র ৪৩ বছর বয়সে টিউবারকুলেসিসে আক্রান্ত হয়ে ব্রেলর মারা যান। মৃত্যুর দুই বছর পর ছাত্রদের চেষ্টায় ইন্সটিটিউট অবশেষে তার বর্ণমালার পদ্ধতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। পরে এটি ফরাসি ভাষাভাষীদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

তিনি বরাবরই চেয়েছেন, তার মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা যেন সমাজের বোঝা হয়ে না থাকেন। তারাও যেন সমাজের অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারেন। এ জন্যই লুই অন্ধ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের কল্যাণে ব্রেইল পদ্ধতি আবিষ্কার করে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটান।

এক থেকে ছয়টি বিন্দু স্পর্শ করেই বর্তমানে বিশ্বের লাখ লাখ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা গ্রহণ করছেন। পদ্ধতিটি বিশ্বের সর্বত্র পরিচিতি পেয়েছে এবং প্রচলিত সব ভাষায় গ্রহণ করা হয়েছে। ব্রেইল কিন্তু কোনো ভাষা নয়। এটি একটি লিখন পদ্ধতি। চার্লস বারবিয়ে কর্তৃক উদ্ভাবিত যুদ্ধকালীন সময় রাতে পড়ার জন্য যে উত্তল অক্ষরের প্রচলন ছিল তা পর্যবেক্ষণ করে লুই ব্রেইল কাগজে উত্তল বিন্দু ফুটিয়ে লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

তার নামেই এই পদ্ধতি পরিচিত। পরবর্তীতে ১৮২৯ সালে তিনি স্বরলিপি পদ্ধতিতেও প্রকাশ করেন ব্রেইল শিক্ষা। ১৮৩৭ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংস্করণটি ছিল আধুনিক যুগে বিকশিত প্রথম ক্ষুদ্র বাইনারি লিখন পদ্ধতি।

ছয়টি বিন্দু দিয়ে ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা হয়। এ উপায়ে ৬৩টি নকশা তৈরি করা যায়। একেকটি নকশা দিয়ে বিভিন্ন বর্ণ, সংখ্যা বা যতিচিহ্ন প্রকাশ করা হয়। ৬টি বিন্দু বাম ও ডান দুটি উল্লম্ব স্তম্ভে সজ্জিত থাকে। অর্থাৎ প্রতি আনুভূমিক সারিতে থাকে দুটি বিন্দু। বিন্দুগুলোর পরস্পরের আকার ও দূরত্ব থাকে অভিন্ন। যেমন- বাম স্তম্ভের ওপরের বিন্দুটি যদি উত্তল থাকে আর বাকি ৫টি সমতল থাকে। তবে নকশাটি দ্বারা ইংরেজি বর্ণমালার ‘এ’ বর্ণটি প্রকাশ পায়। ঐতিহ্যগতভাবে অ্যাম্বুজকৃত কাগজের ওপর ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা হয়। এর বিকল্প হিসেবে এখন অবশ্য বিশেষায়িত টাইপরাইটার ব্যবহার করে সবাই। এ টাইপরাইটারের নাম ব্রেইলার।

ব্রেইলার এক ধরনের টাইপ মেশিন, যাতে ছয়টি বিন্দুর জন্য ছয়টি বাটন, স্পেস বার, ক্যাপিটাল লেটার ও সংখ্যা বোঝানোর জন্য পৃথক দুটি বাটন থাকে। ব্যাকস্পেস ও পরের লইনে যাওয়ার জন্যও পৃথক বাটন থাকে। ব্রেইল টাইপ রাইটারে শক্ত ধরনের কাগজ ব্যবহার করা হয়। যাতে স্ফূটিত অক্ষরগুলো সহজে ভেঙে না যায়। সাধারণত ১৪০ থেকে ১৬০ জিএসএমের কাগজ ব্যবহৃত হয়।

jagonews24

ব্রেইল ব্যবহারকারীরা রিফ্রেশেবল ব্রেইল ডিসপ্লে ব্যবহার করে থাকে। এর মাধ্যমে কম্পিউটারের মনিটর ও মোবাইলসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক সমর্থনযোগ্য ডিভাইসে পড়তে পারে। তারা স্লেট অ্যান্ড স্টাইলাসের মাধ্যমে লিখতে বা পোর্টেবল ব্রেইল নোট টেকার বা কম্পিউটারের মাধ্যমে ব্রেইল রাইটারে টাইপ করতে পারে।

আজ ৪ জানুয়ারি এই আবিস্কারকের জন্মদিন। সে অনুযায়ী আজ ‘বিশ্ব ব্রেইল দিবস’। তবে জীবদ্দশায় তার আবিষ্কারের সাফল্য এবং স্বীকৃতি কোনোটিই তিনি দেখে যেতে পারেননি। আজ সারাবিশ্বে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ব্রেইল পদ্ধতি। লাখ লাখ দৃষ্টিহীন মানুষ পড়ালেখা শিখতে পারছেন এই পদ্ধতিতে।

ব্রেইল পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলাই ব্রেইল দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য। আজও ব্যাংক, হাসপাতাল, রেস্তোরাঁ-সহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আছে যারা তাদের ছাপা জিনিসপত্র গ্রাহকের কাছে ব্রেইল পদ্ধতিতে পৌঁছে দেওয়ার কোনো তাগিদ প্রয়োজন করে না। এই নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা পর্যন্ত নেই। অথচ দৃষ্টিশক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীনদেরও অধিকার আছে তাদের মতো করে সব তথ্য জানার। তাদের কাছেও স্বাধীনতার স্বাদ পৌঁছে দেওয়া সমানভাবে জরুরি। সাধারণ মানুষ এই সম্পর্কে সচেতন না হওয়া পর্যন্ত তা কোনো ভাবো সম্ভব নয়।

কেএসকে/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]