শেখ ফজিলাতুন্নেছা হাসপাতাল রোগীদের ভালো চিকিৎসার ঠিকানা

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:২৩ এএম, ১৮ জানুয়ারি ২০২০

গাজীপুরের কাপাসিয়ার কড়িহাতা ইউনিয়নের বাসিন্দা আমেনা বেগম (৫৭) দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন। সবশেষ কাশিমপুর তেতুইবাড়ি এলাকায় শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, হাসপাতালটিতে খুব ভালো চিকিৎসা হয়। এ জন্যই এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছি।

শুধু আমেনা বেগম নন, ভালো চিকিৎসার জন্য এক সময় ঢাকার নামি-দামি হাসপাতালে ছুটে চললেও এখন গাজীপুর ও আশপাশের জেলার শত শত রোগী বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা নিতে শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেমোরিয়াল হাসপাতালে ছুটে চলছেন। এসব এলাকার বিপুল সংখ্যক পোশাক শ্রমিকও এ হাসপাতাল থেকে অত্যাধুনিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করছেন। হাসপাতালটিতে দরিদ্র রোগীদের জন্য রয়েছে ‘দরিদ্র ফান্ড’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিতে প্রায়ই এ হাসপাতালে যান।

আমেনা বেগমের সঙ্গে আসা তার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারহান শাহরিয়ার বলেন, আগে আমাদের পরিবার বা আত্মীয়দের কেউ অসুস্থ হলে ঢাকার বড় বড় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে যেতাম। এখন বাড়ির কাছে এ হাসপাতালে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়। আমাদের আত্মীয় স্বজন, পরিচিত সবাই এখন এ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

আমেনা বেগম বলেন, কিডনিতে সমস্যা দেখা দেয়ার পর শুরুতে ঢাকায় চিকিৎসা নিতে শুরু করি। পরে অনেকের কাছে এ হাসপাতালের সুনাম শুনি। এরপর থেকে এখানেই চিকিৎসা নিচ্ছি। এখানকার ডাক্তাররা খুব ভালো, চিকিৎসাও খুব ভালো। আল্লাহর রহমতে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি।

গাজীপুর সদরের বাসিন্দা গার্মেন্টস কর্মী আফরোজা মিম বলেন, এ এলাকায় উন্নত চিকিৎসাসেবার অভাব ছিল। এখন আমাদের মতো স্বল্প আয়ের শ্রমিকরাও এ হাসপাতলে চিকিৎসা নিতে পারি।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে নির্মিত শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে মালয়েশিয়ার বিখ্যাত সেবা সংস্থা কামপুলান পেরুতান জহর (কেপিজে)। অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবার পাশাপাশি অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সম্বলিত এ হাসপাতালে উন্নত দেশের মতো বিভিন্ন জটিল রোগের বিশ্বমানের চিকিৎসা হয়। ইতিপূর্বে খাদ্যনালী প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন রোগে জটিল অপারেশনও এখানে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

হাসপাতালটির বহির্বিভাগ ও অভ্যন্তরীণ বিভাগে সবধরনের রোগের আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্য চিকিৎসা ও অপারেশন করা হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা দিতে রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।

বছরখানেক আগে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার এলাকার বাসিন্দা আশা আক্তার আঁখি (১৯) নামে এক তরুণী জেদের বশে হারপিক খেয়ে ফেলেন। এতে তার খাদ্যনালী পুড়ে যায়। বিভিন্ন হাসপাতালে ছোটাছুটির পর শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নেন আঁখি।

আঁখির খাদ্যনালী কেটে তার নিজের কোলন থেকে খাদ্যনালী প্রতিস্থাপন করা হয়। চিকিৎসকরা তার বৃহদান্ত্রের অংশ বিশেষ দিয়ে অন্ননালী প্রতিস্থাপন করেন। পাকস্থলীর বন্ধ হয়ে যাওয়া অংশ বাইপাস করা হয় ক্ষুদ্রান্ত্রের অংশ দিয়ে। তার নাড়িতে ৬টি জোড়া দেয়া হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে আঁখি এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল আঁখির চিকিৎসা ব্যয় বহন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আশা আক্তার আঁখি (১৯) বলেন, সবাই ভেবেছিল আমি আর বাঁচব না। শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতালের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং দক্ষ চিকিৎসকদের কারণে হয়তো নতুন জীবন পেয়েছি। ভাগ্য ভালো সে সময় কাছাকাছি উন্নত হাসপাতাল পাওয়া গেছে। না হলে ঢাকা নিতে নিতেই হয়তো অন্য কিছু ঘটতে পারতো।

আঁখির সফল এ অপারেশন করেন ডা. রাজীব হাসান ও ডা. কাওছার আলম। তার চিকিৎসা ব্যয় বহন ও গাজীপুরে এ রকম একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানান আঁখি।

শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতালের চিকিৎসক সার্জন রাজীব হাসান জানান, এ হাসপাতালে খাদ্যনালী, পাকস্থলী, কোলন, লিভার ও ক্যান্সারসহ সবধরনের রোগের অপারেশন ও চিকিৎসাসেবা হয়।

তিনি আরও বলেন, উন্নত চিকিৎসায় ঢাকার নামি-দামি হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এখানকার মানুষও মনে হয় তাই চিন্তা করে। কারণ, বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা নিতে তারা এ হাসপাতালে আসেন। আগে যাদের অনেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতেন।

হাসপাতালটির সহকারী ম্যানেজার (বিসনেস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস ) আবুল হাসান বলেন, এখানে অত্যাধুনিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় আশপাশের এলাকাগুলোতে যারা আছেন তারা এখন আর ঢাকামুখী হচ্ছেন না। তারা এখানেই চিকিৎসা নিচ্ছেন। আগে এ সুযোগটা ছিল না। দিন দিন দেশের প্রায় সব জেলা থেকে আগের তুলনায় রোগীদের সমাগম বাড়ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রথম আইএমএস সার্টিফাইড হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ। প্রতিটি ডিপার্টমেন্টের রয়েছে আলাদা আলাদা কোয়ালিটি অবজেক্টিভ, যা রোগীদের সন্তোষজনক স্বাস্থ্যসেবায় নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে এ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বদ্ধপরিকর।

দরিদ্র রোগীদের জন্য ফান্ড রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, দরিদ্র রোগীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফান্ড তৈরি করে দিয়েছেন। এ ফান্ডের মাধ্যমে অতি দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। হাসপাতালে ইনডোর সেবার বাইরে বহির্বিভাগে অভিজ্ঞ ডাক্তাররা চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন।

এছাড়া শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনিস্টিটিউটে ইন্টারনাল মেডিসিন, নিউরোলজি, স্ত্রী রোগ ও প্রসুতি সেবা, জেনারেল ও ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি, হৃদরোগ, অর্থোপেডিক্স, গ্যাসট্রোলজি, শিশু রোগ চিকিৎসা, চক্ষু রোগ, নাক-কান-গলা, কিডনি, লিভার, ফুসফুস, ইউরোলজি, বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, ডায়াবেটিস, মনোরোগ, চর্ম-এলার্জি ও যৌন রোগসহ সবধরনের রোগের চিকিৎসা দেয়া হয় বলে জানান আবুল হাসান।

তিনি আরও জানান, এ হাসপাতালে দেয়া উল্লেখযোগ্য অন্যান্য সেবার মধ্যে রয়েছে- ২৪ ঘণ্টা দুর্ঘটনা এবং জরুরি সেবা ইউনিট, এক্স-রে, আল্ট্রাসোনোগ্রাম, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, ৪-ডি আলট্রাসাউন্ড, হাড়ের মিনারেল ঘনত্ব (বিএমডি) টেস্ট, আইসিউ, সিসিইউ, অত্যাধুনিক অপারেশ থিয়েটার, ক্যাথ ল্যাব, এমআর এনজিওগ্রাম, সিটি এনজিওগ্রাম, সিটি করোনারি এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টি, কিডনি ডায়ালাইসিস, ফিজিওথেরাপি সার্ভিস, স্পেশাল বেবি কেয়ার ইউনিট, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সবধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পেইন ম্যানেজমেন্ট সেন্টার, পথ্যব্যবস্থা বিদ্যা (ডায়টেরি), ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, টিকাদান, ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস।

২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতোসিরি মোহাম্মদ নজিব বিন তুন আবদুল রাজাক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার ছোটবোন শেখ রেহানা যৌথভাবে এ হাসপাতালের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।

এর আগে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। এটি একটি পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রতিষ্ঠান। পরে ২০১৫ সালে এখানে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে নার্সিং কলেজেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এফএইচএস/আরএস/এমএস