নিউইয়র্কের মেয়র মামদানির সামনে ৪ বড় চ্যালেঞ্জ
২০২৬ সালের প্রথম দিনে তীব্র ঠান্ডার মধ্যে হাজারো উচ্ছ্বসিত নিউইয়র্কবাসী ও প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট মিত্রদের ঘিরে নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র জোহরান মামদানি শহরের জন্য একটি নতুন গল্প বলার অঙ্গীকার করেন।
নিজের অভিষেক ভাষণে তিনি বলেন, সিটি হল নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী জীবনযাপন ও সমৃদ্ধির একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে—যেখানে সরকার হবে সেই জনগণের মতো, যাদের সে প্রতিনিধিত্ব করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি হিসেবে তিনি সার্বজনিক শিশু যত্ন, বিনামূল্যের গণপরিবহন বাস ও সিটি পরিচালিত মুদি দোকানের মতো বড় পরিবর্তনের কথা বলেন।
তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে মেয়রকে। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই তাকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হবে।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও জননীতি বিভাগের অধ্যাপক প্যাট্রিক ইগান বলেন, এসব বাস্তবায়নে তিনি নিজের সব রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করবেন। তবে তিনি যোগ করেন, নিউইয়র্ক একটি বিশাল ও জটিল শহর—সবকিছু আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
১. নীতিগত প্রতিশ্রুতির অর্থায়ন
মামদানির নীতিগত কর্মসূচির মূল লক্ষ্য জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো—যার মধ্যে রয়েছে ভর্তুকিপ্রাপ্ত বাসভবনে ভাড়া বৃদ্ধি স্থগিত রাখা এবং সবার জন্য বিনামূল্যে শিশু যত্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সিদ্ধান্ত তিনি এককভাবে এবং তুলনামূলক কম খরচে নিতে পারবেন। যেমন, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডে নিজের নীতির পক্ষে থাকা সদস্য নিয়োগ করে তিনি ভাড়া স্থগিত রাখতে পারেন।
তবে রাজ্য ও সিটি বাজেট ঘাটতির মুখে থাকা অবস্থায় অন্যান্য বড় প্রতিশ্রুতির অর্থ জোগাড় করা কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রবার্ট শ্যাপিরো বলেন, “বিনামূল্যের বাস বা শিশু যত্ন দিতে অর্থ লাগে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো নিউইয়র্ক রাজ্যের আর্থিক সক্ষমতা এবং গভর্নরের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
মামদানি বলেছেন, ধনীদের ওপর নতুন কর আরোপ করে অর্থ সংগ্রহ করা হবে। তার মতে, ধনীদের ওপর কর বাড়িয়ে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার তোলা সম্ভব। তিনি করপোরেট করহার ৭.২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১.৫ শতাংশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে কর পরিবর্তনের জন্য তাকে রাজ্য সরকারের সমর্থন প্রয়োজন। মাঝারি ধারার ডেমোক্র্যাট গভর্নর ক্যাথি হকুল তার নির্বাচনে সমর্থন দিলেও মামদানির বিস্তৃত কর পরিকল্পনায় তিনি সমর্থন নাও দিতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
২. হোয়াইট হাউজের হস্তক্ষেপ এড়ানো
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদ সম্মেলনে মামদানিকে কমিউনিস্ট আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করেন এবং তাকে নির্বাচিত করা হলে শহরের ফেডারেল অর্থ সহায়তা বন্ধ করার হুমকি দেন।
তবে গত নভেম্বর নির্বাচনের পর ট্রাম্প ও মামদানির প্রথম সাক্ষাৎ প্রত্যাশার চেয়ে অনেক সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। ট্রাম্প মামদানিকে বলেন, তিনি ভালো কাজ করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।
তারপরও দুজনের বিপরীতমুখী নীতিগত অবস্থান ভবিষ্যতে সংঘাত তৈরি করতে পারে। অভিবাসন ইস্যুতে টানাপোড়েনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এখনো পর্যন্ত ট্রাম্প নিউইয়র্কে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেননি, তবে শহরে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে।
৩. ব্যবসায়ী নেতাদের পাশে পাওয়া
জুনে ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে মামদানির অপ্রত্যাশিত জয়ে ওয়াল স্ট্রিটের অনেক নেতা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
কিছু ব্যবসায়ী শহর ছাড়ার হুমকি দেন, আবার কেউ কেউ অন্য প্রার্থীদের সমর্থনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন।
তবে মামদানি এগিয়ে থাকায় পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করে। তিনি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের উদ্বেগ শোনেন।
তিনি জেপি মরগ্যান চেজের সিইও জেমি ডাইমনের সঙ্গে বৈঠকের প্রতিশ্রুতি দেন। ডাইমন পরে বলেন, মামদানি নির্বাচিত হলে তিনি সহায়তা করতে প্রস্তুত।
তবুও অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, মামদানির অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে এবং কর বাড়ালে ধনী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নিউইয়র্ক ছাড়তে পারে।
৪. জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা
অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিউইয়র্ক সিটির প্রতিটি মেয়রের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
কোভিড মহামারির সময় অপরাধ বেড়েছিল, তবে ২০২৫ সালে হত্যা ও গুলির ঘটনা প্রায় রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
এই পরিস্থিতি মামদানিকে সামাজিক সেবা ও সহায়তা ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ দিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
মামদানি কমিউনিটি সেফটি বিভাগ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা মানসিক স্বাস্থ্য ও সংকট মোকাবিলায় কাজ করবে এবং সাবওয়ে স্টেশনে সামাজিক কর্মী মোতায়েন করবে।
সাবেক মেয়র এরিক অ্যাডামসের সময়েও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে অনেকেই মনে করেন সেগুলো যথেষ্ট কার্যকর হয়নি।
ডেমোক্র্যাটিক কৌশলবিদ হাওয়ার্ড উলফসন বলেন, মামদানির সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করবে মূলত শহরের পুলিশিং ও ছোটখাটো অপরাধ দমনের ওপর।
তিনি বলেন, মানুষ যদি নিরাপদ বোধ করে, তবে তারা অনেক সমস্যা সহ্য করতে পারে। আর যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে অন্য কোনো চ্যালেঞ্জই তারা মেনে নেবে না।
সূত্র: বিবিসি
এমএসএম