মধ্যরাতে মসজিদের কাছে বুলডোজার
যেভাবে উত্তপ্ত হয়ে উঠলো দিল্লির তুর্কমান গেট এলাকা
ভারতের রাজধানী দিল্লির তুর্কমান গেটে শতবর্ষী ফাইজ-ই-ইলাহি মসজিদের আশপাশে কথিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। সেখানে গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে জানা যায়, উচ্ছেদ অভিযানে একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ, পাথর নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের ব্যবহার হয়। এ ঘটনায় অন্তত পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার সকাল নাগাদ কর্তৃপক্ষ একটি বিয়েবাড়ি, একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হজযাত্রীদের থাকার একটি কক্ষ, সড়কের অংশবিশেষ, ফুটপাত ও একটি কার পার্কিং এলাকা ভেঙে ফেলে।
কী ঘটেছিল
মঙ্গলবার বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে দিল্লি হাইকোর্ট মসজিদ সাইয়েদ ইলাহির পরিচালনা কমিটির করা আবেদনের প্রেক্ষিতে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন অব দিল্লি (এমসিডি) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নোটিশ দেয়। আবেদনে মসজিদ কমিটি দাবি করে, সংশ্লিষ্ট জায়গাটি তাদের ব্যবহারে ছিল এবং দিল্লি ওয়াক্ফ বোর্ডকে নিয়মিত লিজের ভাড়া দেওয়া হতো।
আরও পড়ুন>>
বাংলাদেশি সন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম যুবককে পিটিয়ে হত্যা
চিকিৎসকের হিজাব টেনে খুলে ফেললেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী
অযোধ্যায় রাম মন্দিরের কাজ শেষ হলেও মসজিদ নির্মাণ এগোয়নি কেন?
মঙ্গলবার রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ৩২টি বুলডোজার ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সম্ভাব্য উত্তেজনার আশঙ্কায় পুলিশ নিরাপত্তা জোরদার করে।
রাত ১১টার দিকে নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নয়জন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, ২৫ জন সহকারী কমিশনার, স্থানীয় থানার প্রায় ৮০০ পুলিশ সদস্য এবং আধাসামরিক বাহিনীর ১০টি কোম্পানি মোতায়েন করা হয়।
রাত সাড়ে ১১টার দিকে মসজিদের আশপাশে স্থানীয়দের জমায়েত শুরু হয়।
বুধবার রাত ১টার দিকে কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং উপস্থিত লোকজনকে সরে যেতে বলে। তখন প্রায় ১৫০ জন সেখানে জড়ো হয়ে স্লোগান দিচ্ছিলেন বলে জানায় পুলিশ। এ সময় ২৫–৩০ জন পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে বলে পুলিশের দাবি।
রাত ১টা ৩০ মিনিটে পুলিশ টিয়ার গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার পর উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়।
বুধবার সকাল ১০টার দিকে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় দিল্লি পুলিশ একটি এফআইআর দায়ের করে এবং ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পাঁচজনকে আটক করে। পুলিশ জানিয়েছে, বডিক্যাম ও অন্যান্য ভিডিওর সহায়তায় অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য
পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ ও স্লোগান দিচ্ছিলেন। পুলিশ প্রথমে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তোলে, এরপর প্রতিক্রিয়ায় পাথর ছোড়া হয়।
মসজিদের কাছেই বসবাসকারী ও দোকানদার মোহাম্মদ জুহাইব (৪৩) অভিযোগ করেন, পুলিশ আবাসিক গলির ভেতরে ঘরবাড়ির দিকেও টিয়ার গ্যাস ছুড়েছে। তার কথায়, ‘ভোর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত অন্তত ৫০টি টিয়ার গ্যাসের শেল ছোড়া হয়েছে। আমার সন্তানরা সারা রাত ঘুমাতে পারেনি, মাথাব্যথা ও চোখ জ্বালাপোড়া করছিল।’
স্থানীয় ‘আমন কমিটি’র সদস্য মোহাম্মদ শেহজাদ (৪৮) বলেন, পাথর নিক্ষেপকারীদের বেশিরভাগই বাইরের লোক। এক সপ্তাহ ধরে পুলিশের সঙ্গে বৈঠক চলছিল। সোমবার তারা আমাদের একটি মানচিত্র দেখিয়ে জানায়, কী কী ভাঙা হবে এবং মসজিদে হাত দেওয়া হবে না। সেই তথ্য স্থানীয়দের জানানো হয় এবং সবাই সহযোগিতা করে। সম্ভবত কয়েকজন বহিরাগত এসে গোলমাল করেছে।
উচ্ছেদ অভিযানের পর এলাকায় এখনও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ওপর নজরদারি করছে।
কেএএ/